kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

নিরাপদ ও উৎসাহব্যঞ্জক পছন্দ কমলা হ্যারিস

জনাথন মার্টিন ও অ্যাসটিড ডাব্লিউ হার্নডন

১৪ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিরাপদ ও উৎসাহব্যঞ্জক পছন্দ কমলা হ্যারিস

জোসেফ আর বাইডেন জুনিয়রের রানিং মেট হিসেবে কমলা হ্যারিসকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি অসাধারণ। এ ক্ষেত্রে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পাশাপাশি সম্ভবত বাইডেনের হোয়াইট হাউসের উত্তরসূরিও হবেন কমলা। তবে এর অর্থ এমন নয়, প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাইডেন। রানিং মেট হিসেবে একজন সিনেটরকেই ডেমোক্রেটিক পার্টির টিকিট দিয়েছেন তিনি। দলে এখন উদারপন্থী পরিবর্তনের ধারা বইছে। এর মধ্যে মধ্যবামপন্থী বাইডেন কমলাকে বেছে নিলেন।

পূর্বসূরি বারাক ওবামা বা জর্জ ডাব্লিউ বুশের মতো ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঝানু কোনো রাজনীতিককে বেছে নেননি বাইডেন। বরং এক দশক ধরে উদীয়মান নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত এক নারীকে সহযোগী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তবে ৫৫ বছর বয়সী কমলাকে কোনোভাইবেই বার্নি স্যান্ডার্সের মতো অতি উদারপন্থী হিসেবে অভিহিত করা যায় না। বরং তিনি বাইডেনের মতোই প্রতিষ্ঠিত কাঠামোরই একটি অংশ। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা দুজনই দলের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত। কিছুটা বামঘেঁষা। তবে কখনোই সীমা পার করেননি। বাইডেন বহুবার বলেছেন, রানিং মেট হিসেবে তিনি ‘সহমনা’ কাউকে চান। কমলার মধ্যে তিনি তেমন একজনকেই খুঁজে পেয়েছেন। অন্তত আদর্শগত দিক থেকে। 

পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গের মৃত্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিক্ষোভ চলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পুরো সময়টা পুলিশের প্রতিই সহানুভূতিশীল হিসেবে দেখা গেছে। এ ব্যাপারে বাইডেন ও কমলাকে মধ্যপন্থী বলা যেতে পারে। যেমনটি বলছিলেন আরিজোনার সাবেক গভর্নর এবং সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনেট নেপোলিটানো, ‘কমলা দলের চরম বামপন্থী অংশের সদস্য নন, তিনি সাবেক সরকারি আইনজীবী। এ দায়িত্বে থাকার সময় তাঁকে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’ কিছু তরুণ বামপন্থীর জন্য বিষয়টি হয়তো দুর্ভাগ্যজনক। তবে সান ফ্রান্সিসকোর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কমলার দায়িত্ব পালন তাঁর কাঁধে বাড়তি বোঝা নয়, বরং মাথার মুকুটে বাড়তি একটি পালক হিসেবেই বিবেচিত হবে। কমলা বা নেপোলিটানোর মতো বহু নারী রাজনীতিকের শুরু আইন কর্মকর্তা হিসেবেই।

তবে বাইডেনের কমলাকে বেছে নেওয়ার একটা বড় কারণ, নির্বাচনী প্রচারে উত্তেজনা তৈরি করা। মহামারি ও অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে না পারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লড়ছেন তিনি। এর সুস্পষ্ট প্রভাব বিভিন্ন মতামত জরিপে স্পষ্ট। জয়ী হলে ওয়েস্ট উইংয়েও নতুন একটি চেহারা আনতে চান শ্বেতাঙ্গ এবং ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সময় ক্যারিয়ার শুরু করা বাইডেন। তিনি সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনকেও বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু এ ধরনের ভুলের কারণেই চার বছর আগে ধরাশায়ী হন হিলারি ক্লিনটন।

কমলা প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা প্রত্যাশী ছিলেন। সিনেটের বাইরেও আইন দপ্তরের অভিজ্ঞতা তাঁকে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইসের মতো বহু প্রার্থিতা প্রত্যাশীর থেকে এগিয়ে রেখেছিল। তবে বিষয়টি কোনোভাবেই এমন নয়, রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ একজনকে বেছে নিয়েছেন বাইডেন। জ্যামাইকান বাবা এবং ভারতীয় মায়ের সন্তান কমলা বর্ণবাদ ইস্যুতে ট্রাম্পের সঙ্গে ভালো টক্কর দিতে পারবেন। তা ছাড়া প্রস্তুতির সময় পাওয়া গেলে তার পারফরম্যান্সও অসাধারণ।

বাইডেনের সিদ্ধান্তের ওপর তাঁর দলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কমলা প্রেসিডেন্ট হতে চান। ২০২৪ সালে বাইডেন দ্বিতীয় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে ওই বছরই লড়তে চান তিনি। বিষয়টি বাইডেনের বহু উপদেষ্টার জন্যই অস্বস্তিকর। তবে এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না বাইডেন। বরং দেশের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে কমলাকে এক ধরনের সবুজ বাতি দেখিয়েই রেখেছেন তিনি।

কমলার মনোনয়ন দলের সব স্তরে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি করেছে। দলের চাহিদার অনেকটাই পূরণ করতে পেরেছেন তিনি। তাঁর কারণে দল ‘ক্ষতিগ্রস্ত হবে না’ এমন একটা আশ্বাসও তাঁর মধ্যে রয়েছে। দলের কয়েক দশকের অভিজ্ঞ নির্বাচনী প্রচারকারী লিহ ডট্রি বলেন, ‘বেশির ভাগ সময় দেখা যায় দল ‘ক্ষতিগ্রস্ত হবে না’ ধরনের প্রার্থীর মধ্যে ‘আগুন’ থাকে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আছে।’ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারী ডেমোক্র্যাটরা তাঁকে ফোন করছেন উল্লেখ করে ডট্রি বলেন, ‘তিনি (কমলা) কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পক্ষ থেকে দাঁড়িয়েছেন। আমরা এই মনোনয়নের সঙ্গে আছি।’ তবে নিউ ইয়র্ক সিটি, সেন্ট লুইস ও শিকাগোতে জয়ের পর বামপন্থীদের মধ্য থেকে এ পদের জন্য একজনকে বেছে নেওয়া হবে বলে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল তা আর রইল না।

বাইডেন ও কমলা আজীবন ফৌজদারি আইন, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতি নিয়ে বামদের চাপের মধ্যে ছিলেন। বিষয়গুলো নিয়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়াও প্রায় অভিন্ন। এখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দলকে ঐক্যবদ্ধ করা, নানা কারণে ট্রাম্পের ওপর বিরক্ত ভোটারদের টানা, তরুণদের উৎসাহিত করা এবং তাদের মধ্যে নিজেদের প্রার্থীকে খুঁজে পাচ্ছে না—এমন প্রগতিশীলদের সমর্থন আদায় করা।

গত মার্চ থেকেই বাইডেনের ওপর তাঁর রানিং মেট হিসেবে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে বেছে নেওয়ার চাপ বাড়ছিল। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর তা আরো জোরালো হয়। এনএএসিপির সভাপতি ডেরেক জনসন বলেন, ‘বাইডেনের সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, তিনি নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিচ্ছেন এবং প্রাইমারিতে সমর্থনের জন্য এর মাধ্যমেই তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন।’ এটা কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের উৎসাহিত করবে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাইডেনের প্রশাসনে এর প্রকাশ কেমন হবে? যদিও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘আমরা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাঁদের কণ্ঠস্বর শুনব।’ এই সিদ্ধান্তের স্পষ্ট প্রতিফলন ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা যেতে পারে। 

সিদ্ধান্তটি নিয়ে অবশ্য নারী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস লক্ষ করা গেছে। এর একটি কারণ, কমলা এখানেই থেমে যাবেন না। পরে প্রেসিডেনশিয়াল লড়াইয়ের মাঠেও তাঁকে দেখা যাবে। নতুন ভোটার সংগ্রহকারী প্রকল্প নিউ জর্জিয়া প্রজেক্টের প্রধান নির্বাহী এনসে উফট (কৃষ্ণাঙ্গ নারী) বলেন, ‘আমরা জানি ডেমোক্রেটিক পার্টির মেরুদণ্ড কৃষ্ণাঙ্গ নারী ভোটাররা। দলের নেতৃত্ব এদের কৃতিত্ব স্বীকার করেনি বহুকাল।’ তিনি নিউ ইয়র্কের প্রথম নারী কৃষ্ণাঙ্গ কংগ্রেস সদস্য শার্লি কিশোমের (তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন) কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘শার্লি আজ হাসছে। কারণ আমরা অনেকেই এখন চেয়ার হাতে নিয়ে গণতন্ত্রের টেবিলের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এ তো সবে শুরু।’

সূত্র : দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

লেখক: জনাথন মার্টিন, জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি। অ্যাসটিড ডাব্লিউ হার্নডন, জাতীয় রাজনৈতিক সংবাদদাতা

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা