kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

একটি আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস বঙ্গবন্ধু স্মরণে উদ্‌যাপিত হোক

এ কে এম আতিকুর রহমান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



একটি আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস বঙ্গবন্ধু স্মরণে উদ্‌যাপিত হোক

আজ আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। কিন্তু এ বছর সারা বিশ্বে করোনা মহামারির কারণে দিবসটি উদ্যাপিত হবে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ কর্মসূচির মধ্যে।

আমরা জানি যে শান্তির আদর্শকে স্মরণ ও শক্তিশালী করার জন্য ১৯৮১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। শুরু থেকে সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর দিনটিতে দিবসটি পালিত হয়ে এলেও ২০০১ সাল থেকে প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

এ বছর দিবসটি পালনের জন্য নির্ধারিত বিষয় (থিম) হলো—একসঙ্গে শান্তিকে গড়ি। অর্থাৎ আমরা ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র যে দেশেরই মানুষ হই না কেন, আমাদের একত্র হয়ে শান্তি  গঠনে এগিয়ে আসতে হবে। তবে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রয়োজন সত্যনিষ্ঠ আকাঙ্ক্ষা। আজকের দিনে আমাদের চিন্তাকে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করতে হবে। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে আমাদের সবাইকে মিলে, আন্তরিকতা ও দৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে।

বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি নানা কারণেই স্বাভাবিক নয়। বছরটি শুরু হয়েছে আমাদের জীবনের জন্য এক মহামারির হুমকির মধ্য দিয়ে। বিশ্বসম্প্রদায় একটি অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যা অদৃশ্য এবং বিশ্বে এমন কোনো শক্তিশালী অস্ত্র নেই একে ধ্বংস করতে সক্ষম। সমগ্র পৃথিবীটাই কভিড-১৯ নামের এমন এক ভয়াবহ শত্রুর মুখোমুখি, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এর আগে ঘটেনি। আমরা উন্নয়নশীল দেশের জনগণই শুধু নই, উন্নত দেশের জনগণও কমবেশি একই ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এ কথা বলা যাবে না, পৃথিবীতে কোনো যুদ্ধবিগ্রহ নেই, যদিও জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সব যুদ্ধরত দেশগুলোকে তাদের অস্ত্রশস্ত্র রেখে বর্তমান বৈশ্বিক মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ কথা সত্যি যে মহাসচিব মহোদয় যুদ্ধরত দেশগুলোকে উদ্দেশ্য করেই ওই কথা বলেছেন। কিন্তু এ আহ্বান সবার জন্য। বিশ্বসম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই মহামারির বিরুদ্ধে অবশ্যই একসঙ্গে লড়তে হবে।

বলতে গেলে, কভিড-১৯ গোটা বিশ্বকেই এক অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। করোনা মহামারির বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে জাতি-বর্ণ-ধর্ম-নির্বিশেষে বিশ্বের সব মানুষের মধ্যে সংহতি ও সহযোগিতার জন্য আমাদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করলেই হবে না, সব স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। দেখা যাচ্ছে, খুব কম মানুষই বর্তমানে স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে চলছে। এভাবে চলাফেরা করলে করোনা থেকে বাঁচা তো দূরের কথা, করোনাকেই লালন-পালন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও জনসাধারণের দায়িত্ব এড়ানোর উপায় নেই।

বাস্তবতা হলো, অতীতের মতোই শান্তিকামী মানুষের আহ্বানে কেউ তেমন সাড়া দিচ্ছে না। ক্ষমতার প্রভাব আর আধিপত্যের নিপীড়ন এখনো পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে যায়নি। বিশ্বে এখনো মানুষ পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে কিছু নেতা বা দেশের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। যারা জনগণকে শান্তির অঝোর ধারায় সিক্ত করার ক্ষমতা রাখে, তারাই যুদ্ধবিগ্রহের জ্বলন্ত শিখায় মানুষকে পুড়িয়ে মারছে। শান্তির জন্য আমাদের এই আর্তি হয়তো তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের হৃদয়কে আলোড়িত করে না।

আজকের এই দিনটিতে আমি এমন একজনকে স্মরণ করতে চাই, যিনি বেঁচে থাকলে হয়তো ১৯৮১ সালের অনেক আগেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসটি পালনের প্রস্তাব উত্থাপিত হতো। তিনি আর কেউ নন, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর উৎসর্গ, অবদান এবং অনুপ্রেরণার বর্ণনা দেওয়া এই স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। তিনি ভবিষ্যৎ বিশ্বসমাজে মানবতা, স্বাধীনতা এবং কল্যাণ বিকাশের জন্য শান্তির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন, যেগুলো মানবজাতির জন্য স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় অত্যাবশ্যকীয়। তবে বঙ্গবন্ধু তাঁর সেই শান্তির বিশ্ব দেখে যেতে পারেননি, যেই বিশ্বে থাকবে না কোনো শোষণ, নিপীড়ন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বর্ণবাদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য বা নিরক্ষরতার অভিশাপ।

১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শান্তি অত্যন্ত জরুরি এবং তা সমগ্র বিশ্বের নর-নারীর গভীর আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটাবে এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত শান্তিই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।’ বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বের অকুতোভয় নেতাদের একজন, যাঁরা মনে-প্রাণে বিশ্বশান্তি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য লড়াই করে গেছেন। এমন একজন সাহসী নেতা, যিনি বিশ্বের অত্যাচারিত, নিপীড়িত, শোষিত এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি, পৃথিবীতে সব সময়ই বিরল।

জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে আগস্ট ১৯৭৫ সময়কালে বঙ্গবন্ধু ৫০টির বেশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠকে বা সম্মেলনে আলোচনা, মতবিনিময় বা ভাষণ দান করেন। এসবের প্রতিটিতেই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে স্বাধীনতা ও শান্তির গুরুত্বের ওপর জোর দেন এবং বিশ্বশান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য  উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে লিপ্ত জনগণের প্রতি জোরালো সমর্থনের কথা উচ্চারণ করেন।

১৯৭২ সালে বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদানের ঘোষণা দেয়। ১৯৭৩ সালের ২৩ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পদক প্রদান অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’ একই সঙ্গে তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে বিশ্বশান্তি তাঁর জীবন দর্শনের মূল নীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, সে পৃথিবীর যে প্রান্তেরই হোক না কেন, তাদের জন্য উচ্চারিত ছিল তাঁর বজ্রকণ্ঠ। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের ন্যায় দাবিকে তিনি হৃদয় দিয়ে সমর্থন করে গেছেন।

১৯৭২ সালের ২৩ নভেম্বর প্যাট্রিস লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধুকে লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয় শান্তি পদকে ভূষিত করে। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের শান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রামকে সমর্থন করার জন্য তাঁর উদ্যোগ ও উদাত্ত আহ্বান বিশ্বনেতাদের যেমন অনুপ্রাণিত করেছিল, তেমনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। শান্তি ও স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর ওই বলিষ্ঠ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ লুমুম্বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে এ পদক প্রদান করেছিল।

বঙ্গবন্ধুর সাহসী উদ্যোগ এবং বিশাল অবদান বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বনেতাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাই বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও দর্শনকে বিশ্বসমাজের কাছে পরিচিত এবং তাদের বিশ্বশান্তির লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করার জন্য যেকোনো একটি বছর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে পালনের উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘকে বিনীত অনুরোধ জানাই।

পরিশেষে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার, বিশেষ করে বিদ্যমান কভিড-১৯ প্রতিরোধ করার লড়াইয়ে, জয়ী হওয়ার জন্য জনগণের মধ্যে সহমর্মিতা এবং সম্প্রীতি স্থাপনের ওপর জোর দিতে চাই। আমরা যদি মানুষের মাঝে ভালোবাসা, মায়া-মমতা এবং আশার আলো জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম হই, তবেই পৃথিবীটা অপার শান্তিতে ভরে উঠবে। শান্তিপ্রেমীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা একদিন সফল হবে, পৃথিবীর সব মানুষ শান্তির সুশীতল ছায়াতলে বসবাস করবে, সে প্রত্যাশাই রইল।                 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা