kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অ্যাসাঞ্জের প্রত্যর্পণ বাক্‌স্বাধীনতা হরণের নামান্তর

লুলা ডা সিলভা

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্রিটিশ আদালত অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ভাগ্য নির্ধারণে সিদ্ধান্ত নেবেন; দ্রুতই নেবেন। তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি কোনো অপরাধ করেননি।

যুক্তরাজ্যই ঠিক করবে অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর আবেদন গ্রহণ করা হবে, নাকি খারিজ করা হবে? যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হলে মার্কিন সরকারের উত্থাপিত ১৮টি অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে অ্যাসাঞ্জকে। তাঁর বয়স এখন ৪৯ বছর। যদি হস্তান্তর করা হয় তাহলে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর ১৭৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে, যা এক জীবনের জন্য কারান্তরিন হওয়ার শামিল।

আমাদের তীব্র প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে, যাতে প্রত্যর্পণের ঘটনা না ঘটে। সারা দুনিয়ায় যাঁরা বাক্স্বাধীনতার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ তাঁদের প্রতি আমার আহ্বান, আসুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিয়ে আমরা অ্যাসাঞ্জের পক্ষে দাঁড়াই এবং তাঁর তাত্ক্ষণিক মুক্তি দাবি করি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম একজন সাংবাদিককে সত্য প্রকাশ করার দায়ে গুপ্তচরবৃত্তি আইনে অভিযুক্ত করা হলো। দুনিয়াবাসী জানে, অ্যাসাঞ্জ কখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেননি। তিনি চেলসিয়া ম্যানিংয়ের কাছ থেকে পাওয়া নথি প্রকাশ করেছেন মাত্র। চেলসিয়া ম্যানিং মার্কিন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীতে কাজ করেছেন। ম্যানিংকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

আমরা সবাই জানি, কেন মার্কিন সরকার অ্যাসাঞ্জের ওপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চায়। নিউ ইয়র্ক টাইমস, এল পাইস, লা মঁদ, দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে) ও ডের স্পিগেলের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে অ্যাসাঞ্জ ইরাক ও আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালানোর সময় মার্কিন বাহিনী যে সহিংসতা চালিয়েছে, যুদ্ধাপরাধ করেছে সে কথাই প্রকাশ করেছেন। গুয়ানতানামো বে কারাগারে বন্দিদের ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছে সে কথাও প্রকাশ করেছেন তিনি।

অ্যাসাঞ্জ একটা ভয়ংকর ভিডিও ক্লিপও প্রকাশ করেছেন, সে কথা বিশ্ববাসীর স্মরণে থাকার কথা। ভিডিওটি একটি সামরিক হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, মার্কিন সেনারা স্রেফ মনের আনন্দে বাগদাদের রাস্তায় হেলিকপ্টার থেকে মুহুর্মুহু গুলি চালাচ্ছেন; এতে ১২ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়। তাদের মধ্যে রয়টার্সের দুজন সাংবাদিকও ছিলেন।

এসব কারণ তো রয়েছেই। উপরন্তু ব্রাজিলীয়দের অতিরিক্ত ঋণ রয়েছে অ্যাসাঞ্জের কাছে। উইকিলিকসে প্রকাশিত তেমের প্রশাসন (যা ২০১৬ সালে দিউমা প্রশাসনের পর ক্ষমতাসীন হয়েছিল) এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত এক আলাপচারিতা থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের গভীর সমুদ্রে তেলের মজুদের বেসরকারীকরণের উদ্দেশ্যে আলোচনা করতে চেয়েছিল।

অ্যাসাঞ্জ প্রকাশিত নথি পড়ে ব্রাজিলীয়রা জানতে পারল, ব্রাজিলের ওই ব্যক্তি মানে জোজে সেহা, যিনি পরে তেমের প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন এবং নর্থ আমেরিকান ওয়েল জায়ান্টস এক্সনমবিল ও শেভরনের নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল।

নিজেদের বক্তব্য যুক্তিযুক্ত করার জন্য অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন যে অভিযোগ এনেছিল—তিনি ম্যানিংকে সরকারের কম্পিউটার হ্যাক করায় সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছিলেন—সেটি বিপজ্জনক, ক্ষতিকর ও মিথ্যা।

এটা মিথ্যাচার। কারণ যে উদ্যোগ অ্যাসাঞ্জ নিয়েছিলেন তা তাঁর সোর্সের পরিচয় যাতে প্রকাশিত না হয় সে জন্যই নিয়েছিলেন। এমন উদ্যোগ সব সাংবাদিকের অধিকারভুক্ত এবং এটা একজন সাংবাদিকের নৈতিক বাধ্যবাধকতাও বটে। কী করে গ্রেপ্তার এড়ানো যায়, সে ব্যাপারে সোর্সদের পরামর্শ দেওয়া এমন এক বিষয়, যা নৈতিকতাসম্পন্ন যেকোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিক করে থাকেন। বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা মানে সাংবাদিকদের সর্বত্র বিপদের মধ্যে ফেলা।

সব মানুষ ও সব প্রতিষ্ঠান মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং শুধু মূলধারার মিডিয়া নয়, যাদের মাধ্যমে উইকিলিকস গোপন বিষয়গুলো শেয়ার করেছিল, সবারই এখন একটা জরুরি দায়িত্ব পালন করার আছে। সেটা হলো, অনতিবিলম্বে অ্যাসাঞ্জের মুক্তি দাবি করা।

আমরা সবাই জানি, অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেসব অভিযোগ আসলে মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর ওপর সরাসরি আঘাত। প্রথম সংশোধনীতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে যেসব চুক্তি রয়েছে তা রাজনৈতিক অপরাধের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ সমর্থন করে না, বরং নিষেধ করে।

অ্যাসাঞ্জকে প্রত্যর্পণ করা হতে পারে—এ আশঙ্কা বাস্তব। যাঁরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তাঁরা কাউকে, যিনি বাক্স্বাধীনতা অনুকূলে এত বড় ভূমিকা পালন করেছেন, ওই কাজ করার জন্য শাস্তির মুখে ঠেলে দিতে পারেন না। অ্যাসাঞ্জ—আমি বারবার বলি, গণতন্ত্রের একজন চ্যাম্পিয়ন। তাঁকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।

 

লেখক : ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য