kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

বিএনপির আদর্শ ও দাবির বৈপরীত্য

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিএনপির আদর্শ ও দাবির বৈপরীত্য

বিএনপির মহাসচিবসহ শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ কেউ দাবি করে থাকেন যে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বা আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল। তাঁরা আরো দাবি করেন যে বিএনপি একটি উদারবাদী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। এ ছাড়া তাঁদের ভাষায়, বিএনপি একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। বিএনপি নেতাদের এসব দাবি যদি বাস্তবে সত্য হতো, তাহলে আমরা ভীষণভাবে খুশি হতাম। কেননা আমরা তিন দশক আগেই দ্বিদলীয় শাসনের যুগে প্রবেশ করেছি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে হয় গণতান্ত্রিক নামধারী, নতুবা রক্ষণশীল নামধারী যেকোনো একটি দল শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ইউরোপের অনেক দেশে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক অথবা খ্রিস্টান ডেমোক্রেটিক নামধারী পার্টিও এই প্রতিযোগিতার দৌড়ে রয়েছে। এরা প্রতিদ্বন্দ্বী দল হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শে কেউই ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতমুখী নয়, কেউই রাষ্ট্রের মূল আদর্শ ও নীতির পরিপন্থী নয়। একদল ক্ষমতায় এলে অন্য দলের গৃহীত সব পদক্ষেপ বাতিল করে নিজস্ব দলীয় নীতি জোরপূর্বক চালু করতে যায় না। রাষ্ট্রের মূল আদর্শকে অস্বীকার কিংবা দুর্বল করার চেষ্টা করে না।

গণতন্ত্রে উদারবাদ কিছুটা মধ্যম বাম ধারা এবং মধ্যম ডান ধারার মধ্যে সহাবস্থান করার চেষ্টা করে থাকে। তবে ডান ধারার জোর বেড়ে গেলে সমাজে গণতন্ত্রের বিকাশ ব্যাহত হওয়ার যথেষ্ট নজির পৃথিবীতে এখন দেখা যাচ্ছে। সে কারণেই গণতন্ত্রের নিরাপত্তা উদার বা মধ্যপন্থার মধ্যেই নিশ্চিত, সংরক্ষিত ও বিকশিত হওয়ার বাস্তবতা পরীক্ষিত হচ্ছে। তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক এই বাস্তব সত্যটি বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতিতে খোলামেলাভাবে দেখার চেষ্টা করলে বিএনপির দাবি বাস্তবের সঙ্গে খুব একটা মেলানো যায় না। সে কারণেই রাজনীতিসচেতন দেশপ্রেমিক, জ্ঞানী-গুণী মানুষের আস্থা বিএনপি খুব একটা অর্জন করতে পারেনি, তাদের কাছেও টানতে পারেনি। তবে সমাজের কিছু মানুষ তো বিএনপিতে আছেন, যাঁদের আমাদের সমাজের কিছু মানুষ জ্ঞানী-গুণী বা শিক্ষিত বলে জানেন। কিন্তু রাজনীতির আদর্শ বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা থেকে যাঁরা ডানপন্থার দিকে অবস্থান নেন, তাঁদের হিসাব-নিকাশ খুব সহজে মেলানো যাবে না। এটি বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মিথস্ক্রিয়ায় গঠিত রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়। সেই বিবেচনা থেকেও যাঁরা আছেন তার সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে রাজনীতিসচেতন যেকোনো মানুষ চাইবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বা প্রধান বিরোধী দলে যে দুটির রাজনৈতিক দল অবস্থান করবে তারা রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শে বিশ্বাসী হবে, চরম ডানপন্থা ও উগ্র সাম্প্রদায়িক বা জঙ্গিবাদী বিশ্বাসীদের ধারেকাছেও ভিড়বে না।

বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের দল হিসেবে যে দাবি করে থাকে তা কতটা যৌক্তিক। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনা গ্রিনে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপির আত্মপ্রকাশের কথা ঘোষণা করেন। তাঁর এক পাশে বসা ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান, অন্য পাশে ছিলেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া—যাঁরা উভয়েই মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিলেন। এ ছাড়া আরো যাঁরা নতুন দলে যুক্ত হলেন তাঁদের প্রায় সবারই রাজনৈতিক অতীত ছিল উগ্র ডান বা উগ্র বাম—যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে বিরোধিতা করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও বিরোধিতা করেছিলেন। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম একজন ফোর্স কমান্ডার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অনেকেই বড় বড় পদ নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের অনেকেরই স্বাধীনতাসংগ্রামে তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না, আগ্রহও অনেকের ছিল না। আবার কেউ কেউ আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই পাকিস্তানের গণহত্যার পরও পাকিস্তানের মোহ ত্যাগ করতে পারেনি। এর কারণ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে একটি রাষ্ট্রের অগ্রসর, আদর্শের দীক্ষা থেকে বুঝতে না পারা বা অংশগ্রহণ করতে না পারা। মুক্তিযুদ্ধে কেউ বড় পদ নিয়ে অংশগ্রহণ করলেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ, বাহন ও বাস্তবায়নে সততা ও নিষ্ঠার অবস্থান গ্রহণ না করলে তাঁকে পরিপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধা বলা যায় কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিএনপি নামের রাজনৈতিক দলটি শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন ও ‘সুপ্রতিষ্ঠিত’ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতায় আসীন হয়। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি যাঁদের মনোনয়ন দিয়েছিলেন কিংবা তিনি যে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন তাতে যুদ্ধাপরাধীদেরও স্থান দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁর শাসন আমলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা, প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকা, এমনকি মুক্তিযুদ্ধে যেসব রাষ্ট্র আমাদের সহযোগিতা করেছিল তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেতিবাচক ধারায় নেওয়া হয়। অপরপক্ষে পাকিস্তানসহ অনেক দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক স্থাপন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে অনেকটাই উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা ও অপপ্রচার রটনার বাক্স খুলে দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে জামায়াতসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে উন্মুক্ত করে দেন, আওয়ামী লীগসহ স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড সংকুচিত কিংবা ভাঙাভাঙির খেলায় জড়িয়ে দেন। এর ফলে বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সমাজ, রাষ্ট্র, প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা। বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হলো সাম্প্রদায়িক ও পাকিস্তানি ভাবাদর্শ।

বিএনপি ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর মাঝপথের আন্দোলনে জামায়াতের সঙ্গেই জোট গঠন করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ভারত বিরোধিতা, বিসমিল্লাহ চলে যাওয়া ইত্যাদি স্লোগান ব্যবহার করে, নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে আসন ভাগাভাগি করা হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি চারদলীয় যে জোট গঠন করে তা জামায়াত ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। নির্বাচনে জয়লাভের পর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দেওয়া হলো, জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক ও মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতা হিসেবে পাঠ্যপুস্তকে উপস্থাপন করা হলো। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, ১৭ আগস্ট ও ২১ আগস্ট সংঘটিত করার সুযোগ করে দেয়। জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতাকে মন্ত্রিপরিষদে পদ দেওয়া হয়। গোটা দেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্ফাালন বেড়ে যায়। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে বিএনপির সরাসরি অবস্থান ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ অবলম্বন করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই বিচার নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এসব সংক্ষিপ্ত বর্ণনাই বিএনপির দলীয় অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল। বিষয়টি এতটা স্পষ্ট থাকার পরও বিএনপি নেতারা কিভাবে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কিংবা উদারবাদী অথবা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বলে দাবি করে থাকেন? বিএনপি অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দল হতে হলে তাকে অবশ্যই মধ্য উদার পন্থায় বিশ্বাসী হতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাস ধারণ, গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। এই আদর্শগুলো মনগড়া কথা দিয়ে রাজনীতিসচেতন বোদ্ধাদের বোঝানো যায় না, কাছেও পাওয়া যায় না। এখন বিএনপির যেসব নেতা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, উদারবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে দাবি করেন তা বাস্তবের সঙ্গে একেবারেই মেলানো যায় না। বরং তাদের আদর্শ এবং বক্তব্যের মধ্যে চরম বৈপরীত্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সচেতন মানুষ বিএনপিকে সত্যি সত্যি তাঁদের কোনো কোনো নেতার দাবীকৃত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, উদারবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবেই দেখতে চায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি ক্রমেই অতি ডানের উগ্রপন্থার ব্যক্তি ও গোষ্ঠীদের রাজনৈতিক বিশ্বাসী দল হিসেবেই বিরাজ করছে। এ ধারা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, উদার গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতাকে কোনোকালেই বিকশিত হতে সাহায্য করবে না। বরং ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস করার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পাল্লাকে চরম ভারসাম্যহীন অবস্থায় ফেলে দেবে, অনেকটা দিয়ে রেখেছেও।

 

লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা