kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

সাদাকালো

এই উপমহাদেশের রাজনীতি

আহমদ রফিক

১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এই উপমহাদেশের রাজনীতি

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের অগ্র-পশ্চাৎ কয়েকটি বছর ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবল রাজনৈতিক নৈরাজ্যে কেটেছে। ব্রিটিশ সিংহ তার ভারত শাসন ছেড়ে ঘরে ফিরেছে মসৃণ প্রক্রিয়ায় নয়। অনেক মৃত্যু, অসংখ্য ভারতীয়র বাস্তুত্যাগ এবং লাঞ্ছনা-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে শাসক ইংরেজের ভারত ত্যাগ, ভারত ভাগ করে দিয়ে—এর নাম স্বাধীনতা, সমঝোতার রাজনীতির ফল। পেছনে রেখে গেল অনেক জটিলতা—সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বৈরিতা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত। সমস্যা প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনবহির্ভূত কোনো কোনো স্বশাসিত দেশীয় রাজ্য নিয়ে। সমস্যা বিচারে সবার ঊর্ধ্বে কাশ্মীর। তা এখনো ক্রমবর্ধমান।

বহুমাত্রিক সীমান্তরেখার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব, অপরূপ প্রাকৃত সৌন্দর্য ও একাধিক কারণে ‘ভূস্বর্গ’ কাশ্মীরের ওপর নজর ছিল অনেকের। ছিল পাকিস্তানের স্থপতি জিন্নাহরও। কথিত আছে, তিনি নাকি ভারত বিভাগকালে ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে বলেছিলেন, কাশ্মীর পেলে তিনি পূর্বাঞ্চলের বঙ্গদেশ ছেড়ে দিতে রাজি। অথচ বঙ্গীয় মুসলমান তখন পাকিস্তান বলতে উন্মাদ।

কিন্তু ভারত বিভাগের শর্তাদি অনুযায়ী দেশীয় রাজ্যগুলো ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেবে শাসকের ইচ্ছামাফিক, অধিবাসীদের ধর্মীয় সংখ্যা গুরুত্বের হিসাবে নয়। কাশ্মীর মুসলমানপ্রধান রাজ্য হলেও রাজা হরি সিংহ। এবার ঘটনা সূত্রাকারে বলি—হরি সিংহের দোদুল্যমানতার সুযোগে পাকিস্তানি উপজাতি যোদ্ধা ও নেপথ্যে পাকিস্তানি সেনাদের কাশ্মীর আক্রমণ, অংশবিশেষ দখল, হরি সিংহের রীতিমাফিক ভারতে যোগদান, পাক-ভারত যুদ্ধ, জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ, ঘটনার ঝুলন্ত অবস্থা, গণভোটের প্রস্তাব ইত্যাদি।

বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন বহুল আলোচিত—ডান-বাম সব মহলে। বেশ মনে আছে, তখন পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল তরুণ ও যুবক, এমনকি কোনো কোনো কমিউনিস্ট কর্মীরও সংগোপন অভিমত—কাশ্মীর পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হোক। অবাক হয়ে ভেবেছি, এ তো এক ধরনের মানসিক সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ। পার্টির নেতৃত্বের অভিমত, ভারত যেহেতু পাকিস্তানের তুলনায় গণতন্ত্রী চরিত্রের, কাশ্মীরের ভারতভুক্তিই যুক্তিসংগত। সামান্যসংখ্যক প্রগতিবাদী স্বাধীন কাশ্মীরের পক্ষে। আমি শেষোক্ত দলে।

দুই.

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্তিমলগ্ন থেকে কাশ্মীরের রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন ও চরম জটিলতার সেই যে সূচনা তা এখন কাব্য প্রতীকে বলা যায় মহীরুহে পরিণত। শিক্ষিত শ্রেণিতে, বিশেষ করে মননশীলদের মধ্যে কত না তর্ক-বিতর্ক, বাগ্যুদ্ধ। আমার এক বন্ধুস্থানীয়র এ ব্যাপারে এমনই অবসেশন যে তাঁর দীর্ঘ লন্ডনবাসকালে তিনি নিয়মিত কাশ্মীর নিয়ে হাইড পার্কে বক্তৃতায় যোগ দিতেন, জোরালো ভাষায় কাশ্মীরের পাকিস্তানভুক্তির পক্ষে মতামত প্রকাশ করতেন। স্থানীয় বন্ধুরা তাঁকে ‘কাশ্মীরি মমতাজ’ বলে মজা করত।

মমতাজ মোল্লার সঙ্গে আমার পরিচয় ঢাকায় ১৯৬২ সালে অ্যালবার্ট ডেভিডে সহকর্মী হিসেবে, যদিও বয়সে তিনি কয়েক বছরের বড়। তাঁর বাবা উত্তরবঙ্গের স্বনামখ্যাত এমএলএ (অখণ্ড বঙ্গের), পুত্রকে লন্ডন পাঠিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার (হয়তো বা ব্যারিস্টার হওয়ার) জন্য। কিন্তু মমতাজ পাক রাজনীতির জালে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন যে বড় কিছু ডিগ্রি নেওয়া আর হয়ে ওঠেনি। তাঁর জীবনকথা তাঁর মুখেই শোনা। সুরসিক, নম্র, বিনয়ী, সুদর্শন ব্যক্তিত্ব। খুব ঘনিষ্ঠতার কারণে এত সব কথা।

প্রশ্ন করি, ব্রিটিশরাজের নির্দিষ্ট করা ভারত ত্যাগ ও ভারত বিভাগ সংক্রান্ত নিয়মনীতি ও শর্তগুলো নিশ্চয়ই আপনি পড়েছেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই সব নীতির মধ্যে কাশ্মীররাজের অনিচ্ছায় পাকিস্তান কিভাবে কাশ্মীরের দখল পেতে চায়, আক্রমণই বা করে কোন যুক্তিতে। এক গাল মোহন হাসি নিয়ে মমতাজ মোল্লার জবাব : রাজনৈতিক দিক থেকে কাশ্মীর পাকিস্তানের জন্য খুবই জরুরি। এরপর আর কোনো কথা চলে না।

কাশ্মীর আমার জন্য প্রয়োজনীয়, তাই রীতিনীতি ভঙ্গ করে হলেও কাশ্মীরের জন্য যুদ্ধের ময়দানে নামব—এই হলো পাকিস্তানের যুক্তি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাশ্মীরের জন্য পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে তিন তিনটি যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেছে। সব কয়টি যুদ্ধ অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে কাশ্মীরের জন্য নয়, কাশ্মীর সেখানে অনুষঙ্গ। যেমন আইয়ুবের ১৯৬৫-এর যুদ্ধ, ইয়াহিয়ার ১৯৭১-এর যুদ্ধ।

তবে কাশ্মীর নিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর হুংকার অবশ্য ঐতিহাসিক চরিত্রের—কাশ্মীর দখল করতে প্রয়োজনে পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে হাজার বছর যুদ্ধ করবে। তাঁর এই হুংকারের অবশেষ পরিণাম কী ট্র্যাজেডি সৃষ্টি করেছে তাঁর জন্য, সেই ইতিহাস সবার জানা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, হিংসার পাল্টা প্রতিহিংসা কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গলদায়ক নয়। এটা মানবসভ্যতার চরিত্রবিরোধী।

তিন.

কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে দুর্ভাগ্যজনক টানাপড়েনে স্বভাবত প্রশ্ন ওঠে : কেমন আছে কাশ্মীরবাসী—কী ভারতীয় ভূখণ্ডে, কী পাকিস্তানে।

একসময় ঢাকা-কলকাতা সম্প্রীতি গঠনের উদ্যোগ উপলক্ষে ঢাকায় যে ছোট বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়, তাতে বিপ্লব হালিম, শান্তিরায় প্রমুখ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

আমারও কথা ছিল ভারত গোড়াতে শেখ আবদুল্লাহর ওপর আস্থাশীল হয়ে সাবেক দেশীয় রাজ্যটির জন্য শেখ প্রস্তাবিত দাবিগুলো নিয়ে কমবেশি সমঝোতায় পৌঁছালে গোড়ার গলদ তৈরি হতো না।

আর আজাদ কাশ্মীর কী অবস্থায় আমার জানা নেই। একটি ছোট ঘটনার প্রতীকে অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করব। ঢাকায় সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের এক কাশ্মীরি ছাত্রকে বিহারি অধ্যাপক রসিকতা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে কোন কাশ্মীর থেকে এসেছে—আজাদ কাশ্মীর, না গোলাম কাশ্মীর? ছাত্রটির গম্ভীর জবাব : আজাদ কাশ্মীর। বলেই বোমা ফাটানোর মতো মন্তব্য—‘স্যার, ইয়েভি গোলাম কাশ্মীর হ্যায়।’ বোঝা গেল, যুবক ছাত্রটি স্বাধীন কাশ্মীরের প্রবক্তা। হতে পারে কাশ্মীরি তরুণদের একাংশ স্বাধীন কাশ্মীরের রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

কাশ্মীরকে নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের টানাপড়েন রাজনৈতিক পুতুলখেলা রীতিমতো আপত্তিকর, অবাঞ্ছিত। স্বপ্ন দেখানো হয়েছে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাস্তুত্যাগী হিন্দুদের প্রত্যাবর্তন ইত্যাদির। বাস্তবে সেই স্বপ্নের দেখা মেলেনি।

সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা কমেনি, খুনের সংখ্যা কমেনি বরং বেড়েছে, পর্যটনশিল্পের চরম দুরবস্থা, কাশ্মীরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক পর্যটন, এরপরই উৎপাদন—ফল, পোশাক, শাল, কার্পেট ইত্যাদির উৎপাদনের তাৎপর্যপূর্ণ হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, পঞ্চায়েতি ব্যবস্থা ধসে পড়ার মতো, সর্বোপরি গৃহত্যাগীদের ঘরে ফিরতে দেখা যাচ্ছে না।

এর মধ্যে গত ৪ আগস্ট পাকিস্তান চমক সৃষ্টি করল, নেপালের ধারায় পাকিস্তানের নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে—সেখানে গোটা জম্মু কাশ্মীর-লাদাখ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত। ইমরান খানকে অনেকেই বুদ্ধিমান মনে করতেন, এখন দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভে তিনি সামরিক নেতৃত্বের বিছানো দাবার ছকের ঘুঁটি। তা না হলে এমন রাজনৈতিক দুর্বৃদ্ধির প্রকাশ কেউ ঘটায়? ভারতের প্রতিক্রিয়া যথারীতি, এ ক্ষেত্রে বিচক্ষণ নির্বিকারত্বের।

আমাদের প্রশ্ন : কথিত ‘ভূস্বর্গ’ কাশ্মীর নিয়ে এই অপরিণামদর্শী রাজনীতির খেলা, রক্ত ও মৃত্যুর অবাঞ্ছিত দৃশ্য আর কত দিন চলবে? আন্তর্জাতিক পরিসরে পাকিস্তানের পক্ষে চীন, ভারতের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া। বাকিরা যে যার মতো; মরছে ভারতীয় কাশ্মীরের জনগণ। গোলামি করছে পাকিস্তানের কাশ্মীরি জনগণ। অন্যদিকে জাতিসংঘ-নিরাপত্তা পরিষদ নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

একাধিক দেশে গণহত্যা ও রাজনৈতিক নৈরাজ্যের অবসান ঘটাতে জাতিসংঘ এগিয়ে আসে, কাশ্মীরের বেলায় নয় কেন? দুই পক্ষই তালগাছের অধিকার নিয়ে অনড় বলে? কিন্তু ভারত বিভাগ সংক্রান্ত ইতিহাস ও তথ্যাদি তো পাকিস্তানের পক্ষে সায় দেয় না।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা