kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

এশিয়াকে বিপর্যয়ের সীমায় নিয়ে যাচ্ছে চীন

জেমস কিঞ্জ, কাথ্রিন হিলে, ক্রিশ্চিয়ান শেফার্ড, অ্যামি কাজমিন

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এশিয়াকে বিপর্যয়ের সীমায় নিয়ে যাচ্ছে চীন

চীনের দক্ষিণ ও পূর্ব সীমান্ত উদ্বেগ ও সংঘর্ষের আতঙ্কে ঘেরা। এ ঘের হয় ভুল হিসাবের ফল অথবা পরিকল্পিত। সংঘর্ষের সম্ভাব্য স্থানগুলো পরিচিত—যেমন তাইওয়ান; দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জ এবং ভারতের হিমালয় সীমান্ত। কোনো কোনো ভাষ্যকার এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন, এর ফলে হঠাৎ করে সামরিক সংঘর্ষ বাধার ঝুঁকি রয়েছে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অংশগ্রহণ থাকতে পারে।

চীনের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান শুয়েতং বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বাধার ঝুঁকি খুব কম, তবে ক্ষুদ্র পরিসরে সামরিক সংঘাত বাধতে পারে। ই-মেইলে পাঠানো নোটে ইয়ান বলেন, সরাসরি যুদ্ধ এবং সামরিক সংঘাতের মধ্যে গুণগত পার্থক্য রয়েছে। তাঁর মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল দ্বন্দ্বকে ‘পাওয়ার কম্পিটিশন’ বলা যেতে পারে এবং দুই পক্ষের মধ্যে ‘পাওয়ার গ্যাপ’ যত কম হবে ‘পাওয়ার কম্পিটিশন’ ততই তীব্র হবে।

কিন্তু কী কারণে বেইজিংয়ের শক্তিমত্তা আচরণ তার পরিসীমায় বাড়ছে? একই সঙ্গে কেনই বা চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেকে সরাসরি শত্রুতার দিকে পরিচালিত করছে? এর উত্তরে বিশ্লেষকরা বেশকিছু এলাকায় যেমন হংকং ও শিনচিয়াংয়ে দমন অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট চীনের অভ্যন্তরীণ অনিরাপত্তার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাঁরা বলতে চাচ্ছেন, ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা শি চিনপিংয়ের নেতৃত্বকে এসব ব্যাপারে ইন্ধন জোগাচ্ছে। করোনাভাইরাসও চীনের জন্য একটা সুবিধাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দিয়েছে বলে মনে হয়।

তাইওয়ান একটা কারণ

গত আগস্টে তাইওয়ানের নিকটবর্তী এলাকায় সামরিক মহড়া চালিয়েছে চীন। তারা বলেছে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্য এ মহড়া। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যালেক্স আজার বেইজিং সফর করেন; ১৯৭৯ সালের পর তিনিই সর্বোচ্চ মার্কিন কর্মকর্তা, যিনি চীন সফর করলেন। পিপলস লিবারেশন আর্মির কর্নেল ঝাং চুনহুই বলেছেন, সম্প্রতি কিছু বড় রাষ্ট্র তাইয়ান ইস্যুতে লাগাতার নেতিবাচক পদক্ষেপ করছে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতাকামীদের প্রতি ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। তারা তাইওয়ান প্রণালির শান্তি ও স্থিতিশীলতায় মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের একজন উপদেষ্টা শির উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, শি কমিউনিস্ট পার্টিতে দমন-নিপীড়ন চালাচ্ছেন। তিনি বেইজিংয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছেন।

চীনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের ওই উপদেষ্টা বলেছেন, চীন তার অভ্যন্তরে বিতিকিচ্ছিরি একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আমরা উদ্বিগ্ন, শি চিনপিং হয়তো স্থিতিশীল হবেন না। তামকাং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক আলেকজান্ডার হুয়াং মনে করেন, পরিস্থিতি এমন হয়ে থাকলে সংঘর্ষের ঝুঁকি দ্রুত বাড়বে। অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চীনের বিভিন্ন সামরিক সংঘর্ষে বা যুদ্ধে ভূমিকা পালন করেছে, বরাবরই তা ঘটেছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের এ বিষয়টি ১৯৫০ সালে মাও জে দং উল্লেখ করেছিলেন। এখনো আবার আমরা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে একটা সম্পর্ক দেখতে পাচ্ছি। পিএলএর শক্তি-সামর্থ্যের নিরিখে চীনের দৃঢ়তা ও শক্তিমত্তা প্রদর্শনের প্রবণতা বেড়েছে। চীনের নৌবাহিনী এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী, তাদের সামরিক বিমানের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, তাদের মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার ক্রমেই বড় হচ্ছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ওই অঞ্চলের সম্ভাব্য সব জায়গায় মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম। ২০১৭ সালে শি বলেছেন, চীন এখন অনেক সংহত, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে। চীন এখন মধ্যমঞ্চের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ২০১৩ সালেই চীন ন্যূনতম ফোকাসে থেকে চলার নীতি ত্যাগ করেছে। ১৯৭০ সাল থেকে তারা এ নীতি মেনে চলছিল। এখন তারা কিছু ‘অর্জন করার’ নীতি অবলম্বন করেছে—যাকে বলা হয় ‘ফেনফা ইউওয়েই’। চীনের লৌহমানব শি প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা তুলে দিয়েছেন। তিনি এমন এক নীতি দাঁড় করিয়েছেন যাকে রাজনৈতিক পরামর্শক ম্যাথু জনসন ‘টোটাল সিকিউরিটি প্যারাডাইম’ আখ্যা দিয়েছেন।

ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন (এনএসসি) চীনের একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। ২০১৪ সালে এটি উদ্বোধন করার সময় প্রদত্ত ভাষণে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং বলেন, নিরাপত্তা নীতি বা সিকিউরিটি পলিসি হচ্ছে এমন এক নীতি, যা জীবনের সব ক্ষেত্রকে এক ছায়াতলে সমন্বিত করে। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন তথা এনএসসিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, তথ্য নিরাপত্তা, প্রতিবেশের নিরাপত্তা, সম্পদের নিরাপত্তা ও পারমাণবিক নিরাপত্তাকে সমন্বিত করতে হবে। তিনি বলেন, বেইজিং দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকেও মোকাবেলা করছে। ধারণা করা হয়, শিনচিয়াংয়ের রি-এডুকেশন ক্যাম্পগুলোতে মুসলিম এথনিক গ্রুপগুলোর প্রায় ১০ লাখ লোককে রাখা হয়েছে এবং হবে। এ বিষয়টি উল্লেখ করার মতো একটি পয়েন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্টিনের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের শিনা গ্রেইটেনসের অভিমত হলো, চীনের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমবর্ধমান হারে দেশের ভেতরে শাসকগোষ্ঠীর নিরাপত্তাচিন্তারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। চায়নিজ কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) নানা বিষয়কে এখন সিরিয়াস হুমকি হিসেবে দেখছে। এসব বিষয় আগে তারা মোটামুটি সহ্য করে নিত।

হিমালয়ে শক্তি প্রদর্শন

চীনে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম বাম্বাওয়ালে বলেছেন, গত জুনে হিমালয় সীমান্তে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষে ২১ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে। সেখানে চীন হাজার হাজার সৈন্য এবং সমরাস্ত্র মোতায়েনের পরিপ্রেক্ষিতে সংঘর্ষের ওই ঘটনা ঘটে। তাঁর মতে, ওই ঘটনা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, সেটা পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সুচিন্তিত পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়েছে। তারা স্ট্র্যাটেজিক লেভেলে এ ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে চীন জাগ্রত হয়েছে এবং এ কথা অবশ্যই মান্য করতে হবে, চীন এশিয়ায় ভিন্ন ধরনের এক শক্তি। এবং এটাও মান্য করতে হবে যে তাদের নির্ধারিত ধারাপাতেই অন্যান্য শক্তির অবস্থান। বাম্বাওয়ালে আরো বলেন, তারা বলছে একবিংশ শতাব্দী এশিয়ার শতাব্দী নয়, এটা নিরঙ্কুশভাবে চীনের শতাব্দী।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের ইউন সান বলেছেন, হিমালয়ের গালওয়ান উপত্যকায় ভারতের অবকাঠামো নির্মাণকে চীন মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে এবং তারা ভেবেছে এর একটা জুতসই জবাব দিতে হবে। চীনা পরিপ্রেক্ষিতে শাস্তির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে এবং শিক্ষাটা নিতে হবে।

শক্তিমত্তা প্রদর্শনের বর্ধমান মানসিকতা পূর্ব চীন সাগরের সেনকাকু ও দিয়াওউ দ্বীপের চারপাশেও দেখা গেছে। এসব দ্বীপের অধিকার নিয়ে চীন ও জাপানের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। গত জুলাইয়ে নিরাপত্তাবিষয়ক এক শ্বেতপত্রে জাপান বলেছে, দ্বীপগুলোর দাবি নিয়ে চীন নিরন্তর চাপ তৈরি করছে, তারা সামুদ্রিক অভিযানের কার্যক্রম বাড়াচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য এগুলোর বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করা।

দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক শক্তি প্রদর্শনও উত্তেজনার একটি কারণ। এটা যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রবৃত্ত করছে। আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ মানে এক যৌথ বিবৃতিতে ওই সাগরে আত্মসংবরণ এবং নন-মিলিটারাইজেশনের আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আসিয়ান-সহযোগীদের পাশে থাকার কথা বলেছেন, আইন মেনে চলার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বেইজিং সেখানে আগ্রাসী ও নিবর্তনমূলক নীতি অবলম্বন করেছে। তাদের কর্মকাণ্ডে পরিবেশের বিপর্যয়ও ঘটেবে।

 

লেখক: হংকং, তাইপে, বেইজিং ও নয়াদিল্লিতে ফিন্যানশিয়াল টাইমসের সাংবাদিক

সূত্র: ফিন্যানশিয়াল টাইমস

ভাষান্তর: সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা