kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সমাজ বদলাতে চাই নৈতিকতার অনুশীলন

ড. নিয়াজ আহমেদ

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সমাজ বদলাতে চাই নৈতিকতার অনুশীলন

ধর্ষণ ও ধর্ষণের পরে হত্যাসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ এমন নৃশংস পর্যায়ে চলে যায়, যা আমাদের বিবেককে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। যারা এমন সব জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রত্যাশা ছাড়া আরো যদি কিছু থাকত তা-ও আমরা দাবি করতাম, যা বাকিদের জন্য শিক্ষণ হিসেবে কাজ করত। আইন সহায়তা সবার অধিকার হলেও প্রাথমিকভাবে সিলেটের আইনজীবীরা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদেরকে ধন্যবাদ। সমাজবিজ্ঞানীরা প্রথমত পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতা শিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মনে করেন। প্রতিটি শিশুই কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পরিবারে বেড়ে ওঠে। পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের শিক্ষণ একেবারে খারাপ হয় তা কিন্তু নয়। তেমনি বিদ্যালয় থেকেও তারা অনেক কিছু শিখে থাকে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কাছ থেকে তারা খারাপ কিছু শিখে তা নয়। কিন্তু বয়সের দিক থেকে একটু বড় হওয়ার কারণে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শেখা বিষয়গুলোর ওপর সমাজের বিভিন্ন পরিবেশের প্রভাব এতটা বেশি মাত্রায় পড়ে যে নৈতিক শিক্ষা যতটুকু ছিল তা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বিকৃত মনোবৃত্তি এমনভাবে জাগরিত হয় যে অপরাধ করার কোনো পূর্বপ্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে না। যার উদাহরণ আমরা সম্প্রতি সিলেটে লক্ষ করি। এখন বড় প্রশ্ন, শুধু পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাকি সামাজিক পরিবেশ আজ নৈতিকতা শিক্ষার বড় নিয়ামক।

যে কেউ ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে নিজেকে জড়াতে পারে। কিন্তু স্থান-কাল ও পাত্রভেদে এর কারণ ভিন্ন হবে। সংঘবদ্ধতাও একটি বড় বিষয়। একত্রে থাকার অর্থ হলো নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, যোগাযোগ ও সমন্বয়, যা সাহসকে আরো বাড়িয়ে দেয়। আদর্শিক জায়গায় আমরা নিজেদের এক মনে করলেও তা অনেকটা তাত্ত্বিক। যদি তা না-ই হতো, তাহলে আলাদা আলাদাভাবে পেশিশক্তি প্রদর্শন ও নিজস্ব বলয় তৈরির মানে কী। এভাবে আলাদা বলয় সাহসকে আরো বাড়িয়ে দেয়। কেননা অনুসারীর সংখ্যা তখন বেশি হয় না। কর্মীরা ভাগ হয়ে যায়। আদর্শ সত্যিকারভাবে থাকলে বলয় ও অনুসারীর প্রয়োজন পড়ে না। তখন নেতা, নেতৃত্ব ও অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত প্রতিনিয়ত অনিবার্য। সুবিধা হলো অনুসারী কম হওয়ায় নেতার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হরহামেশা। নেতাও নিজেকে দামি মনে করেন। কেননা তাঁর একটি বলয় আছে। এতে অনুসারীদের সাহস আরো বেড়ে যায়। ফলে যেকোনো ধরনের সামাজিক অপরাধ করতে তাদের দ্বিধাবোধের কোনো প্রশ্ন থাকে না। একদিকে সামাজিক প্রভাব, অন্যদিকে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও ফাঁকফোকর উদ্বুদ্ধ করে অপরাধ করতে। আমরা অনেকে দায় নিতে চাই না, আবার কেউ কেউ নিজেদের ডিফেন্স করি। কার্যত এর মাধ্যমে সুবিধা ভোগ করে অপরাধীরা।

জীবনে সাফল্য আশা করা একটি সহজাত প্রবৃত্তি। কেউ ব্যবসা করে অর্থবিত্তের মালিক হতে চায়। কেউ বা চাকরি করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা সফল হতে চাই। কিন্তু সাফল্য পেতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক পথের দরকার। অর্থাৎ বৈধপথে সব কিছু অর্জন করে যখন আমি সফল, তখনই আমার সার্থকতা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক পথগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অবৈধ পথ বেশি প্রাধান্য পায় ও তার মাধ্যমে সফলতা আসে। কষ্ট না করে যখন অনেক কিছু পাওয়া যায় তখন তার প্রতি ঝোঁক বাড়ে। তখন সমাজে নীতিহীনতা দেখা দেয়। এখানেই নৈতিকতার প্রশ্ন।

আমাদের সমাজ ক্রমাগত নীতিহীনতার দিকে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পরিবার ও বিদ্যালয়ের শিক্ষা একবারে নীতিহীন হতে পারে না। যখন আমরা প্রাপ্তবয়স্ক হই তখন সামাজিক প্রভাব দারুণভাবে কাজ করে কিংবা এর দ্বারা আমরা প্রভাবিত হই। নীতিহীনতা আমাদের অপরাধ করতে সহজে প্রলুব্ধ করে। অথচ সমাজের মানুষগুলো নীতির অনুশীলন করলে সমাজকে আমরা বদলাতে পারতাম। যারা আজকে জঘন্য সব অপরাধ করছে, তারা হতে পারত একেকজন সেবক এবং রক্ষাকবচ। সমাজের কাণ্ডারি হিসেবে বড়দের কাজ এখানে বেশি। শিক্ষার্থী ও যুবকদের সঠিক নির্দেশনা দিলে এবং অপরাধীদের কোনো আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিলে সমাজের মধ্যে পরিবর্তন আসবে। নীতিহীনতার পরিবর্তে নৈতিকতা প্রাধান্য পাবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য