kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

করোনা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা ও সম্ভাবনা

মঈনউদ্দিন মুনশী

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা ও সম্ভাবনা

বর্তমান বিশ্বের ২১৬টি দেশের তিন কোটি মানুষ মহামারি করোনা রোগে আক্রান্ত। এবং সাড়ে ৯ লাখেরও বেশি মানুষ এ রোগে মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ৭ থেকে ১০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। করোনাভাইরাসজনিত রোগ পৃথিবীতে অজানা নয়, প্রথম করোনা  (SARS CoV1) রোগের সংক্রমণ দেখা দেয় ২০০৩ সালে। এতে ৮০০ জন মৃত্যুবরণ করে; আরেক করোনা  (MERS CoV) রোগের সংক্রমণ শুরু হয় ২০১২ সালে এবং এযাবৎ এতে আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজার ৫০০ জন। প্রথম করোনা  (SARS CoV1) ভাইরাসের স্পাইক  (spike) প্রোটিনের সঙ্গে বর্তমান করোনা (SARS CoV2) ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। অথচ বর্তমান করোনাভাইরাস  (SARS CoV2) প্রথমটার তুলনায় অনেক বেশি সংক্রামক ও মারাত্মক।

পৃথিবীর চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের এখন একটাই উদ্দেশ্য—দ্রুত একটা টিকা  (vaccine) ব্যবহার্য করে মানুষকে বর্তমান করোনা  (SARS CoV2) মহামারি থেকে রক্ষা করা। প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এই টিকা সবার জন্য, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর করা অর্থাৎ বয়স্ক (৬৫ বছরের বেশি বয়স) এবং যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের জন্য। কারণ ওই বয়সের মানুষই এ রোগে বেশি মৃত্যুবরণ করেছে। সাধারণত ভাইরাসজনিত রোগের টিকা বয়স্কদের ক্ষেত্রে ভালো কার্যকর হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ২০১৭-১৮ বছরে ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা সাধারণের জন্য কার্যকর ছিল ৩৮ শতাংশ; কিন্তু বয়স্কদের জন্য কার্যকর ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। তাই একটা টিকা সাধারণভাবে কার্যকর হলেও বয়স্কদের জন্য ভালোভাবে কার্যকর না-ও হতে পারে। এটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে বোঝা যাবে যে করোনা টিকা বয়স্কদের শরীরে শক্তিশালী প্রতিরোধ (অ্যান্টিবডি) গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে কি না।

সম্প্রতি কয়েক মাস ধরে করোনার টিকা বিষয়ে অনেক কথা শোনা গেছে, যেমন—এ বছরের মধ্যেই ওই টিকা তৈরি হয়ে যাবে এবং ২০২১ সালের প্রথম দিকেই কয়েক শ কোটি ডোজ সুলভ হবে। কিছু টিকা পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে রয়েছে। তবে আমরা এখনো জানি না এই টিকা মানুষের শরীরে কতটা কার্যকর হবে এবং এতে শরীরে কী কী খারাপ উপসর্গ সৃষ্টি করবে।

এ বছরের মার্চ মাসেই গবেষকরা করোনাভাইরাসের সম্পূর্ণ কাঠামো উদ্ভাবন করেছেন। এর উপরিভাগে স্পাইক  (spike) প্রোটিন আছে, যা মানুষের নাক, মুখ, গলা ও ফুসফুসের কোষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শরীরে ঢুকে এই রোগ সৃষ্টি করে। ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন নির্ণয় টিকা তৈরির প্রথম ধাপ। মানুষের শরীরে এই প্রোটিনসৃষ্ট রোগ প্রতিহত করতে প্রয়োজন প্রতিরোধ (অ্যান্টিবডি) ক্ষমতার। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এটা দেখা হচ্ছে যে শরীরে ভাইরাসের এই প্রোটিনটা প্রবেশ করালে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে, করোনাভাইরাস মেরে ফেলতে সেটা সক্ষম হয় কি না। যদি হয়, তাহলে সব বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে কি না? যাদের টিকা দেওয়া হবে, তাদের ৯৫ শতাংশের শরীরে যদি করোনা বিধ্বংসী অ্যান্টিবডি নির্ণয় করা যায়, তাহলে সেটা খুব ভালো টিকা হবে; আর যদি ২৫, ৩০ বা ৫০ শতাংশের শরীরে এটা পাওয়া যায় তাহলে সেটা আংশিক কার্যকর বলে ধরে নিতে হবে।

বিজ্ঞানীরা বিশেষ এক পদ্ধতিতে টিকাকে বেশি কার্যকর করে তুলতে পারেন টিকার সঙ্গে অ্যাডজুভেন্ট  (adjuvent) জুড়ে দিয়ে। অ্যাডজুভেন্ট শরীরের শ্বেতকণিকার টি-সেলকে (T-cell) সক্রিয় করলে টিকা শরীরে রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম বৃদ্ধি করে। অ্যাডজুভেন্ট টিকার মাধ্যমে বেশি অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং তা দীর্ঘদিন শরীরে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। অ্যাডজুভেন্টের কার্যকারিতা বিভিন্ন বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে বয়স্কদের জন্য ভালো টিকা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন—নিউমোনিয়া ও শিংগেলসের টিকা। কভিড-১৯-এর টিকা এত তাড়াহুড়া করে তৈরি হচ্ছে যে কেউ এখনই বলতে পারবে না এর কার্যকারিতা কেমন হবে। তবে এর কার্যকারিতা ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকার মতো হলেও সেটা দিয়েই এই অসুখ হয়তো দমন করা সম্ভব হতে পারে। সাধারণত একটা কার্যকর টিকা তৈরি করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। প্রথমত একটা প্রতিষেধক বীজ (antigen) নির্বাচন করা, যেটা শরীরে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরোধ (antibody) গড়ে তুলতে সক্ষম হবে; এই বীজের ডোজ (dose) নির্ধারণ করা, এটার কার্যকারিতা পশুর ওপর পরীক্ষা করে দেখা, তারপর মানুষের ওপর পরীক্ষা করে দেখা; যদি এর কার্যকারিতা আশানুরূপ হয়, তাহলে টিকার আকারে বের করে বাজারজাত করা। করোনার টিকা এ বছরের শেষ নাগাদ প্রস্তুত হয়ে যাবে, এটা সম্ভবত চরম আশাবাদী মন্তব্য। এখনই নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না কখন এটা পরিপূর্ণ টিকা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তবে টিকা যখনই ব্যবহার করা হোক না কেন, আর এর কার্যকারিতা যা-ই হোক না কেন, এটা ঠিক যে সুস্থ থাকা পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করছে মানুষের জীবনযাপনের ওপর অর্থাৎ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা মেনে চলা—মাস্ক দিয়ে মুখ ও নাক ঢেকে রাখা, ভিড় এড়িয়ে চলা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করা ইত্যাদির মাধ্যমে এই রোগ এড়িয়ে চলা সম্ভব।

পৃথিবীর সব মানুষকে এখন থেকেই প্রস্তুত হতে হবে আগামী শীত মৌসুমে যৌথ মহামারি করোনা ও ইনফ্লুয়েঞ্জা মোকাবেলা করার জন্য। এর প্রস্তুতির জন্য আসছে অক্টোবর মাসের মধ্যেই সবাইকে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিতে হবে। ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ন্ত্রণে থাকলে করোনা নিয়ন্ত্রণে সব প্রচেষ্টা কেন্দ্রীভূত করে প্রয়োগ করা যাবে এবং এতে এই অসুখ নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে।

তবে করোনা নিয়ন্ত্রণে আরেক সম্ভাব্য সমস্যা হচ্ছে করোনাভাইরাসের টিকা তৈরি হয়ে গেলেও যদি বিশ্বের সবাই সেটা গ্রহণ করতে রাজি না হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের একজন এই টিকা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। বর্তমানে বিশেষ একটি কম্পানির তৈরি টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই টিকাপ্রাপ্ত কিছু মানুষের শরীরে করোনা রোগ ধরা পড়ায় ট্রায়ালটা কয়েক দিন বন্ধ রাখা হয়। এ ছাড়া আরো জানা গেছে, এই টিকাপ্রাপ্ত বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবকের উচ্চমাত্রার জ্বর হয়েছে। তাই এসব কারণে কিছু মানুষ হয়তো এই টিকা গ্রহণ করতে রাজি না-ও হতে পারে। তাহলে এই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কী করে সম্ভব হবে? তাহলে কি আমাদের অপেক্ষা করতে হবে করোনা রোগজনিত প্রতিরোধ (antibody) তৈরি হওয়ার জন্য। অর্থাৎ বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ রোগাক্রান্ত হয়ে যাওয়ার ফলে যখন তাদের শরীরে প্রতিরোধক (antibody) তৈরি হয়ে যাবে, তখন সমাজ ও দেশ হার্ড ইমিউনিটি দ্বারা সংরক্ষিত হবে। তবে শেষ পর্যন্ত কিভাবে এই রোগ নিয়ন্ত্রিত হবে, তা শুধু ভবিষ্যৎই বলে দিতে পারবে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে পৃথিবীতে সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ আগেও ঘটেছে এবং সম্ভবত ভবিষ্যতেও ঘটবে। তাই বিশেষ একটা অসুখের টিকা তৈরি হয়ে গেলেই সর্বোত্তম অর্জন ঘটে যাবে না, যতক্ষণ না আমরা মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ বিষয়টা পুরোপুরি জানতে পারি, বিশেষ করে বয়স্কদের এবং রোগ জর্জরিত দুর্বল মানুষের ক্ষেত্রে। এটা জানতে পারলে যেকোনো সংক্রামক রোগের কার্যকর টিকা উদ্ভাবন সহজ হবে এবং মহামারি মোকাবেলায় মানুষ এত অসহায় হয়ে পড়বে না।

 লেখক : সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ, সুমা বারবারটন হসপিটাল, ওহাইও, যুক্তরাষ্ট্র; সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, নর্থইস্ট ওহাইও মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র; ফেলো, যুক্তরাষ্ট্র সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ সমিতি

মন্তব্য