kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

এই মহামারিতে ড্রপ আউটের শিকার হবে মেয়েরা

মালালা ইউসুফজাই

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এই মহামারিতে ড্রপ আউটের শিকার হবে মেয়েরা

কভিড-১৯ এসে আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতা ও অঙ্গীকারের শক্তি উন্মোচন করেছে। এই মহামারি স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ক্ষতি ছাড়াও আমাদের বিশ্বকে ক্রমবর্ধমান এক শিক্ষা জরুরি অবস্থার (এডুকেশন ইমার্জেন্সি) মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছি, তার ক্ষতিকর প্রভাব কয়েক প্রজন্মের শিশুর ওপর পড়বে।

মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে বেশির ভাগ দেশ এ বছর তাদের স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। এই শিক্ষা বিঘ্নের কুফল সবার ওপরই পড়বে বটে, তবে অনগ্রসর শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারগুলোকেই এর খারাপ ধকল সবচেয়ে বেশি বইতে হবে, বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে। করোনাভাইরাসে শিক্ষার পরিণাম শেষ পর্যন্ত স্কুল বন্ধ থাকার সময়টুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এর সবচেয়ে বড় শিকার হবে প্রান্তিক শ্রেণির মেয়ে শিক্ষার্থীরা।

মহামারিতে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় ছেলেদের তুলনায় ওই সব মেয়েরাই ঝরে পড়ার (ড্রপ আউটের) অধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ মহামারিতে নারী ও মেয়েদেরকেই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ২০১৪-১৫ সালের ইবোলা-পরবর্তী সময়েও দেখা গেছে, সিয়েরা লিওন, গিনি, লাইবেরিয়ায় স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মেয়েশিশুদের ভর্তির হার কমে যায়। তখন দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়া, গৃহস্থালির দায়িত্ব পালন, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে এবং কৈশোরিক গর্ভাবস্থার মতো বিষয়গুলো অনেক মেয়েকে স্কুলে ফিরতে দেয়নি।

মালালা ফান্ড হিসাব করে দেখেছেন, যদি ওই একই হারে ঝরে পড়া বৃদ্ধি পায়, তাহলে চলমান মহামারির পর প্রায় দুই কোটি স্কুলবয়সী মেয়ে কখনোই আর শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারবে না। এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে দরিদ্র দেশগুলো শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ সংকটে পড়তে পারে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, দূরশিক্ষণের মতো বিকল্প সমাধান সত্ত্বেও মহামারিকালে স্কুল বন্ধ থাকায় ৪৫ কোটি শিশু শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইউনেসকোর বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে প্রকাশিত নতুন তথ্য বলছে, কভিড-১৯ আসার পর প্রতিবছরের ‘বৈশ্বিক শিক্ষা তহবিল বৈষম্য’ বেড়ে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

কভিড-১৯ এসে নানা ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যগুলোকে আরো বাড়িয়েছে। মহামারির আগে ১২ কোটি ৯ লাখ মেয়ে স্কুলের বাইরে ছিল এবং কোটি কোটি মেয়ে স্কুলে পড়লেও তারা ন্যূনতম শিক্ষণ লক্ষ্য অর্জন করতে পারত না। এই বৈষম্যও বেড়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হচ্ছে। সেখানে নেতারা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কিংবা অগ্রগতির নতুন পথ তৈরি করার পছন্দটাই বেছে নেবেন।

তবে এই স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরায় কিন্তু স্কুলগুলো অর্থ সংকটে ভুগবে, শিক্ষকরা অবমূল্যায়নের শিকার হবেন। মূলকথা হচ্ছে, শিক্ষার মতো একটি সামাজিক পণ্যের (পাবলিক গুডস) ক্ষেত্রে মুনাফাকেই প্রাধান্য দেবে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এই স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা মানে হচ্ছে, ক্ষতিকর লৈঙ্গিক প্রথাকেই ফিরিয়ে আনা, যা মেয়েদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে দেয় এবং তাদের সহিংসতা ও শোষণের অভিজ্ঞতা বাড়ায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার অর্থ দাঁড়াচ্ছে আমাদের প্রচলিত মূল্যবোধ ও আচরণের পুনরুৎপাদন ফিরিয়ে আনা, যা লিঙ্গবৈষম্য বাড়ায়।

এখন আমাদের নেতারা শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য উদ্দীপনা সৃষ্টি করে একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের পথে প্রথম পদক্ষেপটা নিতে পারেন। সে জন্য প্রতিটি দেশে শিক্ষায় প্রাপ্য দেশীয় সম্পদের বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। গত বছর নিম্ন আয়ের ২৪টি দেশ শিক্ষায় যে ব্যয় করেছে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে বিদেশি ঋণ পরিশোধে। গত এপ্রিলে জি-২০-এর অর্থমন্ত্রীরা কিছু দেশের ঋণ পরিশোধ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা নিয়ে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাংকের মতো বৃহত্তর ঋণ প্রদানকারী বেসরকারি সংস্থাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। শিক্ষা নিয়ে দেনদরবার করা ব্যক্তিরা ঋণদাতা সরকারগুলোকে তাদের দেওয়া ঋণ পরিশোধ ২০২২ সাল পর্যন্ত স্থগিত রাখতে এবং কিছু ঋণ পরিশোধ বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। এটাই হবে ওই সব দেশের তহবিল মুক্ত করার দ্রুততম পদক্ষেপ। এ ছাড়া আমরা বৈশ্বিক করনীতি সংস্কারের মাধ্যমেও নিম্ন আয়ের দেশগুলো থেকে অর্থ নিয়ে আসার প্রবাহ কমাতে পারি, যাতে দেশগুলো মেয়েদের স্কুলে ফেরানোর কাজে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারে।

সুতরাং পরিস্থিতি যেভাবে ছিল সেভাবে ফিরে আসা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং এর পরিবর্তে চলার পথে বিশ্বের নতুন অঙ্গীকার দরকার, যেখানে প্রত্যেকটি মেয়ে শিক্ষা নিতে পারে এবং নেতৃত্ব দিতে পারে।

ছোটবেলায় পরিস্থিতি আমার শিক্ষাকে ডুবিয়ে দিয়েছিল, আমার ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছিল, যা ছিল আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এ মুহূর্তে মেয়েদের একটি প্রজন্ম একই পরিস্থিতিতে পড়েছে। এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে হলেও বিশ্বনেতারা যখন এই সপ্তাহে একত্র হচ্ছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের এগিয়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করবেন। তবে আমি আশা করব, তাঁরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং আমাদের সব শিশুকে একটি উন্নত বিশ্ব গড়ার সর্বোত্তম সুযোগ দেবেন।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

লেখিকা : নোবেল বিজয়ী ও মালালা ফান্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা