kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

কূটনীতিতেও সার্ভিসিংয়ের প্রয়োজন হয়

জয়ন্ত ঘোষাল

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কূটনীতিতেও সার্ভিসিংয়ের প্রয়োজন হয়

Joint Consultative Commission, সংক্ষেপে বলা হয় JCC. ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই যৌথ পরামর্শক কমিশনের ষষ্ঠতম বৈঠকটি শুরু হচ্ছে আজ। এই বৈঠক এর আগেরবার হয়েছিল দিল্লিতে। সেই পঞ্চম বৈঠকটি যখন হয়েছিল তখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন সুষমা স্বরাজ। ভারত ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটা যৌথ বিবৃতি সে বৈঠকের পর দিয়েছিল। সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে চারটি  MOU (Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই সমঝোতা স্মারক মোতাবেক বাংলাদেশের মোংলায় যে ভারতীয় ইপিজেড তাতে বিনিয়োগ আনতে ভারতের প্রখ্যাত গোষ্ঠী হিরানন্দনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হয়েছিল সিবিআই, ভারতের যে তদন্তকারী গোষ্ঠী সরকারের সেই সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনকে সহযোগিতা করবে। আর তৃতীয় একটি সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যাঁরা সরকারি আমলা, তাঁরা কাজে যোগ দেওয়ার পর যখন বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়, অর্থাৎ তাঁদের ক্যারিয়ারের একটা মধ্য অবস্থায়, সেটা যৌথভাবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটা ট্রেনিং অর্থাৎ একটা বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা ভারত করবে। সেই কাজটা শুরুও হয়ে গেছে। চতুর্থ সিদ্ধান্তটি ছিল ভারতের আয়ুষ ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মেডিসিন প্লান্ট খাতে সহযোগিতার বিষয়ে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের পর আবার এই বৈঠক হতে চলেছে। আপাতভাবে মনে হতে পারে, এ ধরনের কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করা এবং আলাপ-আলোচনা করা, এটা তারই একটা ধারাবাহিকতা। একটা রুটিন, একটা প্রক্রিয়া। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে প্রথমে ফোনে কথা বলেন। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় যান। সেখানে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। সুতরাং তখনই ঠিক হয়েছিল শিগগিরই জেসিসির বৈঠক হবে এবং এই আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আপাতভাবে এটা রুটিন মনে হলেও এই মুহূর্তে গোটা পৃথিবীতে একটা অশান্ত পরিস্থিতি—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোট আসন্ন, চীন ভারতের বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব নিয়েছে, সেই আগ্রাসনের বিতর্কের নিষ্পত্তি হয়নি। যখন করোনা আক্রান্ত পৃথিবীর ভারত ও বাংলাদেশ—এই দুটি রাষ্ট্রেই করোনার দ্বারা যথেষ্ট পীড়িত। প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। কার্যত একটা মহামারির পর্যায়ে চলে গেছে। এই করোনার জন্য যে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে, তার জন্য মানুষের চাকরিবাকরিতে টান পড়েছে। মানুষের আর্থিক অনটন এসেছে। দারিদ্র্য, কর্মহীনতা। নানা রকমের সমস্যায় জর্জরিত এই দুটি দেশ। সেই রকম একটা পরিস্থিতিতে আর যা-ই হোক একটা যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি করা বা একটা সংঘাতের আবহ তৈরি করা, আর যা-ই হোক একটা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষই সেটা চাইবে না বা হওয়া কাম্য নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটাই হচ্ছে। একদিকে পাকিস্তান আর আরেক দিকে চীন। এবং চীনের যে ড্রাগনের নিঃশ্বাস তাতে ভারত উদ্বিগ্ন। কিন্তু সচেতন। যুদ্ধ করতে না চাইলেও ভারত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর ঠিক সেই রকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের যে সুদৃঢ় সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের সঙ্গে এই মুহূর্তের পৃথিবীর এই যে নতুন নতুন বিন্যাসের চেষ্টা, সেখানে ভারত ও বাংলাদেশের বোঝাপড়াটা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। যখন পৃথিবী বহুপক্ষীয় পৃথিবী থেকে আবার একটা দ্বিমেরুর পৃথিবীতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে ভারত এই দক্ষিণ এশিয়ায় কিন্তু দ্বিমেরু বিশ্বের প্রত্যাবর্তন। সেটা ভারতের কখনোই কাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নয় এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের ৭৫ বছর পূর্তিতে এই প্রশ্নটা আবার প্রাসঙ্গিক হচ্ছে। ৭৫ বছর আগে রাষ্ট্রপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণেই একটা বহুপক্ষীয় পৃথিবীর দিকে গতিমুখ নির্ধারিত হয়েছিল। সুতরাং এই অতিমারি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে যখন ১০ লাখ প্রায় মৃতের সংখ্যা ছুঁই ছুঁই, তখন গত শতকের তিনের দশকের পর এত গভীর অর্থনৈতিক মন্দা যখন দেখা যায়নি, তখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এবং গোটা পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সঙ্গে প্রতিটি দেশের যেমন, তেমনি সেখানে ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। দুই বৃহৎ শক্তির যুযুধান মনোভাবের দরুন মেরুকরণ হয়। বিগত দশকগুলোতে কিন্তু সেটা অনেক দিন দেখা যায়নি।

জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল সঠিক কারণেই রাষ্ট্রপ্রধানদের একটা নতুন ঠাণ্ডাযুদ্ধ সম্পর্কে সতর্ক করছেন। জানাচ্ছেন, বিশ্ব কিন্তু আবার বিপজ্জনক দিশায় এগোচ্ছে। প্রশ্ন হলো, তার এই সতর্কবার্তাকে বিশ্বের বৃহত্তম যে শক্তি, তারা কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। সুতরাং একটা কথা আলোচনা হচ্ছে রাজনৈতিক ভাইরাস। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের পাশাপাশি রাজনৈতিক ভাইরাসও ছড়াচ্ছে। এবং এই মুহূর্তে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বোঝাপড়াটা এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এই দুই দেশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যাতে এই রাজনৈতিক ভাইরাসেরও মোকাবেলা করা সম্ভব হয়।

২.

গতকাল সোমবার ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকে তিনি অন্তত একটা জিনিস ভারতের মানুষের কাছে এবং গোটা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁর প্রয়াত পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে প্রত্যাশা বাংলাদেশ স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, উন্নয়নমুখী একটা রাষ্ট্রে পরিণত হবে—সেই লক্ষ্যে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশের আজকের প্রজন্ম স্বপ্ন দেখে সন্ত্রাস নয়, যুদ্ধ নয়; মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অনেক রক্ত ঝরিয়ে বাংলাদেশের মানুষ দেশটাকে স্বাধীন করেছে। তারপর অনেক প্রজন্ম এসেছে। সেই নতুন প্রজন্ম আজকে একটা আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে এবং তারাই কিন্তু প্রধান কারিগর বাংলাদেশ গঠনের জন্য। আমি বাংলাদেশে যাই। বাংলাদেশে যখন বইমেলা হয়, তখন চেষ্টা করি একবার অন্তত যেতে। বাংলাদেশের বইমেলায় যখন ঘুরি, তখন দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের ওপর নতুন অনেক বই প্রকাশিত হয়। নতুন নতুন তথ্য নিয়ে অনেক নতুন নতুন প্রকাশক সুললিত বাংলায় ঝকঝকে বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন। সেখানে আমি দেখেছি, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এক প্রচ্ছদে মলাটে ছবি প্রকাশিত হয় চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো কিংবা গোটা পৃথিবীর যাঁরা সেরা সেই সব বিপ্লবীর। তাঁদের জীবনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী একই সঙ্গে মানুষ কেনে। অর্থাৎ গোটা পৃথিবীতে যেখানে যত মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাসংগ্রাম, তার সঙ্গে ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে আন্দোলন, তার ইতিহাস স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মানুষ সেটাকে যুক্ত করেছে। আজ এত বছর পর যখন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা তাদের রিপোর্টে বলে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার ইতিবাচক। অর্থনীতিবিদরা বলেন, বস্ত্রশিল্প অর্থাৎ টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশের রপ্তানি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এই করোনা সংকটের মধ্যেও ব্যবসায়ীরা যোগ্যতার সঙ্গে রপ্তানি বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। বন্দরে এবং বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় রেখে, আমলাতান্ত্রিক ফাঁস এড়িয়ে রপ্তানি যাতে সুষ্ঠুভাবে করা যায়, তার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। এই রকম নানা বিষয়ের মধ্যেও শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার ব্যাপারেও কঠোর মনোভাব দেখিয়েছেন। বাংলাদেশেও ভারতের মতো মৌলবাদী শক্তি সক্রিয়। বাংলাদেশেও এই মৌলবাদী শক্তি শান্তি বিঘ্নিত করতে চায়। এই মৌলবাদী শক্তি বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন শুধু নয়, অনেক রকমের রাজনৈতিক প্রচারের মধ্যে তারা প্রবেশের চেষ্টা করে। শেখ হাসিনা প্রথম থেকেই বারবার আশ্বাস দিয়েছেন, বাংলাদেশের মাটিতে যা-ই হোক ভারতবিরোধী সন্ত্রাসমূলক কাজকর্মকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। শুধু ভারতবিরোধী কেন, বিশ্বসন্ত্রাস একটি অখণ্ড বিষয়। সেখানে বাংলাদেশও আক্রান্ত হয়েছে। শেখ হাসিনার জীবননাশের চেষ্টা হয়েছে এবং রীতিমতো সামরিক ছাউনিতে আক্রমণের চেষ্টা মানুষ আজও ভোলেনি। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জিও-স্ট্র্যাটেজিক পজিশনকে ভারত গুরুত্ব দেয়। ভারত মনে করে, এই স্ট্র্যাটেজিক অংশীদারি শুধু অর্থনীতি নয়, অর্থনীতি থেকে যার শুরু, পরিকাঠামো নির্মাণে যার ব্যবহার, সেখান থেকে আজ আরো বড় জায়গায় এই স্ট্র্যাটেজিক অংশীদারকে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়াবে। এই বৈঠক আবার হতে চলেছে।

উন্নয়নের কথা হবে। পুরনো চুক্তিগুলো ঝালাই করা হবে। সবচেয়ে যেটা বড় কথা, সেটা হলো জেসিসিকে উপলক্ষ করে দুটি দেশের যে সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক সম্পর্ক সেটাই হৃদয়ের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ককে আরো একবার প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ আমি বলি কূটনীতিতেও সার্ভিসিংয়ের প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ বারবার বৈঠক। বারবার আলোচনা। বারবার দেখাশোনা। আমরা আশাবাদী এই বৈঠক ফলপ্রসূ হবে।

১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে কলকাতায় এসে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘আপনারা আমার সঙ্গে স্লোগান দিন জয় ভারত, জয় ভারত। জয় বাংলা, জয় বাংলা। আমি যদি বলি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, আপনারা বলবেন অমর হোক।’

এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঘাতকের হাতে নিহত হন বাংলাদেশের স্থপতি। এরপর সামরিক শাসন। তারপর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকার গঠিত হয়। আজ এত বছর পর শেখ হাসিনার জীবনে আবার আর একটি জন্মদিন। অত্যাচারী ঘাতকদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলার জন্য প্রতিজ্ঞা গ্রহণের দিন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সাফল্য আশা করি দেখতে পাব এই জেসিসিতে।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য