kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

প্রকৃতিবান্ধব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হোক

গাজীউল হাসান খান

১২ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



প্রকৃতিবান্ধব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হোক

আকাশে বিপুল মেঘমালা নিয়ে শ্রাবণ বিদায় নিতে যাচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী শ্রাবণের শেষাশেষি যে লাগাতার বর্ষণের আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছিল, সৌভাগ্যক্রমে তা থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। তবে সামনের দিনগুলোতে আবার কী ঘটবে, তা কেউ বলতে পারে না। কারণ খাতা-কলমে বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও বর্ষণ শেষ হয়নি। পূর্বাভাসে ব্যক্ত আশঙ্কা অনুযায়ী শ্রাবণের শেষ দিকে তৃতীয়বারের মতো বন্যার প্রকোপ আর বৃদ্ধি পায়নি। নাটকীয়ভাবে হঠাৎ লাগাতার বর্ষণে ছেদ পড়েছিল। এরই মধ্যে প্রকৃতিতে ক্রমে ক্রমেই প্রকাশ পাচ্ছে শরতের আগমনী বার্তা। টুকরা টুকরা ভাসমান সাদা মেঘের ভেলা এবং তার সঙ্গে এখানে-সেখানে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ক্ষণস্থায়ী বৃষ্টি আমাদের আবহাওয়ায় এখন নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করেছে। এতে তাপমাত্রায় খুব একটা হেরফের এখনো দেখা যাচ্ছে না। ঘরে-বাইরে একটা গুমট ভাব মাঝেমধ্যে অস্থির করে তোলে। এতে বন্যা পরিস্থিতির হয়তো বা কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। রোদ ও তাপমাত্রার কারণে ভাসা পানিতে ক্রমেই টান ধরছে। দেশব্যাপী বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার পানি মোটামুটি দ্রুততার সঙ্গেই নেমে যেতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে সঙ্গে বন্যার পানিতে নাক ভাসিয়ে দ্বীপের মতো জেগে থাকা ঘরবাড়িগুলোও ক্রমেই আরো দৃশ্যমান হচ্ছে। ভেসে উঠতে শুরু করেছে পথঘাট ও আশপাশের জমিজমা। দেশের বিভিন্ন স্থানে আবার বন্যার আশঙ্কা কেটে যাওয়ায় উপদ্রুত মানুষের মনে একটা স্বস্তির ভাব ফুটে উঠছে। তা ছাড়া প্রবল বন্যার তোড়ে রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমে আসছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বন্যাকবলিত মানুষ আবার নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরে আসতে শুরু করেছে কয়েক দিন ধরে। একদিকে দেশব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রকোপ এবং অন্যদিকে সর্বগ্রাসী বন্যায় সাধারণ মানুষ অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েছিল। শুরু থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষকে এতটুকু স্বস্তি দেয়নি। দেখাতে পারেনি কোনো বিশেষ আশার আলো কিংবা দিতে পারেনি কোনো সুখকর ভবিষ্যতের সন্ধান। দেশে বন্যা পরিস্থিতির বেশ কিছুটা উন্নতি হলেও করোনার প্রকোপ নিয়ে এখনো বিশেষ কিছুই বলা যাচ্ছে না।

সর্বগ্রাসী বন্যার এত বড় সাম্প্রতিক সময়ের দুর্যোগের পরও অবসান ঘটেনি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। নতুন আশায় বুক বেঁধে ঘরে ফেরা মানুষের সামনে এখন দেখা দিয়েছে আবার এক নতুন বিপর্যয়। আর তা হচ্ছে নদীমাতৃক এ দেশে নদীভাঙনের এক সর্বনাশা খেলা। ফসলি জমি, বসতবাড়িসহ রাস্তাঘাট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এখন অনেক জায়গায় নদীভাঙনে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। এই নিদারুণ দৃশ্য এ দেশে নতুন নয়। সর্বগ্রাসী কোনো বন্যার পরবর্তী বিপর্যয়ই হচ্ছে কলেরাসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ কিংবা মহামারি। চারদিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর যে বিষয়টি সাধারণ মানুষকে হতবিহ্বল করে তোলে, তা হচ্ছে সর্বনাশা নদীভাঙন। এই ভাঙনে কয়েক দিনের মধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বিভিন্ন সমৃদ্ধ জনপদ। সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সহায়-সম্বলহীন ও ছিন্নমূল। তখন এতটুকু আশ্রয় কিংবা প্রাণ বাঁচানোর জন্য অন্নের সন্ধানে তাদের নিরুপায় হয়ে শহর-নগরের দিকে পা বাড়াতে হয়। মহাপ্রতাপশালী পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা ছাড়া দেশে যে আরো শত শত মাঝারি ধরনের নদী ও শাখা নদী রয়েছে, তাদের কেন্দ্র করেই এখন চলছে ভাঙনের নিদারুণ খেলা। শুধু মাদারীপুর, চাঁদপুর কিংবা লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দারাই এখন শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কথা বলছে না, সমুদ্র উপকূল এবং উল্লিখিত নদীগুলোকে কেন্দ্র করে যে কোটি কোটি বিপন্ন মানুষের বসবাস, তারা সবাই এখন সোচ্চার হয়ে উঠছে স্থায়ী ও শক্তিশালীভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবিতে। কারণ এ ধরনের একটি বন্যা এবং পরবর্তী পর্যায়ে নদীভাঙনের ফলে সৃষ্ট সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কিংবা রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পদের সঠিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা খুব সহজ নয়। এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা অবকাঠামো, অর্জিত উন্নয়নের ফসল এবং সমৃদ্ধিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে বেশি সময় লাগে  না। তাই গ্রামগঞ্জের মানুষ এখন ত্রাণ বিতরণ করতে গেলে বলে, ‘আমরা সাহায্য চাই না, আমাদের শক্তপোক্তভাবে স্থায়ী ও টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করে দিন, নদীভাঙনের হাত থেকে আমাদের বাঁচান।’

পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে অসংখ্য নদীবেষ্টিত বাংলাদেশের মানুষ প্রবল বন্যা ও নিদারুণ নদীভাঙনের হাত থেকে রেহাই পেতে চেয়েছে; কিন্তু এখনো পায়নি। আমি আমার আগের লেখায়ও বলেছি, ১৯৬০ সাল থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও খুব বেশি কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণের বেশির ভাগ টাকা খেয়েছে শিয়াল-শকুনে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন উপকূলবর্তী কয়েক কোটি মানুষকে বন্যা, ঘূর্ণি, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অব্যাহত ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ২০১৫ সালে নেদারল্যান্ডসের প্রকৌশল ও তত্ত্বাবধানে যে ব্যাপক প্রকল্প গ্রহণ করার কথা আমরা জেনেছি, তার প্রথম পর্ব শেষ হওয়ার কথা ছিল এ বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে। ২০০ কোটি ডলারের সে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অগ্রগতির খবর গণমাধ্যমে খুব একটা প্রচারিত হওয়ার কথা জানি না। তবে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় সাহায্য রয়েছে বলে শোনা গিয়েছিল। ১৯৮৮ সালে ঘটে যাওয়া দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পর দেশে আরো বন্যা হয়েছে এবং নদীভাঙনও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু দেশব্যাপী বিভিন্ন স্থানে অতীতে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ বিভিন্ন স্থানে ভেঙে যাওয়া কিংবা ফাটল ধরার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। উজান থেকে বয়ে আসা পলিমাটি ও আবর্জনা অব্যাহতভাবে জমার ফলে বিভিন্ন নদীর তলদেশের গভীরতা ক্রমেই কমে আসছে। এর পাশাপাশি অব্যাহতভাবে চলছে প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় নদীর যেখান-সেখান থেকে বালু উত্তোলনের ব্যবসা। একসময় মনে হয়েছে, এসব দেখার বুঝি কেউ নেই। তবে এখন নিদারুণভাবে নদীভাঙনের ফলে জনসাধারণের অভিযোগের কারণে মন্ত্রীরা এর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা শুরু করেছেন। তা ছাড়া এবারের সর্বগ্রাসী বন্যার পর বর্তমান সরকার শিগগিরই দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ ও নদীভাঙন ঠেকানোর লক্ষ্যে দীর্ঘস্থায়ী এবং টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করছে বলে জানা গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ছয় হাজার কিলোমিটারই বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে উপকূলীয় এলাকায় শিগগিরই টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে আট হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরেই এসব কাজ শুরু হয়ে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা ব্যক্ত করা হয়েছে। এই চারটি প্রকল্পের বাইরে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে আরো কয়েকটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। অব্যাহত নদীভাঙন থেকে দেশবাসী ও তাদের সহায়-সম্পদ রক্ষায় সরকার নদীর তীর সংরক্ষণে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মাদারীপুর শহর রক্ষা বাঁধসহ বেশ কয়েকটি জেলা শহর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে বলে জানা গেছে।

এবারের বন্যার পর আরো একটি সাড়া জাগানো খবর পাওয়া গেছে যে কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা সমুদ্র উপকূলজুড়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়িবাঁধ এবারের বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে উপকূলীয় ২৫টি জেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এ ধরনের একটি অবস্থায় সরকার একটি নতুন মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। তা ছাড়া বাঁধ সুউচ্চ, প্রশস্ত ও টেকসই করার লক্ষ্যে বিভিন্ন নকশায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। আর বাঁধ নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও নেওয়া হচ্ছে নতুন পরিকল্পনা। কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত সুপার ড্রাইভওয়ে নির্মাণ করা হবে বলেও জানা গেছে। এসব খবর শুধু খবরের পর্যায়ে থেকে না গিয়ে দ্রুত বাস্তবায়িত হলে দেশব্যাপী বানভাসি মানুষ কিংবা অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়া মানুষ নতুন আশার আলো দেখতে পাবে। বানের পানিতে ভেসে যাওয়া কিংবা নদীভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজকে ভবিষ্যতে ধরে না রাখতে পারলে আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ ও সমৃদ্ধি—দুটিই বিফলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ দেশব্যাপী দাবি তুলেছে সুউচ্চ, প্রশস্ত ও পরিবেশবান্ধব শক্তপোক্ত বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণের, যাতে তাদের সর্বস্ব বন্যার তোড়ে ভেসে না যায়।

যেখানে-সেখানে নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নদীতে নাব্যতা বৃদ্ধি করাও আবশ্যক হয়ে পড়েছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো শক্তিশালী নদীর দুই তীরে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ ও এর সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি উজান থেকে নেমে আসা ঢল ব্যবস্থাপনায়ও উদ্যোগী হওয়া জরুরি। আমাদের অভিন্ন নদীগুলো ব্যবস্থাপনায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী ব্যবস্থায় আসাও অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। নদী প্রকৃতির একটি অতি মূল্যবান দান, শুধু এটুকু ভেবে বসে থাকলেই চলবে না। এর সংরক্ষণে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে। দরকার হলে এ ক্ষেত্রে যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা কয়েক বছর বিরতির পর ঘটে যাওয়া সর্বগ্রাসী বন্যায় দেশের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাতে আমাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির গতি যেন থেমে না যায় এবং সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা যেন আরো বিপন্ন না হয়ে পড়ে। তা ছাড়া পরিবেশ বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করাও একটি সার্বক্ষণিক দায়িত্ব বলে দেশের মানুষ মনে করে।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা