kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

কভিড-১৯ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মহামারির প্রকোপ না কমলেও নানা বিধি-নিষেধ তুলে দেওয়ায় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে আশাবাদের সঙ্গে অতি আশাবাদও লক্ষ করা যাচ্ছে, যা বিপদের কারণ হতে পারে। তাই আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো যেন স্থায়ী হয়, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন যেন টেকসই হয়, সে জন্য কিছু বিষয়ে আমাদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার।

মহামারি আমাদের স্বাস্থ্য খাতকে মূল চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাই টেকসই উন্নয়নের পথে এখন নতুন বাস্তবতায় প্রথমেই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক সমস্যাগুলো দূর করার প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। আমাদের আগে থেকেই স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত, পরিবহন খাত, সামাজিক সুরক্ষা খাত এবং অর্থনীতিতে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা মোকাবেলা। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জগুলো নতুন বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে। কারণ করোনা এবং আগের চ্যালেঞ্জগুলো মিলিয়ে একটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটাকে সহজভাবে নিলে হবে না। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোয় এদিক-সেদিক কিছু উন্নতি হচ্ছে, প্রতিযোগিতা এসেছে, এটা ভালো দিক। আমাদের লোকজনের প্রাণবন্ততা, কাজ করার যে উদ্যম, সাধারণ মানুষের যে কর্ম্যোদ্দীপনা এর মধ্য দিয়ে সেটা প্রকাশ পায়। তবে এ নিয়ে আত্মপ্রসাদে ভোগার কোনো সুযোগ নেই যে আমরা আলাদিনের চেরাগ পেয়ে গেছি। এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে যে খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থা হয়েছে। কিন্তু এমন কিছু বলার জন্য আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। মূল কথা হচ্ছে, এই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা টেকসই কি না দেখতে হবে। অতীতে দেশকে বিভিন্ন সংকট কাটিয়ে উঠতে দেখেছি। কিন্তু এবারের সংকট একটা দীর্ঘমেয়াদি বিষয় এবং বিশ্বব্যাপী ক্ষতিকর প্রভাব রেখেছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে, অতীতের সংকটগুলোর মতো এত সরল নয়। এবারের সংকট অনেক জটিল ও বহুমুখী, যা আমাদের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকেও আরো তীব্র করে তুলেছে।

এই নতুন বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে হলে পাঁচটি বিষয়ে আমাদের গুরুত্বসহকারে নজর দিতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনসহ উন্নয়নে আমাদের যেসব পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যদি প্রকৃতপক্ষে বাস্তবায়ন করতে চাই, তাহলে আমাদের এই পাঁচটি বিষয়ে অবশ্যই কাজ করতে হবে।

প্রথমত, জন-অংশগ্রহণ। সব ধরনের উন্নয়নকাজে জনগণের অংশগ্রহণ লাগবে। এ জন্য আমাদের সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অতীতের মতো শুধু সরকারি প্রচেষ্টায় নির্ভর করলে চলবে না। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উন্নয়ন সম্ভব হবে না। মানুষের অংশগ্রহণের সুবিধা কী? সেটা হলো একটা থার্ড আই অর্থাৎ তৃতীয় নয়ন হিসেবে উন্নয়নকাজ পরিবীক্ষণ বা মনিটর করা। মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে এই তৃতীয় নয়নের কাজটা হয়। উদাহরণ হিসেবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি রাস্তা নির্মাণের প্রকল্পের কথা বলা যায়। স্থানীয় মানুষ যদি না জানে যে এটা কারা করছে এবং এর সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা কী, তাদের অধিকার কী, তাহলে তারা তা মনিটর করবে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে চুরি-ডাকাতি হবে, যেটা এখন হচ্ছে। অতএব মানুষকে যদি উদাসীন করে রাখা হয় এবং ওপর থেকে প্রকল্প চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সুফল আসবে না।

দ্বিতীয়ত, সুশাসনের খুব দরকার। আমরা প্রত্যক্ষ করছি এখন অনেক প্রতিষ্ঠান—সরকারি বলুন বা আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান, তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাসের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। নারায়ণগঞ্জে ১৬-১৭ বছর ধরে গ্যাসের লাইনে লিকেজ রয়েছে; কিন্তু কোনো মনিটরিং নেই। দুঃখজনক যে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেখানে কোথায় প্যারালাল লাইন রয়েছে তিতাস জানে না। তারা বলছে, কাগজপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সুশাসন ও জবাবদিহির অভাবেই এমনটা ঘটেছে। দেশে কোনো ইনস্টিটিউশনাল মেমোরি বা প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ডপত্র রাখার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি, এই ঘটনায় তা-ও দেখা গেল। ফলে কোনো ঘটনা ঘটলে কর্মকর্তারা একটা কথা বলেন যে তাঁর জানা নেই, আগে যিনি ছিলেন তিনি বলতে পারবেন। এটা কোনো কথা হলো? এটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক।

টেকসই উন্নয়নের জন্য দুর্নীতি বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। এ জন্যই সুশাসন দরকার, যার সঙ্গে আইনের শাসনের সম্পর্ক জড়িত। দুর্নীতির জন্য কারো চাকরি চলে গেল, সাময়িক বরখাস্ত হলো—সেটাই সব নয়। এর মধ্যে ক্রিমিনাল লায়াবিলিটির বিষয়ও রয়েছে, যেটা নারায়ণগঞ্জে ঘটেছে। সেদিকেও নজর দিতে হবে।

তৃতীয় করণীয় হলো, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। এটা বারবার বলা হচ্ছে। স্থানীয় সরকারকে আরো ক্ষমতা দেওয়া দরকার। তাদের জন্য যথাযথ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া দরকার। কিন্তু সচিবালয় থেকে বা মহাপরিচালক পর্যায়ের লোক দিয়ে সব কিছু করা হয় বলে আমরা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছি। কেন্দ্রীয়ভাবে সব কিছু করা হলে দুর্নীতি হয়, সেটার বড় প্রমাণ আমরা পাচ্ছি স্বাস্থ্য খাত ও শিক্ষা খাতে। কারিগরি খাতেও অনেক প্রকল্প দেখছি, নিছক কোনো অস্তিত্ব নেই। বিকেন্দ্রীকরণ হলে আমি মনে করি অন্তত স্থানীয় লোকজন সচেতন থাকবে এবং বুঝতে পারবে যে তাদের জন্য একটা প্রকল্প আসছে এবং সরকার তাদের দায়িত্ব দিয়েছে।

চতুর্থ হলো, উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ। এই যে এত সব ভৌত অবকাঠামো দেখা যাচ্ছে এবং আইটি সুবিধার কথা শোনা যাচ্ছে, তা কিন্তু কতগুলো নির্দিষ্ট জায়গাকে কেন্দ্র করে হচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু বড় শহর এবং বড় কয়েকটা জেলায় এই উন্নতি দেখা যাচ্ছে। আমরা মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট সার্ভিস নিয়ে কথা বলি। কিন্তু এখনো ৫০ শতাংশের কাছাকাছি যারা বেশির ভাগই গ্রামে বাস করে তারা ইন্টারনেট সার্ভিসসহ তথ্য-প্রযুক্তির অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

পঞ্চমত, আর্থিক সুবিধার প্রসারতা বা ‘অ্যাককেস টু ফিন্যানসিং সার্ভিসেস টু অল’ (সবার জন্য আর্থিক সেবা)। আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলে থাকি। গ্রামের সব মানুষ কি এই সুবিধা পাচ্ছে? মোটেও না। এই সময়ে কৃষিক্ষেত্রে ঋণ সন্তোষজনক পর্যায়ে যায়নি। করোনাকালীন প্যাকেজে তো বড় একটা অংশ ছিল কৃষিক্ষেত্রের জন্য। কিন্তু ঋণ বিতরণ পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক। একই অবস্থা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ক্ষেত্রেও। এখন গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে গ্রামের মানুষ ঝুঁকছে। আমরা শুধু মুখে বলি যে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ করতে হবে। বাস্তবে তা করতে হলে এর সহযোগী হিসেবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিই। ইদানীং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের খুব প্রশংসা করা হচ্ছে। কিন্তু এর কোনো সুবিধা কি গ্রামের মানুষ পাচ্ছে? এর কোনো ঋণ বিতরণের অনুমতি নেই। বরং এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো গ্রাম থেকে টাকা নিয়ে আসছে শহর ও কেন্দ্রে; যেটাকে গ্রামীণ সম্পদের শহরে স্থানান্তর বলা হয়। অথচ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য এমন ছিল না। এখন টাকা আহরণের বিরাট একটা সোর্স হয়ে গেল এজেন্ট ব্যাংকিং। নানাভাবে দিন দিন গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শহরে সম্পদ স্থানান্তরের ঘটনা বাড়ছে। এ জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা দায়ী। সুতরাং প্রকৃত আর্থিক সুবিধার প্রসারতা যদি গ্রামে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা পৌঁছে না দিই, তাহলে যথার্থ উন্নয়ন হবে না। আসন্ন চ্যালেঞ্জ থেকেও আমরা বেরিয়ে আসতে পারব না।

টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উল্লিখিত পাঁচটি উপায়—জন-অংশগ্রহণ, সুশাসন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ ও আর্থিক সুবিধার প্রসারতা ছাড়াও কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণে আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। দিন দিন বেকার যুবকের সংখ্যা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু প্রকল্প করা দরকার। যেমন—ভারতে রুরাল এমপ্লয়মেন্ট প্রগ্রাম রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের একটি কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এমন একটি কর্মসূচি ছিল। এই সরকারও এ ধরনের কর্মসূচি নিয়েছিল। তাতে তো কতগুলো কর্মহীন লোকের ছয় মাস বা এক বছরের জন্য কিছুটা আয়ের সংস্থান হয়। এটা এখন গ্রামের জন্য খুব বেশি করে দরকার। কারণ অনেক লোক গ্রামে চলে যাচ্ছে।

গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের জন্য প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কথা উল্লেখ করেছি। এ ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণের জন্য কৃষির উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থান জরুরি। গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির সঙ্গে গ্রামীণ বিচারব্যবস্থারও উন্নতি করতে হবে। যেকোনো উন্নয়নেই আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি বিষয়। স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা যেন স্থানীয়ভাবে সমাধান করা যায়, সেভাবে স্থানীয় সরকারগুলোকে ক্ষমতায়ন করতে হবে। আবার সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিক বা জনপ্রতিনিধি যদি স্থানীয় সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন সেটাও ভালো হবে না, এখন যেটা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন তাদের উন্নয়নে সিদ্ধান্ত নেবে। সেখানে একজন সংসদ সদস্য স্থানীয় জনগণের বিবেচনার জন্য পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত চাপানোর চেষ্টা করলে সেটা জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। গ্রামের উন্নতির জন্য সামাজিক সৌহার্দ ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে এবং বাইরের হস্তক্ষেপ কমাতে হবে।

 

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক। অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা