kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ কার্তিক ১৪২৭। ২৯ অক্টোবর ২০২০। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

পেঁয়াজ যেন কূটনৈতিক সংকটের কারণ না হয়

জয়ন্ত ঘোষাল

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পেঁয়াজ যেন কূটনৈতিক সংকটের কারণ না হয়

পেঁয়াজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য। এটি আজকের নয়, অতি প্রাচীন একটি ফসল। ভারত ও বাংলাদেশের এক আদি অখণ্ড ইতিহাস আছে। সে ইতিহাস বলে আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে আয়ুর্বেদ চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক চরক তাঁর চরক সংহিতায় লিখেছিলেন যে শাকসবজির মধ্যে পেঁয়াজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাতের ব্যথা থেকে শুরু করে দৃষ্টিত্রুটি—সব ব্যাপারে পেঁয়াজ মোক্ষম দাওয়াই। আর সেই পেঁয়াজ আপাতত ভারত-বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধুত্বকেও মস্ত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। হঠাৎ নরেন্দ্র মোদির সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ফলে বাংলাদেশের মতো বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র হঠাৎই বেশ সমস্যায় পড়ে গেছে। দুই দেশের মধ্যে যে সম্পর্ক সেই ১৯৭১ সাল থেকে প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক, সে সম্পর্ককেও বিভিন্ন সময়ে নানা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। পেঁয়াজের মতো ছোট্ট ইস্যু নিয়েও দুই পক্ষের কায়েমি স্বার্থের গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে। গেল গেল রব তোলে। সব পরিশ্রম ও চেষ্টা পণ্ড করে দেয় ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত। পেঁয়াজ রপ্তানি করা হবে না। এমনই আচমকা যে পেট্রাপোল সীমান্তে পেঁয়াজভর্তি ট্রাক ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছিল, তা-ও মাঝপথে রাস্তায় আটকে রইল সরকারি নিষেধাজ্ঞায়।

ঢাকা তার প্রতিক্রিয়া জানাল মোদি সরকারকে। কারণ দুই দেশের মধ্যে চুক্তি আছে, হঠাৎ রপ্তানি বন্ধ করতে হলে তা আগাম বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়ে দিতে হবে। এবার সেটিও করা হয়নি। বাংলাদেশ সরকার বলছে, যখন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে এক হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন ইলিশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টায় আটটি ট্রাকে প্রথম চালানে ৪১.৪ মেট্রিক টন ইলিশ বেনাপোল থেকে পেট্রাপোলে রপ্তানি করা হয়েছে। ঢাকা প্রশ্ন তুলেছে যখন শেখ হাসিনার সরকার ইলিশ পাঠিয়ে ঔদার্য প্রদর্শন করল, তখন পেঁয়াজ নিয়ে ভারতের এহেন আচরণ কেন? এর আগে শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে দিল্লি এসে পেঁয়াজ বন্ধ করায় অভিযোগ তোলেন। তখনো ভারত বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এ-ও মনে পড়ে তিনি দিল্লির পাঁচতারা হোটেলের অনুষ্ঠানে পেঁয়াজ প্রসঙ্গর অবতারণা করেন। শেখ হাসিনা হিন্দিতে বলেছিলেন, ‘ম্যায়েনে ক্যুক কো বোল দিয়া অভি খানে মে পেঁয়াজ বন্ধ কর দো।’

কিন্তু এক বছর পর আবার কেন এই ধরনের আচরণ? ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। এক কর্মকর্তা বললেন, ‘সত্যি বলছি, আমরাও জানতাম না। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, আসলে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের আকাল তো একেবারে সত্য কথা। শুধু বাংলাদেশের জন্যই যে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তা তো নয়। ভারত নিজের বাজারে পেঁয়াজসংকট এড়াতে এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদনে সংকট দেখা দিয়েছে—এমন তো নয়।

এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ককে সাংবাদিক হিসেবে বেশ কিছুদিন ধরে নজর রাখি। পর্যালোচনা করি বলেই মনে হচ্ছে অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পেঁয়াজ রপ্তানির বিষয়টি কিন্তু এক নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নয়নের মণির মতো রক্ষা করা দরকার বলেই এই পেঁয়াজ রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হওয়া প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া বাংলাদেশ আয়তনে ছোট। বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাবি ঠিক কতটা? এমন একটা পরিমাণ নয়, যার জন্য ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটাই ভেঙে যাবে। ভারত অবশ্য সেটাই করেছে। বাংলাদেশ তাদের অসন্তোষ জানানোর পর জোরালো বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে ভারত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বাংলাদেশে ২৫ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। শেষবেলায় সদিচ্ছার পরিচয় দিয়েছে ভারত। কিন্তু অযথা জটিলতা না বাড়িয়ে এটা তো আগেই করা যেত।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে যে ভারত সরকার রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা করার আগে খোলা এলসির পেঁয়াজ নিয়ে সীমান্তের ওপারে আটকে আছে বহু ট্রাক, পেঁয়াজে পচন ধরলেও সেগুলো বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে না। এক নিউজ পোর্টালের বেনাপোল প্রতিনিধি ১৮ সেপ্টেম্বর লিখেছেন, বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন যে সোমবার যখন পেঁয়াজ রপ্তানির বন্ধের ঘোষণা এলো, তখন পেট্রাপোল বন্দরে পেঁয়াজবোঝাই পাঁচটি ট্রাক আটকা পড়ে যায়। এ ছাড়া বনগাঁয় আরো ৩৯টি এবং রানাঘাট রেলস্টেশনে তিনটি রেল ওয়াগন পেঁয়াজ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত এক সপ্তাহ আগে রেলের এই পেঁয়াজগুলো ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে রানাঘাট স্টেশনে আনা হয়। ওয়াগনগুলো সরাসরি বেনাপোলে আসবে না, সেখান থেকে ট্রাকে তুলে বেনাপোল আনার কথা ছিল। কিন্তু ভারত সরকার রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেগুলো আটকে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে একদিকে সীমান্তে পেঁয়াজ পচেছে, অন্যদিকে গত বছরের মতোই বাজারে পেঁয়াজের দাম লাগামছাড়া হয়ে উঠেছে। রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। দাম আরো বাড়ার শঙ্কায় মানুষও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পেঁয়াজ কিনতে শুরু করেছে।

ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই দালাল বা ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য থাকে। সংকট হলেই তাদের পৌষ মাস। তারা এই সংকট দেখিয়ে পেঁয়াজ হোর্ডিং পর্যন্ত করে।

ভারতে পাঁচ রকমের পেঁয়াজ বিশেষভাবে খ্যাত। তার মধ্যে আছে নাসিকের পেঁয়াজ, মহারাষ্ট্র মধ্যপ্রদেশের পেঁয়াজ। এ ছাড়া গুজরাট, কর্ণাটক, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের পেঁয়াজও বিখ্যাত। এবার প্রথমে খরা, তারপর প্রবল বর্ষণে পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের উৎপাদন হয় সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সরকার চেষ্টা করেও এ সংকটে পেঁয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। গত চার বছরে সবচেয়ে কম পেঁয়াজ সরবরাহের রেকর্ড ভারতে। দাম কিলোপ্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ছুঁতে চলেছে নানা প্রান্তে। করোনা আক্রান্ত অর্থনীতির মধ্যে পেঁয়াজসংকট মোকাবেলায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সরকার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে তড়িঘড়ি করে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন সংশোধনকারী একটি বিল নিয়ে আসে। লোকসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। বিল পাস করা সেখানে কঠিন কাজ নয়। কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মধ্যে তো পেঁয়াজও আছে? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকার বা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ফলে খোলাবাজারে কৃষকরাই সঠিক দাম পাবে। অর্থাৎ সরকার বলতে চাইছে ফড়িয়া বা দালালদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এ কথা সরকার বললেও বাস্তবে কি তা হবে? প্রশ্ন কৃষক সংগঠনগুলোরও। কৃষিনির্ভর রাজ্য পাঞ্জাবে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহ যেমন এই আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, ঠিক সেভাবেই এনডিএর শরিক শিরোমণি আকালি দলের নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সাবেক মুখ্যমন্ত্রী  প্রকাশ সিং বাদলের পুত্রবধূ হরসিমরত কাউর বাদল ইস্তফা দিলেন এই কৃষক আইন সংশোধনের প্রতিবাদে।

সব মিলিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পেঁয়াজ আবার বেশ বড় একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে আছে অতীতে এই দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের নেতৃত্বে বিজেপি পরাস্ত হয় শুধু পেঁয়াজসংকটের জন্য। তাই পেঁয়াজ চোখে জল এনে দেয়। ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কেও এবার পেঁয়াজ আকস্মিক ক্ষত সৃষ্টি করেছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় একবার পেঁয়াজ নিয়ে এক মজার গল্প শোনান। ইন্দিরা তখন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অর্থমন্ত্রী। বাজেট পেশ করবেন। সংসদে ঢুকে যেই বসতে যাবেন, বিরোধীরা তাঁর টেবিলের ওপর রেখে গেল পেঁয়াজের মালা। এটা অর্থমন্ত্রীকে পরতে হবে; কারণ পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। আর সংকট তীব্র। এ গল্প শুনিয়ে প্রণববাবু বলেছিলেন, পেঁয়াজ তাই ভারতের রাজনীতিতে যেন এক প্রতীক। তাই ‘পেঁয়াজ হইতে সাবধান’! পেঁয়াজ শুধু অর্থনীতি নয়, মোদির জন্য যেন কূটনৈতিক সংকট না হয়, তা দেখা দরকার।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য