kalerkantho

শনিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৭। ২৪ অক্টোবর ২০২০। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

কভিড প্রতিরোধে ‘স্বাভাবিক’ ভ্যাকসিন মাস্ক

এলিনর মর্গান

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কভিড প্রতিরোধে ‘স্বাভাবিক’ ভ্যাকসিন মাস্ক

‘আমার কিন্তু হাঁপানি আছে’—পাড়ায় আমার যে মুদিখানা আছে, সেখানে এক মহিলা আমাকে এ কথা বলল। তার মুখে মাস্ক ছিল না, তবে আমার ছিল। আমি বললাম, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’ সে বলল, ‘তোমাকে এ কথা বললাম, কারণ মাস্ক না থাকার জন্য তুমি আমাকে বেশ কথা শুনিয়েছ।’

আমি চাচ্ছিলাম ঝগড়া এড়াতে। মোদ্দাকথা হচ্ছে, দোকানে উন্মোচিত মুখের কাউকে দেখলে আমি আতঙ্কিত হই। আমারও হাঁপানি আছে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে—কেনাকাটা করতে দোকানে এসে কয়েক মিনিটের জন্য একটা মাস্ক মুখে লাগিয়ে রাখলে তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। মহিলাটা দোকানে আসলে আমাকে বিরক্ত করেছে। এমন অবস্থায় যুক্তিযুক্ত কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া যায়—এমন ভাবা কঠিনই মনে হয়। সে মুখিয়েই ছিল। আমি নিজেকে অপদস্থ মনে করছিলাম। এ ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ আলোচনা কেমন হতে পারে!

ইনডোরে মুখ ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ বিধি যদি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান প্রয়োগ করতে যায়, তাহলে সেটা হবে গোলমেলে একটা বিষয়। আমার দোকানের ক্যাশ বাক্স একটা প্লাস্টিকের পর্দার আড়ালে থাকে। কিন্তু দোকান মালিকরা কোনো কাভারের ধার ধারেন না। দায়িত্ববোধ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির মধ্যে নিহিত। এটা জটিল ইন্টারপারসনাল ডিনামিক্স তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাস্ক পরলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমে। গবেষকরা এ মাসের প্রথম দিকে বলেছেন, মাস্ক কভিড প্রতিরোধে একটা ‘স্বাভাবিক’ ভ্যাকসিন। মাস্ক পরলে মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা কম। গবেষকরা দেখেছেন, জনবহুল স্থানে, যেখানে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক, সেখানে সংক্রমণের হার কমতির দিকেই থাকে।

আমরা সবাই জানি, মাস্ক পরা অস্বস্তিকর, এতে ঘাম হয়; এটা এক ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করে এবং এটা আমাদের ত্বকের জন্য খারাপ। কিন্তু এর কী লাভ? এ ব্যাপারে প্রচুর নজির আছে। মাস্ক পরার ব্যাপারটা যখন ব্যক্তির ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতার ওপর নির্ভর করে, তখন আলাপচারিতা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে।

সোশ্যাল গ্রুপগুলো মাস্ককে ঘিরে নিজস্ব বিধি-রীতি তৈরি করছে এবং সেগুলো কার্যকরের চেষ্টা করছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রির অধ্যাপক ড. রবার্ট ক্লিত্জম্যান নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, যখন আমাদের মূল্যবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন সেটা আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলতে পারে—আমরা আলাপচারিতা এড়িয়ে যেতে চাই।

কথা হচ্ছে, কারো মাস্ক পরা না পরা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পেছনে অনেক মানসিক ফ্যাক্টর কাজ করে। কোনো ঝুঁকি গ্রহণ করতে গিয়ে মানুষ অনেক নাটুকে আচরণ করে; এটা নির্ভর করে কী ধরনের তথ্য তার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। মূল্যবোধ একেক কমিউনিটিতে একেক রকম। কারো যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে এটা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলবে। তরুণরা অল্পসংখ্যক লোককে জানে, যারা খুব মারাত্মকভাবে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে; তাদের উদ্বেগ কম থাকবে।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যত বেশি লোক দেখবে অন্যরা মাস্ক পরছে, তত তাদের মাস্ক পরার প্রবণতা বাড়বে। যত বেশি বিষয়টা নজরে পড়বে, তত স্বাভাবিক বোধ করবে। আমরা গৃহীত হতে চাই, প্রত্যাখ্যাত হতে নয়। এমনটা হলে মাস্কবিষয়ক রক্ষণশীলতা বাড়ে, বিশেষ করে এ রক্ষণশীল মনোভাব পুরুষের মধ্যে বেশি কাজ করে।

আমার টুইটার ফিড বোঝাই হয়ে আছে মানুষের অভিযোগে—বেশির ভাগ পুরুষ মাস্ক পরে না বা পরতে চায় না। আমিও দুঃখ পেলাম; কিন্তু অভিযোগগুলো পড়তে উৎসাহী হলাম—কেন পুরুষদের কিছু গ্রুপ মাস্ক পরতে আগ্রহী নয়, বিশেষ করে তরুণরা। রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল পুরুষ, যারা ট্র্যাডিশনালি পুরুষালি মনোভাব ধারণ করে বা যাদের স্বাস্থ্যশিক্ষা নিম্নমানের, তারাও মাস্ক পরতে চায় না। অনেকেই আছে, যারা মনে করে, মাস্ক একটা ফালতু জিনিস।

যদি আমরা মাস্কের সঙ্গে সম্পর্কিত হই, তাহলে যারা তা পরে না, তাদের প্রতি রাগান্বিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। যদি ইমোশনাল রেসপন্সের প্রতি সংবেদনশীল হই, তবে তা সম্ভবত পরিবর্তনের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। কারো প্রতি লজ্জা আরোপ করলে তা সম্ভবত উল্টো ফল দেয়।

কিভাবে মানুষ জনস্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য আমলে নেয়? এটা আস্থাশীলতার ওপর নির্ভর করে। আমরা যদি বার্তাবাহককে আস্থায় না নিই, তাহলে তার বার্তা বিশ্বাস করব না। এ সরকারের গোলমেলে আচরণে আস্থা জিনিসটা দ্রুত উবে যাচ্ছে। ভেবে দেখুন, মানুষ যদি তাদের মাস্ক ময়লার ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলে, তাহলে কী ঘটতে পারে? তখন শান্ত থাকাটা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আমাদের কথা গ্রাহ্য হতে পারে, যদি আমরা মনোভাব নরম রাখি।

হার্ভার্ডের অধ্যাপক ও এপিডেমিওলজিস্ট জুলিয়া মারকাস যখন মাস্কবিরোধী পুরুষদের লজ্জা না দিয়ে কথা বলেন, তখন কিছু পুরুষ তাঁর সংস্পর্শে আসে। তারা মাস্কের ব্যাপারে তাঁর কথা মন দিয়ে শোনে। এখানে একটা শিক্ষা আছে। বিরক্ত হলে অন্যরা কথা শুনতে কম আগ্রহী হয়। আমরা যদি পাইকারি হারে কারো দৃষ্টিভঙ্গির নিন্দা করি, সে আলোচনা করতে আগ্রহী হবে না। সে নিজের বিশ্বাসে আরো জেঁকে বসে থাকবে।

মহামারির মধ্যে বসবাস করা মানে আমরা সবাই চাপে আছি। এটা যোগাযোগে প্রভাব ফেলে। যদি সম্ভব হয় ইস্যুগুলোকে সমবেদনার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। ভালো যোগাযোগ প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আমাদের এত সময় নেই। আমরা যদি বাসে দেখি কারো চিবুকে মাস্ক নেই, দোকানে গিয়ে দেখি কেউ মাস্ক ছাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাহলে তার সঙ্গে কথা বলে ফায়দা কী! আমি চাইব তারা মাস্ক পরুক। যদি তার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকাই, তার সঙ্গে রাগতস্বরে কথা বলি, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া হবে নেতিবাচক। তার সঙ্গে প্রশ্নোত্তরে কথা বলাই ভালো। কেউ যদি কথা বলতে নিরাপদ বোধ করে, সে তার মত বদলাতেও নিরাপদ বোধ করবে।

লেখক : একজন গবেষক ও লেখক

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা