kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে অপচয় বন্ধ করুন

ড. মোহা. হাছানাত আলী

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে অপচয় বন্ধ করুন

খিচুড়ি খাননি বা এর রন্ধনপ্রক্রিয়া কমবেশি জানেন না, এমন মানুষের সংখ্যা দেশে খুবই কম। খিচুড়ি আমাদের দেশের অত্যন্ত প্রিয় একটি খাবার। শহর-গ্রাম সব জায়গায় এর কদর প্রশ্নাতীত। বৃষ্টির দিন হলে তো কথাই নেই। খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা রসনাবিলাসীদের অতি প্রিয়। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ডাইনিংয়ে সকালের নাশতায় খিচুড়ির সঙ্গে আলুভর্তা খাননি এমন গ্র্যাজুয়েট খুঁজে পাওয়া ভার। সেই খিচুড়ি রান্না ও পরিবেশন শিখতে এবার বিদেশ যাবেন বেশ কিছু কর্মকর্তা। দেশে এসে তাঁরা নাকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কার্যক্রমকে আরো উন্নত, কার্যকর ও গতিশীল করতে অবদান রাখবেন। এমন এক অদ্ভুত প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এমন এক অবাস্তব প্রস্তাব চারদিকে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণের বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মারফত জানা যায়, সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার হিসেবে স্বাস্থ্যসম্মত খিচুড়ি খাওয়ানো হবে। বর্তমানে দেশের ১৬টি উপজেলায় পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে প্রায় এক হাজার বিদ্যালয়ে সপ্তাহে তিন দিন দুপুরে রান্না করা খিচুড়ি শিক্ষার্থীদের খাওয়ানো হয়। চলমান প্রকল্পটি সারা দেশে চালু করতে ১৯ হাজার ২৯০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৫০০ কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠিয়ে খিচুড়ি রন্ধন ও পরিবেশন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা বিবেকবান প্রত্যেক মানুষের মনে চরমভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে ৫০ জন সরকারি কর্মকর্তাকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঠিয়ে খিচুড়ি রান্না ও পরিবেশন শিখতে ৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের চরম অপচয়। বিষয়টি এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে ৫০ জন কর্মকর্তার বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা চেয়েছে। এ ছাড়া দেশে প্রশিক্ষণের জন্য আরো ১০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এই রান্না করা খাবার বিতরণ কর্মসূচির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। এর আওতায় পাঁচ বছর ধরে প্রায় এক কোটি ৪৮ লাখ শিক্ষার্থীকে পুষ্টিকর বিস্কুট ও রান্না করা খিচুড়ি পরিবেশন করা হবে। ৫০৯টি উপজেলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই খাবার পরিবেশন করা হবে।

তবে পরিকল্পনা কমিশন এই প্রকল্পের নানাবিধ ব্যয় কমাতে বলেছে। বিদেশ সফরের জন্য দুটি দলে অল্পসংখ্যক কর্মকর্তাকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাঠাতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া দেশেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ গ্রহণের বিষয়ে যৌক্তিকতা কী, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

সমালোচনার মুখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আকরাম-আল-হোসেন জানিয়েছেন, খিচুড়ি রান্নার প্রশিক্ষণের জন্য নয়, অন্যান্য দেশ স্কুলে ‘মিড ডে মিল’ দুপুরের খাবার কিভাবে বাস্তবায়ন করে সে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে মোট প্রকল্পের অতি অল্প অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এই অর্থ ব্যয় কোনো অপচয় নয়; বরং অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। এ দেশে বহু বোর্ডিং স্কুল আছে। হেফজখানা আছে। এতিমখানা আছে। সেখানে তিন বেলা রান্না করে খাওয়ানো হয়। অত্যন্ত সুচারুরূপে ও দক্ষতার সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে তারা এই কার্যক্রম সম্পন্ন করে আসছে। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ডাইনিংগুলোয় তিন বেলা রান্না করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার পরিবেশন করা হয়। এতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। দেশে প্রচুর শিক্ষার্থী হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করে। সেখানেও রান্না করা হয়। পরিবেশনও করা হয়। প্রশিক্ষণের কোনো প্রয়োজন হয় বলে আমাদের জানা নেই। আমি নিজে আমার পূর্বতন বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বড় হলের প্রভোস্ট ছিলাম। পাঁচ শতাধিক ছাত্রের জন্য ডাইনিংয়ে তিন বেলা রান্না হতো। ছাত্রদের মাঝে তা পরিবেশনও করা হতো। প্রায় প্রতিদিন সকালের নাশতার মেন্যুতে থাকত খিচুড়ি আর আলুভর্তা। এর জন্য কারো কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়নি। আসলে প্রকল্পের টাকায় বিদেশভ্রমণ সরকারি কর্মকর্তাদের ফ্যাশনে পরিণত হয়ে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার অপ্রয়োজনীয় বিদেশভ্রমণকে নিরুৎসাহ করার তাগিদ দিলেও প্রকল্পের টাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণকে রোধ করা যাচ্ছে না।

শুধু খিচুড়ি রান্না করতে অভিজ্ঞতা অর্জন নয়, বরং এর আগেও আমরা দেখেছি, যেকোনো সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই প্রকল্পের টাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করে অভিজ্ঞতা অর্জন বা প্রশিক্ষণের নামে সরকারি কর্মকর্তারা দল বেঁধে বিদেশভ্রমণ করেন। কিছুদিন আগে পুকুর খননে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য কিছু কর্মকর্তার বিদেশে যাওয়ার একটি খবর সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। নদীমাতৃক বাংলাদেশ পুকুর, নদী-নালা, খাল-বিলে ভরপুর। সেই দেশের মানুষ যখন পুকুর খননের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দল বেঁধে সরকারি টাকায় বিদেশভ্রমণ করতে যান, তখন লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। যেসব সরকারি কর্মকর্তা এমন সব আজগুবি অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য পিকনিক মুডে বিদেশে গিয়ে আমোদ-ফুর্তি করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করেন, তাঁদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা উচিত। দেশে এমন কোনো কর্মকর্তা কি আছেন, যিনি পুকুর কিভাবে খনন করেন তা জানেন না?  মোটেই তা নয়।

করোনাকালে যখন দেশের সার্বিক অর্থনীতি অনেকটা স্থবির, দেশের দীর্ঘমেয়াদি বন্যা, সুপার সাইক্লোন আম্ফানের প্রভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা বেশ মন্থর, বিদেশি বিনিয়োগ অপ্রতুল, চাকরি হারিয়ে দিশাহারা বহু মানুষ, দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই অচল, বিদেশি শ্রমবাজার ঋণাত্মক, সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে খিচুড়ি রান্না, পুকুর খননের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিদেশে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।

করোনাকালে যাঁরা অপ্রয়োজনে প্রকল্পের টাকায় অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে বিদেশ যাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে প্রস্তাব প্রণয়ন করতে পারেন, তাঁদের দেশপ্রেম, রুচিবোধ ও বিবেকবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। খিচুড়ি রান্নার অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে বিদেশভ্রমণ করার পরিকল্পনার যেসব হর্তাকর্তা জড়িত, তাঁদের বিবেকবোধ বলে কি আর কিছুই নেই?

শুধু সরকারি টাকা অপচয় করা বা নয়ছয় করার জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে বিদেশভ্রমণ বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন সরকার করোনাকালীন আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যায় নিপতিত গ্রামীণ অর্থনৈতিক মন্দাকাল পার করছে, চাকরি হারিয়ে দিশাহারা নিম্নমধ্যবিত্তের মানুষ, শিল্প-কারখানায় উৎপাদনের গতি মন্থর, রেমিট্যান্সের চাকা ততটা সচল নয়, বিদেশে কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে কমে আসছে—এমন একটি জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের বিলাসী প্রস্তাব যারা প্রস্তুত করতে পারে, তাদের শুধু ধিক্কার নয়, চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনাটা জরুরি। এ কাজে জড়িতদের বিবেকবোধ এবং জাতির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা আজকে চরমভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। তবে দেশে শুধু এই খিচুড়ি অভিজ্ঞতা অর্জনই নয়, এ রকম বহু অপ্রয়োজনীয় কাজে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশভ্রমণ রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। করোনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুকেই স্থবির করেছে সত্য, কিন্তু স্থবির করতে পারেনি দুর্নীতিকে, বন্ধ করতে পারেনি সরকারি কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশভ্রমণের নেশাকে।

 লেখক : অধ্যাপক, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]@gmail.com

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা