kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সংকট মোকাবেলায় অবাধ তথ্যপ্রবাহ

মরতুজা আহমদ

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সংকট মোকাবেলায় অবাধ তথ্যপ্রবাহ

চলতি বছর বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস পালনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘তথ্য অধিকার সংকটে হাতিয়ার’। এবার এমন সময় দিবসটি পালিত হয়েছে যখন সারা বিশ্ব করোনাভাইরাস মহামারিতে আক্রান্ত। বলা বাহুল্য, করোনা সংকট উত্তরণে ইউনেসকোর অনুসরণে আমাদের এবারের প্রতিপাদ্য নিঃসন্দেহে তাৎপর্যমণ্ডিত ও সময়োপযোগী। উল্লেখ্য, অবাধ তথ্যপ্রবাহ রচনা, তথ্যে সর্বজনীন প্রবেশাধিকার, তথ্য অধিকার সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য।

তথ্য অধিকার মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, বৈষম্য দূরীকরণ; সুশাসন তথা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা আনয়ন; দুর্নীতি হ্রাস, জনগণের ক্ষমতায়ন ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করে। চিকিৎসাসহ সংবিধানে বর্ণিত সব মৌলিক অধিকার পূরণে সর্বাগ্রে প্রয়োজন জনগণের তথ্যে আবশ্যিক অভিগমন। তথ্য অধিকার রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে জনগণের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে, আস্থার সম্পর্ক স্থাপন করে।

করোনাকালে বিশ্ববাসী উপলব্ধি করেছে, সঠিক ও সময়োচিত তথ্য কিভাবে মানুষের জীবন-মৃত্যুর নিয়ামক হতে পারে। করোনার ভয়াল থাবা থেকে জীবনকে নিরাপদ রাখতে, স্বাস্থ্যবিধি জানতে, বুঝতে এবং তা মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে—এসংক্রান্ত জরুরি ও সাধারণ তথ্যাদি জনগণের জন্য সহজ ও বোধগম্য করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যবিধি, যেমন—মাস্ক পরিধান, সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণে অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও তথ্যে অভিগমনের গুরুত্ব অপরিসীম। আপনজনকে হারিয়ে আমরা বুঝেছি আক্রান্ত ব্যক্তিকে কত তাড়াতাড়ি চিকিৎসার আওতায় আনা ও দ্রুত সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। তার দ্বারা অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার পর আমাদের বোধগম্য হয়েছে সঠিক সময়ে তথ্য পেলে, জানলে এবং তা পালন করলে ব্যাপকভাবে তাদের সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব ছিল। এখনো আমরা অনেকেই বিশ্বব্যাপী করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের খবর রাখি না। এ জন্য এই সংকটে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন জরুরি সেবা ও স্বাস্থ্যবিধির সব তথ্য জনগণের কাছে অবারিত করা ও রাখা, এগুলো পালনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করা এবং এ ধারা অব্যাহত রাখা। হাসপাতালে তো বটেই, ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিনা মূল্যে বা কম মূল্যে করোনা চিকিৎসা ও সেবা দিয়ে যাচ্ছে—এ তথ্য ভুক্তভোগীর কাছে আছে কি? অজানা ভাইরাসের সংকট মোকাবেলায় চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসহ অপরাপর মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণে, আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে টেকসই কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নে, জনগণের জন্য গৃহীত প্রণোদনা ও সহায়তার বিভিন্ন প্যাকেজের তথ্য তাদের কাছে অবারিতকরণে, ঘোষিত সুবিধাদিতে প্রকৃত উপকারভোগীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে সঠিক ও সময়োচিত তথ্য প্রদানের বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ও সময়োচিত চিকিৎসা গ্রহণ ও প্রদানে, নমুনা পরীক্ষায়, মানসম্মত চিকিৎসাসামগ্রীর সময়োচিত এবং যথাযথ সরবরাহ ও ব্যবহারে এককথায় চলমান ও সব ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের তথ্যে জনগণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা ও অব্যাহত রাখা একান্ত আবশ্যক। এতে সংকটে মানুষের শুধু জীবন রক্ষাই সহজ হবে না, জনস্বাস্থ্য নিরাপদ থাকবে, অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে সব কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে, সুশাসন বজায় থাকবে, সংকট মোকাবেলায় রাষ্ট্র ও জনগণের আস্থার সম্পর্ক সমুন্নত থাকবে। তা ছাড়া গুজব, ভুল-বানোয়াট তথ্য জনগণকে বিভ্রান্ত করবে না। সংকট উত্তরণ ত্বরান্বিত হবে, উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর বিধান মতে, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের আবশ্যিক অধিকার রয়েছে। নাগরিকের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে। অন্যথায় শাস্তি, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। তবে নাগরিকের তথ্য চেয়ে পেতে আইনের কাঠামোপদ্ধতি অনুসরণে কিছুটা সময়সাপেক্ষ বিধায় আইনের ছয় ধারায় প্রত্যেক কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক ও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তার গৃহীত সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম কিংবা সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকাণ্ডের সব তথ্য নাগরিকের কাছে সহজলভ্য হয় সেভাবে সূচিবদ্ধ করে প্রচার ও প্রকাশ করবে। এভাবে তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো কর্তৃপক্ষ তথ্য গোপন করতে বা এর সহজলভ্যতাকে সংকুচিত করতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ কোনো নীতি প্রণয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তা অবশ্যই প্রকাশ করবে এবং এর সমর্থনে যুক্তি ও কারণ ব্যাখ্যা করবে, প্রণীত প্রতিবেদন ও প্রকাশনা সর্বসাধারণের জন্য পরিদর্শন ও সরবরাহ সহজলভ্য করতে হবে, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো পন্থায় প্রচার ও প্রকাশ করবে। কর্তৃপক্ষের বাধ্যতামূলক অনুসরণের জন্য এ বিষয়ে প্রণীত তথ্য অধিকার (তথ্য প্রকাশ ও প্রচার) প্রবিধানমালা ২০১০-এ কী কী তথ্য কিভাবে কত দিনের মধ্যে কোন কোন মাধ্যমে প্রকাশ করবে তার সুস্পষ্ট বিধান বর্ণিত আছে।

সন্দেহ নেই, করোনা সংকটকালে বাংলাদেশ, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নাগরিকের আবেদন করে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রটি কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। বিশ্বের কোনো কোনো দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণাসহ লকডাউন ইত্যাদি কারণে নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তি ব্যাহত হয়েছে। করোনা সংকটে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিধানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে নাগরিকের পক্ষে শারীরিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা, এ জন্য কয়েকটি ধাপ পার করে তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা কঠিন কাজ, স্বাস্থ্যবিধিসম্মতও নয়। অবশ্য বিকল্প হিসেবে অনলাইনে তথ্য প্রদান ও শুনানি বা সিদ্ধান্ত প্রদানের বিষয়টি জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশের আইনটি যথেষ্ট অনলাইনবান্ধব। দেশে ইন্টারনেটসহ ডিজিটাল ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশেও তথ্যের আবেদন গ্রহণ, তথ্য প্রদান, শুনানি ও সিদ্ধান্ত অনলাইনে প্রদান করা হচ্ছে।

সংকট মোকাবেলায় অবাধ তথ্যপ্রবাহ রচনার মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত ও সচেতন করার লক্ষ্যে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্মুখযোদ্ধাদের নিয়ে সারা দেশে নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে জনজীবন রক্ষায় ও জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তায়, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে একদিকে যেমন জনগণকে স্বাস্থ্যসচেতন করার প্রয়াস নিয়েছেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন, প্রণোদনা ও সহায়তা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন, এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, অন্যদিকে সব কর্তৃপক্ষকে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন, যা সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে, দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদের নবম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি জানান, করোনা ভ্যাকসিনের জন্য সব দেশেই আবেদন করা হয়েছে, প্রয়োজনীয় বাজেটের সংস্থান রাখা হয়েছে, যেখানে আগে পাওয়া যাবে সেখান থেকেই নেওয়া হবে। মহান সংসদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর প্রদানসহ এহেন বক্তব্য সারা দেশে তথ্যের অবাধ প্রবাহ রচনা করে, জনগণকে সংকটে স্বস্তি দেয়, আশ্বস্ত করে, আশার আলো দেখায়।

স্বতঃপ্রণোদিত তথ্য প্রদানের আরেকটি বাধ্যতামূলক মাধ্যম কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট। ওয়েবসাইটের তথ্য ও নির্দেশিকা সংকট উত্তরণে পথ দেখায়। তবে ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ থাকতে হবে, হতে হবে সহজলভ্য ও ব্যবহার উপযোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের মতো জেলা ও উপজেলার স্বাস্থ্য কার্যালয়ের ওয়েবসাইটেও করোনাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যাদির একটি কর্নার থাকা জনস্বাস্থ্যের খাতিরে সমীচীন হবে।

লেখক : প্রধান তথ্য কমিশনার

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা