kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

জলবায়ু সংকট সর্বনাশ ও আশাবাদ

জ্যাক হসফাদার ও রিচার্ড বেটস

১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জলবায়ু সংকট নিয়ে ‘এক্সটিংকশন রিবেলিওনে’ (লন্ডনে আইন অমান্য আন্দোলন) অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের কিছু নেতার দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বোচ্চ অভিঘাতে আগামী কয়েক দশকে কোটি কোটি মানুষ মারা যাবে। বিপরীত দিকে বিরোধিতাকারীরা এই সংকটের গুরুত্ব বা বাস্তবতাকেই উড়িয়ে দিচ্ছেন এবং নতুন নতুন বই প্রকাশ করে বলা হচ্ছে যে জলবায়ু বিপর্যয় কখনোই ঘটবে না এবং এগুলো ভুয়া সতর্কবার্তা। এক দশক আগে জলবায়ু বিজ্ঞানী স্টিভেন স্নাইডার এমনি এক দূরদর্শী বক্তব্য দিয়েছিলেন যে জলবায়ু প্রসঙ্গ এলেই ‘পৃথিবীর সমাপ্তি’ এবং ‘আমাদের জন্য মঙ্গল’—দুই বিপরীত মন্তব্য শোনা যাবে।

বর্তমান পৃথিবী যেসব ভয়াবহতম বিষয় মোকাবেলা করছে, পরিবেশগত সংকট এর অন্যতম। আমরা এরই মধ্যে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবের মধ্যেই বেঁচে আছি। চলতি শতাব্দীর শেষের দিকেই মানবিক ও প্রাকৃতিক বিশ্ব—উভয় ক্ষেত্রেই যে ভয়ানক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে, তা এড়াতে এখন পর্যন্ত খুব কম ব্যবস্থাই নিতে পেরেছে বিশ্বব্যবস্থা। এ অবস্থায় যখন জলবায়ু তৎপরতা নিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি দরকার, তার পরিবর্তে বিনাশ ও ঝুঁকি প্রত্যাখ্যান—দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সব আলোচনা।

বৈশ্বিক উষ্ণতাকে সুনির্দিষ্ট মাত্রার নিচে রাখার কথা বলা হচ্ছে। অথচ বিজ্ঞানের ভাষ্য হচ্ছে, জলবায়ুর বিষয়গুলো প্রকৃতপক্ষে একটু হেরফের হবে। আমরা যখন ভবিষ্যতে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রক্ষেপণ তৈরির চেষ্টা করি, তখন তিনটি বড় অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হই। এগুলো হচ্ছে, মানুষ কী পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করবে, এর ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কী পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা হবে এবং এর প্রতি বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা কী পরিমাণ সংবেদনশীল হবে।

এগুলোর মধ্যে প্রথমটি নিয়ে আমাদের সীমিত পরিমাণে আশাবাদী হওয়ার কারণ রয়েছে। গত দশকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বাড়ার গতি কমাতে বিশ্ব ধীরগতিতে অগ্রসর হয়েছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বেড়ে যাচ্ছে। গত শতাব্দীর শেষের দিকে বৈশ্বিক নির্গমন তিন গুণ হয়ে গেলে একটা দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যদিও পরে তা কমে আসে। কিন্তু এখন বর্তমান বাস্তবতা ও নির্গমন কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ব্যবধানটি ক্রমে বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে জমা হচ্ছে। অথচ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বন্ধ করতে দরকার ছিল নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনা।

এখন জলবায়ুসংক্রান্ত খবরাখবর আরো বেশি মিশ্র। একদিকে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্বিগুণ হলে পৃথিবী কতটা উষ্ণ হবে তা নির্ণয় করতে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে কিছু সাফল্য এসেছে। আরেক দিকে আমরা উষ্ণায়নের মাত্রাও বাতিল করে দিচ্ছি। আমরা কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরির সুযোগ দিয়ে উষ্ণায়নও কম হবে এমন আশাবাদও ব্যক্ত করি।

সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। বর্তমানে আমাদের নির্গমন করা কার্বন ডাই-অক্সাইডের অর্ধেকই সমুদ্র ও স্থলভাগের গাছপালা শুষে নিচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটাও দুর্বল হয়ে পড়বে যদি মহাসাগরগুলো উষ্ণ হয়ে ওঠে, ভূমি শুকিয়ে যায়, অগ্নিকাণ্ডগুলো আরো বেশি নিয়মিত হয়ে ওঠে এবং ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল (পারমাফ্রস্ট) গলে গিয়ে আরো বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াগুলোর অনেকটিই আমাদের জলবায়ু মডেলের অন্তর্ভুক্ত। যদিও এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত যে এই পরিবর্তনগুলো কতটা দ্রুত ঘটবে এবং বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরিতে এর সামগ্রিক প্রভাব কী হবে।

গ্রহের কিছু চরম পরিবেশেও মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেঁচে থাকার অভিযোজনক্ষমতা লক্ষণীয়। তবে আমাদের দ্রুত অভিযোজন সক্ষমতা, পরিবেশকে বদলে দেওয়ার সক্ষমতা নির্ভর করে আমাদের প্রযুক্তি সুবিধা ও সম্পদ কতটা থাকবে তার ওপর। আমাদের এটাও স্বীকার করতে হবে যে প্রাকৃতিক বিশ্বে আমাদের অভিযোজনের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে নেই। জলবায়ু সংকট এরই মধ্যে প্রবালদ্বীপগুলোর মতো ভঙ্গুর ইকো সিস্টেমের ওপর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিশোধ চালাচ্ছে এবং তাপমাত্রা পরিবর্তন করে বেঁচে থাকতে পারে না এমন অনেক প্রজাতির বিলোপ সাধন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রশমিত না করে বনাঞ্চল ধ্বংস, দূষণ ও অন্যান্য পরিবেশগত ক্ষতিকর তৎপরতা প্রাকৃতিক বিশ্বকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। অথচ এ বিষয়গুলো ঠিক করতে পারলে প্রকৃতিকে আরো প্রাণবন্ত করা যেত।

এই সংকট খুব দ্রুত কিংবা সহজে মিটবে না। আর উত্তপ্ত বিতর্কও আমাদের সহযোগিতা করবে না। মনুষ্য প্রজাতি হিসেবে আমরা যদিও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করতে পারি; কিন্তু সেটা অস্তিত্বের ঝুঁকির বেলায় নয়। আমরা যে প্রকৃত ঝুঁকিটা দেখতে পাচ্ছি, তা হচ্ছে জলবায়ু ইস্যুতে পদক্ষেপ গ্রহণে অনুপ্রেরণার পরিবর্তে বাধা সৃষ্টি, নিয়তিবাদকে উৎসাহিত করা এবং আরো বেশি পরিমাণে মেরুকরণ তৈরি করা। বাস্তবতা হচ্ছে ঝুঁকিগুলো যথেষ্ট গুরুতর এবং আমাদের দরকার ঝুঁকিগুলোকে প্রতিরোধ করতে জরুরি প্রয়োজনের একটা অভিন্ন বোঝাপড়া।

লেখক : জ্যাক হসফাদার, ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ব্রেকথ্রো ইনস্টিটিউটের জলবায়ু এনার্জি বিষয়ক পরিচালক এবং রিচার্ড বেটস, মেট অফিস হ্যাডলি সেন্টার ও ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটারের জলবায়ু প্রভাব বিষয়ক গবেষণাপ্রধান

সূত্র : গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা