kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী

তারাপদ আচার্য্য

১১ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী

গীতার কথামতো ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের বৃদ্ধির তাৎপর্য হলো—ভগবদেপ্রমী, ধর্মাত্মা, সদাচারী, নিরপরাধ এবং মানুষের ওপর নাস্তিক, পাপী, দুরাচার, বলবান ব্যক্তিদের অত্যাচার বৃদ্ধি পাওয়া এবং মানুষের মধ্যে সদ্গুণ, সদাচার খুব কমে গিয়ে দুর্গুণ-দুরাচার অত্যধিক বৃদ্ধি পায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিজের জন্ম নিয়ে বলেছেন, আমার জন্ম-মৃত্যু সাধারণ মানুষের মতো নয়। মানুষ জন্মগ্রহণ করে ও মারা যায়; কিন্তু আমি জন্মরহিত হয়েও আবির্ভূত হই এবং অবিনশ্বর হয়েও অন্তর্ধান করে থাকি। আবির্ভূত হওয়া ও অন্তর্হিত হওয়া—দুটিই আমার অলৌকিক লীলা। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আরো বলেছেন, আমি জন্মহীন, অব্যয় আত্মা, ভূতগণের ঈশ্বর (শাসক, নিয়ন্তা, স্রষ্টা) হয়েও নিজ প্রকৃতিকে (অনির্বচনীয় মায়াশক্তি) আশ্রয় করে আত্মমায়ায় জন্মগ্রহণ করি।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানবরূপে জন্ম নিয়েছিলেন আত্মমায়া অবলম্বন করে। অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, সে জন্য এ জন্মকে অপ্রাকৃত বলা হয়। একটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে নির্দিষ্ট করেই শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। ধরিত্রীর প্রকৃতিগত বিধান অনুসরণ করে অলৌকিক কর্মগুলো মানবসভ্যতাকেও বিকশিত করেছিল। লক্ষণীয় যে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবকালে মানবসমাজ ছিল গ্লানিযুক্ত। ধর্মের জন্য চরম অবমাননাকর। নৃপতিরা প্রজাদের পীড়নে মত্ত থাকত। মুনি-ঋষিদের ধর্মাচারে প্রচণ্ডভাবে বিঘ্ন ঘটতে থাকে। সমাজজীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। ধরিত্রী মাতা পাপাচার সহ্য করতে পারছিল না। এমন পরিস্থিতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা তথা প্রতিবিধানকল্পে পরম বিষ্ণুই শ্রীকৃষ্ণরূপে ধরাধামে আবির্ভূত হন, যার বর্ণনা করা হয়েছে। সনাতন ধর্মের আধ্যাত্মিক ভাবের একটি প্রধান অনুষঙ্গ শ্রীকৃষ্ণের জন্মলীলা। দুষ্টের দমন শিষ্টের রক্ষা এবং মানবকল্যাণে আবির্ভূত হয়ে মানবসমাজের বৈরিতা, তমসা অপসারণ করে ভক্তিরসে ভরিয়ে দেন ধরিত্রীকে। সেই সঙ্গে মানবিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীকৃষ্ণ। বস্তুত সাধকের কল্যাণে ভগবান মানবরূপ ধারণ করে জগতে আসেন। এই মহান ভাবের সমর্থনে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর এক কবিতায় উল্লেখ করেছেন, ‘তুমি বহুরূপী, তুমি রূপহীন, তব লীলা হেরি অন্তবিহীন।’ আবার ভগবতে উল্লেখ আছে, ‘অনুগ্রহায় ভূতানাং মানুষং দেহমাস্থিতঃ।’ অর্থাৎ ভক্তের প্রতি অনুগ্রহবশত মানবদেহ ধারণ করে সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করে মানবকুলকে আকৃষ্ট করেন। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন—

     যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত, 

     অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মনং সৃজাম্যহম

অর্থাৎ যখন ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের প্রাদুর্ভাব ঘটে তখন ধর্ম রক্ষার্থে আমি নিজেই নিজেকে সৃজন করি। কী চমৎকার ভাব! এই ভাবের ফলেই শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বা আবির্ভাব। শাস্ত্রে কুরুক্ষেত্রের যে যুদ্ধের কথা বর্ণিত হয়েছে, সেটি ছিল ধর্মযুদ্ধ। জগতের কল্যাণ ও বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিতে সভ্যতার স্বার্থ রক্ষায় শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এ ধরনের যুদ্ধের অবতারণা করেন। যুদ্ধ কোনো ভালো কিছু না হলেও মানবজাতি এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বৈরিতা ও অন্যায় কর্ম অনুসরণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য প্রেরণা লাভ করবে।

মানুষের মাঝেই ভগবানের অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে। শুধু প্রয়োজন সাধনার। আর সাধনার লক্ষ্যেই শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালিত হয়। মহিমান্বিত হয় ধর্ম অনুশীলন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ভগবান কী? যিনি সর্বাপেক্ষা বৃহৎ, তিনিই ভগবান। বেদে তাঁর পরিচয় ব্রহ্ম। এত বড় যে তিনি আমাদের নাগালের বাইরে। আমাদের ষড় ইন্দ্রিয়, আমাদের ক্ষুদ্র মন, আমাদের সংকীর্ণ বুদ্ধি—এসবের তিনি বহু ঊর্ধ্বে। তাঁকে পাওয়া আমাদের সাধ্যের বাইরে, তবে তাঁকে পাওয়ার জন্য ভক্তের নিরন্তর আকুলতা সৃষ্টিকর্তার মনেও দোলা না দিয়ে পারে না। এ সমস্যার সমাধান করলেন তিনি নিজেই নিত্য ও অনুগ্রহ শক্তির প্রেরণায় ‘অনুগ্রহায় ভূতানাং’। কৃপা করে তিনি এলেন এই ধূলির ধরায়, আমাদের দুয়ারে। ভগবান অবতরণ করলেন মানুষের ঘরে, করুণায় বিগলিত হয়ে। সীমাহীন ধরা দিলেন সীমানার কিনারে, মানুষ সেজে। পরম ব্রহ্ম শুদ্ধাভক্তি দেবকী ও শুদ্ধসত্য বাসুদেবের ঘরে কৃষ্ণরূপে পুত্র পরিচয়ে।

আবির্ভাব ভাদ্র মাসে। ভদ্র+ষ্ণ=ভাদ্র। ভাদ্র মানে মঙ্গল। এই মাস মঙ্গলকর হয়েছিল ভগবানের আবির্ভাবে বা মঙ্গলকর মাসে মঙ্গলময়ের আবির্ভাব।

আবির্ভাব কৃষ্ণপক্ষে অষ্টমী তিথিতে। কৃষ্ণপক্ষ চন্দ্রের ক্রমক্ষীয়মাণ অবস্থা। শাস্ত্রে মনকে চন্দ্র বলা হয়েছে। চন্দ্রের যেমন হ্রাস-বৃদ্ধি হয়, মনেরও তেমন হয়। মন ইন্দ্রিয়ের রাজা। মন যতক্ষণ প্রবল থাকে, ততক্ষণ চিত্ত চঞ্চল থাকে। কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মনশ্চন্দ্র অর্ধেক ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যায়। তখন চিত্তে ভগবৎ আবির্ভাব সম্ভব।

ঈড়া ভগবতী গঙ্গা পিঙ্গলা যমুনা নদী। পিঙ্গলা যমুনা। পিঙ্গলারূপী যমুনা নদীর তীরে শ্রীকৃষ্ণের কত লীলা! দেবকীর অষ্টম গর্ভে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। অষ্টভূতে, অষ্ট প্রকৃতিতে ব্রহ্মা রচিত।

যাওয়ার সময় যমুনা পার হয়ে আগে শিয়াল গিয়েছিল, তাকে বলা হয় শিবা। শিবা-শিবশক্তি-মঙ্গলশক্তি, যা সাধকের সাধনার পথে বাধাকালে অনুপ্রেরণা দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম রোহিণী নক্ষত্রে। রুহ্+ইন্ করে রোহিণী শব্দের উৎপত্তি। রুহ অর্থ উৎপত্তি হওয়া। মন অনবরতই উৎপন্ন করে থাকে। উৎপত্তির মধ্যে শ্রেষ্ঠ উৎপত্তি ভগবদুৎপত্তি। উৎপত্তি করে বলে মনরূপী চন্দ্র রোহিণী বেশি সঙ্গ করে।

নবজাতক শ্রীকৃষ্ণকে কারাগার থেকে যমুনা পার হয়ে নন্দালয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায় সর্প ফণা বিস্তার করে আছে। এই সর্প হলো সাধকের দেহস্থা জাগ্রতা কুণ্ডলিনী শক্তি। সাধক সাধনায় এই কুণ্ডলিনী শক্তিকে ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত উত্থিত করেন।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মগ্রন্থ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে বিশৃঙ্খল ও অবক্ষয়িত মূল্যবোধের পৃথিবীতে মানবপ্রেমের অমিয় বাণী প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভগবানের জন্মলীলার এই হচ্ছে সারসংক্ষেপ মাত্র।

গীতা অ. ৭। শ্লোক-২৯-এ উল্লেখ আছে

জরামরণমোক্ষায় মামাশ্রিত্য যতন্তি যে।

তে ব্রহ্ম তদবিদুঃ কুত্স্নমধ্যাত্মং কর্ম চাখিলম্

অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যাহারা আমাতে চিত্ত সমাহিত করিয়া জরামরণ হইতে মুক্তিলাভের জন্য প্রার্থনা করেন তাহারা সেই সনাতন ব্রহ্ম, সমগ্র অধ্যাত্ম বিষয় এবং সমস্ত কর্মতত্ত্ব অবগত হন।

সুতরাং আজ এই বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস থেকে পরিত্রাণের জন্যও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের করুণা কামনা করতেই হবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক

সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম

দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা