kalerkantho

মঙ্গলবার । ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৪ নভেম্বর ২০২০। ৮ রবিউস সানি ১৪৪২

ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ‘মিষ্টি কথায়’ ভোলালেন

অনলাইন থেকে

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিথ্যা, জঘন্য মিথ্যা এবং এই ধারাবাহিকতায়ই হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় কনভেনশন। এটা যেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর সহায়কদের চার দিনব্যাপী এক অদম্য মিথ্যাচারের শোভাযাত্রা। রাজনীতিতে বন্য বিকৃতি ও অতিরঞ্জনের নিত্যনতুন ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কপটতা আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জন করে নিয়েছে, যেটা তিনি কনভেনশনের সমাপনী ভাষণে মেলে ধরেছেন।

অর্থনীতি পরিচালনায় নিজের পরিকল্পনা যে গর্তে আটকে আছে, সেই বেকারত্বের ভয়াবহ পরিসংখ্যানের মুখে দাঁড়িয়েও তিনি এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছেন যে তিনি একজন বহিরাগত। তিনি নির্ভর করছেন বর্ণবাদে উসকানি, ভীতি ছড়ানো ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপবাদ দেওয়ার ওপর। রিপাবলিকান শিবির থেকে জো বাইডেনকে আগে ‘ওয়াশিংটনের জলাভূমির প্রাণী’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হলো। এখন তাঁকে চিত্রিত করা হচ্ছে আমেরিকানদের স্বপ্ন ভঙ্গের ট্রোজান ঘোড়া হিসেবে। এর পরও ট্রাম্পের নিজের রেকর্ডের কাছে জো বাইডেন ও ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারকে হালকাই দেখাবে।

ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমি বিনীতভাবে বলছি যে আব্রাহাম লিংকনের পর যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে আমি আফ্রিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের জন্য বেশি করেছি।’ তাঁর ভাষণের বাকি অংশ আরো বিভ্রান্তিকর ছিল কি না তা জানা বেশ কঠিন! তাঁর ভাষণে সবচেয়ে স্পষ্ট মিথ্যাচার ছিল যে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিকে তিনি মারাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে না দিয়ে তিনি দেশকে রক্ষা করতে ‘দ্রুত পদক্ষেপ’ নিয়েছেন। অথচ এরই মধ্যে আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। রিপাবলিকানরা চায়, আমেরিকা বিশ্বাস করুক যে করোনা পরিস্থিতির সবচেয়ে খারাপ অবস্থা অতিক্রম হয়েছে। অথচ এখনো দেশটিতে দিনে এক হাজারের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে।

এই অস্বীকারের বিষয়টি ট্রাম্পকে তিরস্কার করা লোকজনের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হবে এবং শেষ পর্যন্ত এটাই কার্যকর হবে। একটি অন্তর্নিহিত সত্যকে স্বীকার করেই ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন, যখন বহু আমেরিকান গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। সমর্থকদের যে ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ ট্রাম্পের নিজস্ব ফ্যান্টাসি গড়ে তুলেছিল, তা প্রায় হালকা হয়ে গেছে। যারা ফক্স নিউজ, ফেসবুক বা ব্রেইবার্ট বাস্তবতায় (কট্টর ডানপন্থী নিউজ নেটওয়ার্ক) বসবাস করে, এই কনভেনশন তাদের কাছে সেই বাস্তবতাই হাজির করেছে। কারণ এসব মাধ্যমে তাদের কাছে সত্য হচ্ছে একটা ঐচ্ছিক বিষয়। তাইতো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী লোকটি নিজে ভিকটিমের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং দাবি করেন, তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে গিয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। যেমন তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের (রিপাবলিকান সমর্থক) জন্য লড়ছি বলেই তারা (প্রতিপক্ষ) আমাকে ধরতে আসছে।’

শেষ পর্যন্ত কী হলো? ট্রাম্পকে সমর্থনের ব্যাপারে যেসব মানুষ দ্বিধায় ভুগছিল, সেসব মানুষের কাছে ট্রাম্পকে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে এই কনভেনশন প্রলেপ লাগিয়ে দিল। যেমন কৃষ্ণাঙ্গ ও এশিয়ান রিপাবলিকান নেতারা দর্শক-শ্রোতাদের আশ্বস্ত করলেন যে ট্রাম্প বর্ণবাদী ছিলেন না, আবার তিনিই যে দেশ চালিয়েছেন তা-ও তো নয়। সুতরাং সামগ্রিকভাবে এটাই বোঝা গেল যে কনভেনশনের সপ্তাহটিতে একটা অজানা সত্য প্রকাশিত হলো।

ট্রাম্প কখনো সবচেয়ে খারাপ ছদ্মবেশটি ধারণ করেননি। এর পরও তিনি এগিয়ে গেছেন এবং হয় তো এ কারণেই তিনি তা পেরেছেন। কনভেনশনের আগে এবং কনভেনশনে দেওয়া ভাষণে তাঁর কথার সুরটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর তাচ্ছিল্য প্রকাশ। আর তিনি এটা প্রকাশ করেছেন নিজের পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারণার জন্য দেশটির সর্বোচ্চ দপ্তরকে ব্যবহার করে। সে জন্যই হয়তো তিনি জিওপির (গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি) অতি উৎসাহী সমর্থকদের বাইরে আর কোনো প্ল্যাটফর্ম বেছে নেননি। এটা ছিল তাঁর সহায়তাকারীদের প্রতি স্বীকৃতি।

ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বললেন, ‘এর আগে ভোটাররা কখনো দুটি দল, দুটি দৃষ্টিভঙ্গি, দুটি দর্শন কিংবা দুটি এজেন্ডার মধ্যে এতটা পরিষ্কার পছন্দের মুখোমুখি হননি।’ এটা বলা যায়, আমেরিকান গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে—এটি যেমন তিনি শাসনের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার করেছেন, তেমনি তাঁর দলীয় কনভেনশনও সেই পুনর্নিশ্চয়তাটাই দিল। জো বাইডেন যদিও জরিপগুলোতে দোদুল্যমান রাজ্যগুলোসহ সামগ্রিকভাবে এগিয়ে আছেন, তার পরও অনেকের আশঙ্কা, যতটা তাঁর এগিয়ে থাকা প্রয়োজন তিনি ততটা এগিয়ে নেই। মোট কথা ট্রাম্পের ভাষণ ছিল এমন এক কার্যকর প্রদর্শনী, যা প্রচারশিবিরে গতি এনে দেবে। তিনি তাঁর সমর্থকদের নির্বাচনে এমন কঠিন বার্তা পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যা তারা কখনো ভুলবে না। তবে বিষয়টা হচ্ছে, কী পরিমাণ লোকজনকে ৩ নভেম্বরে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা গেল শুধু তা-ই নয়, বরং কতজনকে ভোট দিতে অনুমতি দেওয়া হলো কিংবা তাদের ভোট স্বীকৃত কি না সেটা। ট্রাম্পের মতো সত্যের প্রতি বেপরোয়া মানুষের কাছে এটা আশা করা যায় না যে তিনি সত্যকে সম্মান করবেন, বরং সেসব সত্য তাঁর জন্য অসুবিধাজনক বলে প্রমাণিত হওয়া উচিত।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য