kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

সেলাই করা খোলা মুখ

দুষ্টের পালন নয় চাই শিষ্টের লালন

মোফাজ্জল করিম

১৪ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



দুষ্টের পালন নয় চাই শিষ্টের লালন

কোনো বিচারাধীন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করা সব সময়ই খুব ‘রিস্কি’। আদালত অবমাননা নামক ডেমোক্লিসের তরবারি লেখকের মাথার ওপর তো ঝুলতেই থাকে। আবার লেখক হয়তো তাঁর নিজস্ব চিন্তা-চেতনার আলোকে যুক্তি খাড়া করে দেখালেন অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন জঘন্য অপরাধী এবং বিচারাধীন মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার অবশ্যই ফাঁসি হওয়া উচিত। কিন্তু মামলা যখন শেষ হলো তখন দেখা গেল মাননীয় আদালত ওই ব্যক্তিকে নির্দোষ ঘোষণা করে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। তখন লেখকের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বিড়ম্বনাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমনকি জিতু পার্টি লেখকের ক্রেডিবিলিটি নিয়েও প্রশ্ন তুলে মাঠ গরম করার প্রয়াস পেতে পারে। সেই কারণে বুদ্ধিমান লেখকেরা বিচারাধীন, এমনকি কখনো কখনো তদন্তাধীন বিষয় নিয়েও কোনো মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

তবে টেকনাফের সদ্য সাবেক জল্লাদ ওসি বাবু প্রদীপ কুমার দাশ বা তাঁর সুযোগ্য সহকর্মী বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী কিংবা সাম্প্রতিককালে বহুমুখী প্রতিভার পরিচয়দানকারী রাজপ্রতিভূ (‘রিজেন্ট’) জনাব সাহেদ যখন কোনো মামলার কেন্দ্রীয় চরিত্রে আবির্ভূত হন এবং তাঁদের ফুলের মতো পবিত্র (ধুতুরা ফুল?) চরিত্র জাতির কাছে খোলা বইয়ের মতো উন্মোচিত হয়, তখন বোধ করি তাঁদের বীরত্বগাথা সালঙ্কারে সাধারণ্যে আলোচিত না হলে তাঁদের এক ধরনের অপমানই করা হয়। ভেবে দেখুন, ২২ মাসে ১৪৪টি ক্রসফায়ারে নেতৃত্ব দিয়ে প্রদীপবাবু আজ পাদপ্রদীপের সামনে এসেছেন। ২২ মাসে ১৪৪টি ‘মার্ডার’। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৬.৫টা। চাট্টিখানি কথা? ইস্, আর কটা দিন সুযোগ পেলে একদিন হয়তো রোজ একটা ক্রসফায়ারের মহোৎসব দেখতে পেত বিশ্ববাসী। কী উচ্চতায়ই না পৌঁছে যেত বাংলাদেশ! আর রূপকথার রাক্ষসের মতো রোজ একটি নরমুণ্ড না পেলে বাবু হয়তো জল স্পর্শই করতেন না। সত্যি, আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজিনদের জবানিতে বলতে হয়, ‘বেড্ডই’ (ব্যাটাই)! ১৪৪ ক্রসফায়ারে তাঁর স্কোর ২০৪। অভাগাদের বেশির ভাগই নাকি ছিলেন নিরীহ-নিরপরাধ মানুষ। আমাদের কুলাউড়া-মৌলভীবাজার অঞ্চলের মানুষ শুনে নিশ্চয়ই বলেছেন, ‘ওসি সাবে আল্লাহর আরশ জ্বালাই ফালাইছইন।’ (ওসি সাহেব, আল্লাহর আরশ জ্বালিয়ে ফেলেছেন)।

আমাদের এলাকাতেই আরেকটি কথা খুব চাউর আছে : পাপ জোয়ান অইলে পাপে বাপরেও ছাড়ে না। আর সারা বাংলাদেশের লোকে আরেকটি প্রবচন প্রায়ই আওড়ান : দশদিন চোরের, একদিন গৃহস্থের। প্রদীপ বাবু, সাহেদ সাহেব, হাল আমলের ক্যাসিনো সম্রাটগণ এবং আরো অনেক ফ্রম জিরো টু হিরো বনে যাওয়া হুজুরেরা যখন দেখা যায় হঠাৎ করে বারিধারা-গুলশান-বনানীর নিরাপদ বালাখানা ছেড়ে প্রথমে কাশিমপুর-কেরানিগঞ্জের শাহী মেহমানখানার দুদিনের মেহমান এবং অতিদ্রুত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইভ স্টার কেবিনের স্থায়ী ‘রুগী’ হয়ে গেছেন, তখন বোঝা যায় স্যারের পাপ বাড়তে বাড়তে নিশ্চয়ই জোয়ান হয়ে গেছে, তিনি টেকনাফ-উখিয়া-কুতুপালংয়ের মশা-মাছি মারতে মারতে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকেও পয়েন্ট ব্ল্যাংক দূরত্ব থেকে গুলি করে মারতে শুরু করেছেন। অথবা কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারে-কাছে না গিয়েও চোখ বুজে করোনাভাইরাসের হাঁ-না সার্টিফিকেট দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু ওই যে ডাকের কথা ‘দশদিন চোরের, একদিন গৃহস্থের’ সেটা তো আর মিথ্যে হতে পারে না। বাড়ি-গাড়ি-বিদেশে টাকা পাচার, সুইস ব্যাংকে মোটা অঙ্কের জমা হতে হতে একদিন হঠাৎ অসময়ে গভীর রাতে মোরগ ডেকে ওঠে কোকোরোস-কু, আর গৃহস্থের ঘুম যায় ভেঙে।

 তো প্রদীপ বাবু বোধ হয় কখনো আমাদের সিলেট অঞ্চলে চাকরি করেননি, করলে ওই অঞ্চলে প্রচলিত আরেকটি প্রবচন নিশ্চয়ই শুনতে পেতেন : হকলর লগে আতাআতি, দারোগার লগেও নি? (সবার সঙ্গে হাতাহাতি করো বলে দারোগার সঙ্গেও করবে নাকি?)। মানুষ মারতে মারতে পদক-টদক পেলেন, (জাতীয় কিলার হিসেবে না তো?) জাতি আপনাকে এত ইজ্জত দিল, আর নিজে দারোগা হয়েও এটা জানেন না দারোগার সঙ্গে হাতাহাতি করতে নেই। নাকি রিটায়ার্ড মেজরকে দারোগার সমানও মনে করেননি? টেকনাফ-কক্সবাজারের অলিমদ্দি-সলিমদ্দির পিঠে ইয়াবা ব্যবসায়ীর লেবেল লাগিয়ে তাদের ফিনিশ করে দিয়ে নিজের স্কোর বাড়িয়ে আরেকটি পদক পাওয়ার ব্যবস্থা করা, আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন পদস্থ সাবেক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার না করে অথবা হাতে-পায়ে গুলি না করে একেবারে চার চারটি গুলি করে ম্যাগাজিন খালি করে ফেলা কি একই কথা হলো? অলিমদ্দি-সলিমদ্দির পেছনে হয়তো তাদের অকালে বিধবা হওয়া বসিরন-নসিরন বেওয়া এবং অবোধ কটি দুধের শিশু ছাড়া কেউ নেই, কিন্তু একজন সেনা কর্মকর্তার পেছনে শুধু তাঁর বাহিনী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’ই নয়, সমস্ত জাতি আছে এটা এই অতি চৌকস দারোগাবাবু জানেন না এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে। আসলে মানুষ মারতে মারতে এই মানুষরূপী জল্লাদরা এত বিশারদ হয়ে পড়ে যে তারা তখন ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ট্রিগার হ্যাপি’ তাই হয়ে পড়ে। নাফ নদে বক শিকার আর শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে ‘সিটিং ডাক’-এর মতো মানুষ শিকার তাদের কাছে যেন একই ব্যাপার। মানুষের জীবন যে কত সস্তা তাই প্রমাণ করার ব্রত নিয়েই যেন ময়দানে নেমেছেন প্রদীপবাবুরা। স্বাধীনতার পর ‘৭৪-৭৫’ সালে যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতে গেলাম তখন প্রথম দেখলাম মানুষের জীবন কত সস্তা। তখন সদ্যঃস্বাধীন দেশে চাল-ডাল-তেল-পিঁয়াজ সব কিছুর দাম বোধগম্য কারণেই ছিল ঊর্ধ্বমুখী, সস্তা ছিল শুধু নুন আর খুন। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরে আবারও কি সেই ‘সুদিন’ ফিরে আসছে? এবং তাতে মদদ জোগাচ্ছে কতিপয় সুযোগসন্ধানী, উচ্চাভিলাষী, বদ্ধোন্মাদ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী? সত্তরের দশকে লড়াই ছিল তথাকথিত আদর্শের লড়াই। দেশ কোন পথে যাবে তাই নিয়ে বিবাদ হতে হতে দ্রুতই শুরু হলো অস্ত্রের ঝনঝনানি, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে খুনোখুনি। কত মায়ের যে কোল খালি হলো, কত সম্ভাবনাময় তরুণ যে অকালে হারিয়ে গেল আমাদের চোখের সামনে। তবে সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে জনপ্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কেউ কোনো আপত্তি তোলেনি। তাদেরকে দিয়ে কোনো অন্যায় কাজ করাতেও চায়নি সরকার। তখন লক্ষ্য ছিল একটাই : দেশে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। সেই সময়ে সমস্যাসংকুল কুষ্টিয়া ও পরে সত্তরের দশকেই খুলনা জেলায় দায়িত্ব পালনকালে পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করেছি। কোনো দিন একে ধরো ওকে ছাড়ো মার্কা গায়েবি নির্দেশ পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। একই অভিজ্ঞতা ছিল ওই অঞ্চলে তৎকালীন আমার সুযোগ্য সহকর্মী জেলা প্রশাসক সৈয়দ আলমগীর ফারুক চৌধুরী (যশোহর), মরহুম আখতার আলী (যশোহর), মরহুম সফিউর রহমান (রাজশাহী), আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী (ফরিদপুর) প্রমুখেরও। কারো মেজাজ-মর্জি বুঝে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হতো না, আমরা মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করতে পারতাম শুধু আইনের প্রতিষ্ঠার জন্যে, ন্যায়বিচার কায়েম করার জন্য।

২.

এর বড় কারণ ছিল তখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব। তিনি কোনো দিন নিজে বা তাঁর কোনো সরকারি কর্মকর্তা-রাজনৈতিক সহকর্মীর মাধ্যমে আমাদের কাছে কোনো তদবির-সুপারিশ, অন্যায় আদেশ-নির্দেশ পাঠাতেন না। তবে কে কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, সত্ভাবে চলছেন, না উল্টোসিধা কিছু করছেন, সাধারণ মানুষকে কাছে টানছেন, না দূরে ঠেলে দিচ্ছেন, সে খবর ঠিকই রাখতেন। আর সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে আমাদেরও বুকে বল ছিল ওটাই : আমাদের গার্জিয়ান ইনসাফ করতে বলে দিয়ে আমাদের পাঠিয়েছেন, কোনো নেতাফেতার মুখ চেয়ে চলতে বলেননি। আমরা তাই যত দিন দায়িত্ব পালন করেছি মাথা উঁচু করেই করেছি। আমার ব্যাচমেট ড. এ এম এম শওকত আলী, অনুজপ্রতিম সহকর্মী মুয়ীদ চৌধুরী ও আমার আবার পরবর্তী পর্যায়ে জিয়াউর রহমান সাহেবের সময়ে বৃহত্তর ঢাকা জেলায়ও দীর্ঘদিন জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ হয়েছিল। তখনকার অভিজ্ঞতাও একই : নো ইন্টারফিয়ারেন্স, নো তদবির-সুপারিশ। এমনকি স্বৈরাচার বলে যে এরশাদ সাহেবকে উঠতে-বসতে আমের আচারের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাঁর আমলেও মাঠ প্রশাসনে কোনো কম্প্রমাইজ করেননি রাষ্ট্রপতি। প্রশাসনে ঘুণে ধরতে শুরু করল এরপর থেকেই। নব্বইয়ের দশক শুরু হলো ‘স্বৈরাচারী আমলের’ সমাপ্তির পর। গণতন্ত্রের নতুন জজবার উন্মেষ ঘটল চিন্তা-চেতনা, কাজে-কর্মে সবখানে। সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধির মধ্যে এ ধারণার সঞ্চার হলো, স্বৈরাচারকে প্রায় এক দশক টিকিয়ে রেখেছিল প্রশাসন। অতএব একে এখন ধুয়ে-মুছে সাফ করতে হবে। একটা লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার মেসেজ চলে গেল প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে : এত দিন ‘দালালি’ করেছ স্বৈরাচারের, এখন ওসব ভুলে গিয়ে আমরা যা বলব সেভাবে চলতে হবে তোমাদের। প্রায় সব আমলা-কামলা কোরাসে ধ্বনি তুলল, বা তাদের তুলতে বাধ্য করা হলো : তথাস্তু। ‘তাহলে পরীক্ষা দাও’, বললেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। দ্রুতই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নামক পরীক্ষাগৃহে ঢোকানো হলো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এর পরের ইতিহাস আমরা জানি, আমরা জানি কী করে ‘কৌশলে পশিল কলি নলের শরীরে’ (মেঘনাদবধ কাব্য)। পায়ের তলার গ্যাংরিন ছড়িয়ে পড়তে পড়তে এখন তো তা দুরারোগ্য ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। সুপার চালাক, অতিমাত্রায় মেধাবী কিছু কর্মকর্তা দেখল তাদের দিয়ে না-জায়েয কাজ করিয়ে নিচ্ছে ক্ষমতাধররা, দেন হোয়াই নট বিনিময়ে কিছু নগদ নারায়ণ জেবে ঢোকানো? শেয়ার দিতে হবে? দেবো। শুরু হলো দশ আনা-ছ আনা, আট আনা-আট আনা ইত্যাদির ছেলেবেলায় শেখা লাভক্ষতির অঙ্ক। দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত, মাদকমুক্ত করতে চান? নো চিন্তা। আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে ডু ফুর্তি। দুদিনে দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত-মাদকমুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। শুধু আপনারা একটু গরিবের দিকে খেয়াল রাখবেন। আইন-কানুনের দিকটা খেয়াল করবেন আপনারা। আর শোনেন, গ্রেপ্তার করে, তদন্ত করে, চার্জশিট দিয়ে, বিচার করে আদালতে যদি ফাঁসির আদেশ বের করতে হয় তাহলে ইহজনমে একটা অপরাধীকেও ফাঁসিকাষ্ঠে লটকানো যাবে না। তাহলে কী করতে হবে? ক্রসফায়ার। সেটা কী বস্তু? সোজা বাংলায় বন্দুকযুদ্ধ। ব্যাটা শয়তান পালাতে গিয়ে পুলিশ/র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি করে। তখন পুলিশ/র‌্যাব আত্মরক্ষার্থে বাধ্য হয়ে পাল্টা গুলি ছোড়ে। ফলে তার মৃত্যু হয় অকুস্থলে। আর পুলিশ/র‌্যাবের কী হলো? আল্লাহর ফজলে তাদের কিছু হয়নি, তারা ভালো আছে। আলহামদুলিল্লাহ। তা ঘটনা কখন ঘটে? অবশ্যই রাত তিনটায় বা শেষ রাতে, যখন পাড়া-প্রতিবেশী সবাই ঘুমাচ্ছিল। গোলাগুলিতে তাদের ঘুম ভাঙেনি? এই মিয়া, আপনি এত কথা জিগান ক্যান? আপনি নিশ্চয়ই সাংবাদিক। আপনারও কি হাউস হয়েছে বন্দুকযুদ্ধের সামনে পড়তে? ...বন্দুকযুদ্ধের এই সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল প্রায় দেড় দশক আগে। সন্ত্রাস-মাদক ব্যবসা বন্ধ না হলেও প্রদীপবাবু ও তাঁদের মুরব্বিদের ‘বাণিজ্য’ ক্রমে ক্রমে জমে উঠেছে দারুণভাবে, আর মাশাল্লাহ হাজার হাজার কোটি টাকার সয়-সম্পত্তিও হয়েছে তাঁদের।

৩.

পৃথিবীর কোনো দেশের আইনে বিচারবহির্ভূত হত্যার সমর্থনে একটি বাক্যও নেই। বাংলাদেশের আইনও তার ব্যতিক্রম নয়। আইনের প্রথম কথাই হলো, জঘন্যতম অপরাধীর জন্যও সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি দিনদুপুরে জজ সাহেব, ডিসি সাহেব, এসপি সাহেব বা হাজার হাজার লোকের চোখের সামনেও যদি ‘ক’ কাউকে গুলি করে হত্যা করে, তবুও ‘ক’য়ের বিচার করতে হবে দেশের প্রচলিত আইনে। এমন নয় যে ‘ক’কে সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া যাবে। সাক্ষী-সাবুদের কোনো দরকার নেই, কারণ সে অপরাধ করেছে বিচারপতি ও আইনরক্ষাকারী কর্তাদের চোখের সামনে। সরি, নো। দ্যাটস্ নট ইনাফ। সব অপরাধ প্রমাণিত হতে হবে আদালতে, ‘আফটার ডিউ প্রসেস অব ল’।

আইনের একটা সর্বজনস্বীকৃত ‘ডিকটাম’ বা অনুশাসন বিচারক-পুলিশ-আইনজীবীকে ক্যারিয়ারের শুরুতেই পইপই করে শিখিয়ে দেওয়া হয়, বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তা হচ্ছে : এক শ জনের মধ্যে নিরানব্বই জন অপরাধীও যদি বিনা দণ্ডে খালাস পেয়ে যায়, তবু যেন একজন নির্দোষ ব্যক্তিও সাজা না পায়। অর্থাৎ সাজা দেওয়ার আগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যে দোষী সে সম্বন্ধে বিচারকের মনে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকে। ‘ইট মাস্ট বি প্রুভড্ বিয়ন্ড অ্যান আয়োটা অব ডাউট।’ আমাদের আইনপ্রণেতারা, আইনের প্রয়োগকারীরা, শাসকগোষ্ঠী, প্রশাসনের সর্বস্তরের কেষ্টবিষ্টুরা এসব বিষয়ে আপনার আমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি জানেন। আমাদের আইনের বইগুলো ঈর্ষণীয় মানের জ্ঞানের ভাণ্ডার। কিন্তু সেই জ্ঞানের, সেই আইনের প্রয়োগ? লজ্জাজনকভাবে দুর্বল।

একেকটা ঘটনা যখন ঘটে তখন দেশজুড়ে শুরু হয় মাতম : হায় হাসান, হায় হোসেন। তারপর মহররম মাস চলে যায়, আসে সফর মাস। আমাদের মৌসুমি শোকের তাজিয়া ভাঁড়ারে তুলে রেখে আমরা মন দিই আর দশটা বিষয়ে। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলেই আমরা সাগর-রুনি, ত্বকী, তানুকে শোকের প্রতীক বানিয়ে আমাদের পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে চেষ্টা করি রক্ত ঝরাতে। তারপর আবার পাশ ফিরে শুই। যেন সেই গল্পের যুবকের মতো যে হস্তরেখাবিদ জ্যোতিষ ঠাকুরকে বলেছিল, বুঝলাম ঠাকুর, ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত আমার অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকবে, বেকারত্ব ঘুচবে না, সংসারে থাকবে অভাব-অনটন-অশান্তি, কিন্তু তারপর? তারপর কী হবে? জ্যোতিষের উত্তর ছিল : তারপর এই সবই আপনার সয়ে যাবে। ওই যুবকের মতো আমাদেরও সব সয়ে যায়। আমাদের জীবনে একটা হিট ছবির পর আসে আরেকটা হিট ছবি, তখন আমরা আগেরটির কথা ভুলে যাই। আমাদের কুশলী পরিচালকেরা একটার পর একটা হিট ছবি আমাদের উপহার দিতেই থাকেন। সব ছবি সয়ে যায় আমাদের চোখে, কোনোটাই আর নতুন লাগে না।

৪.

শেষ করার আগে ‘বুলেট’ আকারের কয়েকটি কথা বলে যাই। (এ বুলেট প্রদীপবাবুদের ছোড়া বুলেট নয়, সাংবাদিকতার পরিভাষার বুলেট)। ক. শুধু ফ্রন্ট লাইনের সিপাই-সান্ত্রি নয়, পেছনের রাঘব বোয়ালদের, বিশেষ করে প্রশ্রয়দাতা মুরব্বিদের ধরুন এবং দ্রুত বিচার করে শাস্তি দিন, দেখবেন রাতারাতি গণেশ উল্টে গেছে। খ. প্রত্যেক সার্ভিসে প্রদীপদের মতো কালো ভেড়ারা (ব্ল্যাক শিপ) সমস্ত সার্ভিসের মুখে কালিমা লেপন করছে। এদের বেছে বেছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন। তবেই এই দুর্নীতিবাজদের ভাইরাসের মূলোৎপাটন সম্ভব হবে। শুধু ‘মাস্ক’ আর ‘গ্লাভস্’ পরলেই চলবে না, টিকা আবিষ্কার করুন। গ. পুলিশ বিভাগ অপরাধী শনাক্তকরণ ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে ইদানীং প্রযুক্তি ইত্যাদি ব্যবহার করে যথেষ্ট সাফল্য দেখাচ্ছে, কিন্তু বিচারকার্যের শম্বুকগতি ও দোষী ব্যক্তিদের দণ্ড কার্যকর না হওয়ায় জনমনে চরম হতাশা বিরাজ করছে সন্দেহ নেই। বিচার প্রক্রিয়ার পুরো বিষয়টি নতুন করে সাজানো সময়ের দাবি। ঘ. চিরদিন দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের কথা জনগণ শুনে এসেছে, এখন মনে হয় প্রশাসনের দায়িত্ব পাল্টে গিয়ে দুষ্টের পালন ও শিষ্টের দমন হয়ে গেছে। এটা আমার কথা নয়, প্রশাসন সম্বন্ধে ‘পাবলিক পারসেপশন’ এমনটিই। ঙ. আগামীকাল জাতীয় শোক দিবস। এই দিনে বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক দর্শন বাস্তবায়নের মাধ্যমে শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আর বঙ্গবন্ধুর সেই দর্শন ছিল পুরোপুরি সাম্য, ন্যায়বিচার ও গণমুখিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটা ভুলে গিয়ে শুধু কথার ফুলঝুরি ছড়ালে প্রশাসনের কোনো লাভ হবে না, রোধ করা যাবে না এর অধোগতি।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

 [email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা