kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ কার্তিক ১৪২৭। ২২ অক্টোবর ২০২০। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

মানুষ ঈশ্বরচন্দ্র : পণ্ডিত বিদ্যাসাগর

গোলাম কবির

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানুষ ঈশ্বরচন্দ্র : পণ্ডিত বিদ্যাসাগর

 

ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি আগ্রাসিত বাংলার গঠমান কলকাতা নগরীর অবিস্মরণীয় ‘যথার্থ মানুষ’ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সংস্কৃত কলেজ প্রদত্ত তাঁর উপাধিপত্র বা সনদের নাম বিদ্যাসাগর। অথচ তাঁর নাম উচ্চারণের সঙ্গে উপাধি সংযুক্ত না থাকলে একেবারে বেমানান ঠেকে। এমনকি এটিই তাঁর পরিচিতির প্রথম সোপান। গতকাল ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ছিল তাঁর দ্বিশততম জন্মদিন।

সমকাল বিদ্যাসাগরের অত্যুজ্জ্বল বিভায় উদ্ভাসিত হয়েছে, ইতিহাস তা ভুলে যায়নি। তুলনায় তখনকার সারস্বত সমাজ তাঁকে সহযোগিতার জন্য পুরোপুরি এগিয়ে আসেনি। বরং কোনো কোনো ব্যক্তি তাঁকে কঠোরভাবে আক্রমণ করেছেন। তাঁরাও ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছেন। তবে সমাজ উন্নয়ন বা শিক্ষা বিস্তারের বিষয়ে স্মরণীয় যতখানি, ততোধিক জুগুপ্সাকারী হিসেবে। বিদ্যাসাগরের কিঞ্চিৎ অনুজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অবিসংবাদী প্রতিভা মধুসূদন (১৮২৪-১৮৭৩) বিদ্যাসাগরকে যেভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন, তার তুলনা খুব বেশি নেই। মধুসূদনের প্রধান পরিচয় তিনি কবি। মানসদৃষ্টি দিয়ে বিদ্যাসাগরের  চারিত্র্যমাহাত্ম্যের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি একাধিক সনেটে তাঁকে উপস্থাপন করেছেন। তখন বিদ্যাসাগরের বয়স ৪২ বছর। যশের শীর্ষে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তাঁর হয়নি। অথচ নির্মোহ এই নির্ভীক মানুষটি সমকালীন সময়কে অতিক্রম করে মানবকল্যাণে কাজ করে চলেছেন। শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণ পরিবারের সদস্য হয়েও ধর্ম-সম্প্রদায় মতবাদ তাঁর ব্রতে প্রতিবন্ধক হয়নি। তাঁর কাছে মানুষের প্রথম ও প্রধান পরিচয় ছিল—মানুষ মানুষই।

ঈশ্বরচন্দ্রের ৪২ বছর বয়সের সময়ই মধুকবি শিক্ষক বিদ্যাসাগরের প্রকৃষ্ট পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।’ আবার মানবকল্যাণকামী মানুষ ঈশ্বরচন্দ্রের প্রশস্তি গেয়েছিলেন এইভাবে : ‘দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া এবং নিশয় সুশান্ত নিদ্রা; ক্লান্তি হরণকারীরূপে রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘নিশীথ শীতল স্নেহ’। এখানেই শেষ নয়, বন্ধুর কাছে লেখা চিঠিতে লিখেছেন : The man to whom I have appealed has the genius and wisdom of an ancient sage, the energy of an English man and the heart of a Bengali mother.

বিস্ময়ের বিষয়, বিদ্যাসাগরের চরিত্রের সার্বিক পরিচয় বাঙালি সমাজে পরিচিতির আগেই মধুসূদন তাঁর কবিদৃষ্টি দিয়ে যে তাঁকে তুলে ধরেছিলেন, যার একটি অক্ষরও অতিরঞ্জন নয়। বিদ্যাসাগরের বদান্যতা, শৌর্যশীলতা এবং সহৃদয় হৃদয়সংবেদিতা সম্পর্কে যে পরিচয় মধুকবি দিয়েছিলেন, তা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

মেদিনীপুরে বিদ্যাসাগর স্মৃতি মন্দির রচনা উপলক্ষে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের ২৪শে ভাদ্র ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামে রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতা অঞ্জলি দেন। কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেন : ‘ভাষার প্রাঙ্গণে তব আমি কবি তোমারি অতিথি।’ মাত্র একটি পঙিক্ততে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের কাছে তাঁর ঋণের কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করা হয়েছে।

১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই বিদ্যাসাগরের তিরোধানের পর ১৩০২ বঙ্গাব্দের ১৩ই শ্রাবণ ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। একই অভিধায় ১৩০৫ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে অপর যেটি রচনা করেন কবি, তাতে সম্যক চেনা যাবে বিদ্যাসাগরকে। আমরা একটু খোঁজ নিলে দেখব, বিদ্যাসাগর চরিত্রের সর্বাপেক্ষা বলিষ্ঠ দিকটি সম্পর্কে নির্দেশ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন : “ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাহার অজেয় পৌরুষ, তাহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব; তাইতো তিনি ‘মনো যস্য মননেন হি জীবিত’, অর্থাৎ মননের দ্বারা জীবিত থাকা হয়ে থাকবেন। মানব মনে চিরস্থায়ী আসনের এমন প্রশস্তি আর আছে কি?”

উনিশ শতকে সংস্কারমুক্ত চেতনার প্রকাশ সহজ ছিল না। অবশ্য কোনো নতুন ভাবনা কখনো বাধাহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষা-সমাজ-মানবসেবায় একালে বিদ্যাসাগর যে ক্লান্তিহীন শ্রম দিয়েছিলেন, তার তুলনা তিনি নিজেই।

রামযশ তর্করত্নের পৌত্র, ঠাকুরদাস-ভগবতী দম্পতির সন্তান ঈশ্বরচন্দ্র মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে টোলের শিশুপাঠ সমাপন করে মাত্র ৯ বছর বয়সে কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন এবং এক যুগ ধরে কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে বিদ্যাসাগর ডিগ্রিতে ভূষিত হন। তারপর পিতৃদত্ত নামের চেয়ে উপাধিতেই তিনি আজও পরিচিত। বাংলাদেশে এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই।

আধুনিক বাংলা গদ্যের আনুষ্ঠানিক অনুশীলন চর্চার সূতিকাগার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে শিক্ষকতা শুরু করার পর থেকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ অলংকৃত করা পর্যন্ত তাঁর কর্মযজ্ঞের ফিরিস্তি আমরা দেব না; কিংবা সমকালীন গদ্য লেখক রামরাম বসু বা মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার প্রমুখের সঙ্গে তুলনায় যাব না। তবে বিদ্যাসাগর মোটা অঙ্কের বেতনের লোভনীয় চাকরি নামের দাসত্ব অবহেলায় ত্যাগ করে জাতিকে শিক্ষার ভার নিয়েছিলেন, তা অবশ্যই বলতে হবে। কারণ শিক্ষার মাধ্যমেই সমাজ ও মানবচরিত্র উন্নয়ন সহজ হয়। এই লক্ষ্যে তিনি মায়েদের অন্দরমহলে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে অগ্রণী ছিলেন। তাই তিনি গ্রামের ধূলিধূসর পথে ঘুরে ঘুরে বিদ্যালয়, বিশেষ করে মেয়েদের অগ্রাধিকারের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। অকালবিধবার যন্ত্রণা লাঘবের জন্য সমাজের প্রতিকূল স্রোতে চলেছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজের ছেলের বিয়ে দিয়েছেন বিধবার সঙ্গে। পাছে বিধবা বলে বধূকে অবহেলা করা না হয়, সে উদ্দেশ্যে উইলের বেশির ভাগ পুত্রবধূর জন্য বরাদ্দ রাখেন। এমন মহৎ কাজকে সব কালের কিছু প্রাচীনপন্থী সুনজরে দেখেনি।

বিদ্যাসাগরের মানুষকে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত অননুকরণীয়। আমৃত্যু তিনি আত্মীয়-অনাত্মীয়-আশ্রিতের পোষক ছিলেন। তাঁর মানবপ্রেমে জাতি-ধর্ম-বর্ণের সংস্কার বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। জীবনের শেষ ভাগে তিনি ভূমিসন্তান সাঁওতালদের সঙ্গে বসবাসে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মানুষের সেবায় বর্ধমানের মুসলিম পল্লীতে অবস্থান করে তিনি মনুষ্যত্বের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গেছেন। তাইতো রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘যথার্থ মানুষ’ অভিধায় শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।

সারা বিশ্ব করোনার ভারে ন্যুব্জ, ম্রিয়মাণ। বিদ্যাসাগরের দ্বিশততম জন্মদিন আমাদের সচেতন করে দিয়ে যাক, আর্তের সেবায় কী পরিমাণ নিবেদিতপ্রাণ হওয়া যায়।

আমরা মানুষ ঈশ্বরচন্দ্রকে দেখলাম। এবার শিক্ষক বিদ্যাসাগরকে দূর থেকে উঁকি দিয়ে দেখি। শিক্ষকের কথা ও কাজে পার্থক্য থাকার কথা নয়। বরং জীবনানন্দ-জননী কুসুম কুমারীর ভাষায়, ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’। জীবে দয়ার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিদ্যাসাগর মাছ-মাংস খেতেন না। গো-বৎসকে প্রতারণা করে অধিকার হরণ করা হয় ভেবে তিনি গো-দুগ্ধ পান থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। শিক্ষার্থীদের সর্বজনীন শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করার জন্য মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের প্রতি জোর পরামর্শ দেন। বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন বলে শিশুশিক্ষা পুস্তক রচনাকালে ছন্দোবদ্ধ পদ দিয়ে বাক্য রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতিতে উল্লেখ করেছেন : “সেদিন পড়িতেছি, ‘জল পড়ে পাতা নড়ে।’ আমার জীবনে এইটেই আদিকবির প্রথম কবিতা।” এর প্রভাবেই কবিজীবনের ‘চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল বলে তিনি বিশ্ববরেণ্য হয়ে উঠলেন।’

না জেনে জানার ভান করা শিক্ষকতা ব্রতে অমার্জনীয় অপরাধ। বিদ্যাসাগর তা সচেতনভাবে পরিহার করতেন। আমরা সেই অপরাধকে সজ্ঞানে শ্রেয়তার আসনে বসিয়েছি। ফলে শিক্ষা আমাদের সামনে দাঁড়াতে লজ্জা পায়। ‘যথার্থ মানুষ’ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পণ্ডিত বিদ্যাসাগর যেন পরস্পরের পরিপূরক। এই অসাধারণ ক্ষণজন্মা ব্যক্তিটি দুই শ বছর আগে ব্যতিক্রমী বাঙালি হিসেবে বাংলায় এসেছিলেন ২৬ সেপ্টেম্বর। আমরা তাঁকে স্মরণ করে নিজেদের কৃতার্থ ভাবছি।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা