kalerkantho

সোমবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৭ । ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৩ সফর ১৪৪২

কভিড-১৯, তামাদিকাল বর্ধিতকরণ এবং বাংলাদেশ (লিগ্যাল প্রসিডিং) অর্ডার-১৯৭২

মামুন চৌধুরী

১০ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কভিড-১৯, তামাদিকাল বর্ধিতকরণ এবং বাংলাদেশ (লিগ্যাল প্রসিডিং) অর্ডার-১৯৭২

সাম্প্রতিককালে কভিড-১৯ ভাইরাসজনিত কারণে আমাদের বিচার বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রম এক প্রকার বন্ধ ছিল বা এখনো আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় বিচার বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার এমন নজির নেই। দীর্ঘদিন বিচার বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে বিচারপ্রার্থীরা আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন, আর এসব জটিলতার মধ্যে অন্যতম প্রধান জটিলতাটি হচ্ছে মামলা-মোকদ্দমা, আপিল, রিভিশন ইত্যাদি দায়েরের ক্ষেত্রে তামাদির মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়াসংক্রান্ত সমস্যা।

তামাদি আইন যেকোনো বিচারব্যবস্থায় একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তামাদি আইন একজন বিচারপ্রার্থীকে আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করে দেয়। দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ধরনের বিচারব্যবস্থায় তামাদি আইনের প্রয়োগ রয়েছে। আমাদের দেশে প্রচলিত তামাদিবিষয়ক সাধারণ আইনটি হচ্ছে ‘তামাদি আইন ১৯০৮’  (The Limitation Act 1908)| এই আইনে বিভিন্ন ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা-মোকদ্দমা, আপিল, রিভিশন ইত্যাদি দায়েরের ক্ষেত্রে তামাদির মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রচলিত অনেক স্পেশাল বা বিশেষ আইনেও তামাদির নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করা আছে। বিশেষ আইনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বা সর্বাধিক প্রচলিত আইনগুলো হচ্ছে, ‘হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন ১৮৮১’

(The Negotiable Instrument Act 1881), ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪’ (Special Powers Act 1974), ‘কাস্টমস আইন ১৯৬৯’ (The Custom Act 1969), মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ (রহিত), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩ ইত্যাদি। এসব বিশেষ আইনে সুনির্দিষ্ট তামাদি মেয়াদ উল্লেখ রয়েছে, যা নতুন মামলা দায়ের বা দায়েরকৃত মামলা থেকে উদ্ভূত আপিল, রিভিশন দায়েরের ক্ষেত্রে অবশ্যপালনীয়।

তামাদি আইন ১৯০৮-এর ৩ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তামাদির মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর কোনো আদালতে কোনো মামলা, আপিল, রিভিশন, দরখাস্ত ইত্যাদি দায়ের করা হলে তা ওই আইনের ৪ থেকে ২৫ ধারার বিধান সাপেক্ষে সরাসরি খারিজ হবে। তামাদি আইনের ৫ ধারায় তামাদির মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো মামলা থেকে উদ্ভূত আপিল, রিভিশন ইত্যাদি গ্রহণের বিষয়ে আদালতকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। তামাদি আইনের ৩ ও ৫ ধারার বিধান এবং এ বিষয়ে আমাদের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নজির পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যেকোনো আপিল, রিভিশন বা দরখাস্ত দাখিলের ক্ষেত্রে তামাদির মেয়াদ মওকুফ বা বর্ধিত করার বিষয়ে আদালতের এখতিয়ার রয়েছে, তবে নতুন মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতের তামাদির মেয়াদ মওকুফ বা বর্ধিত করার এখতিয়ার নেই। এ ছাড়া আমাদের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান হচ্ছে, বিশেষ আইনের অধীন দায়েরকৃত কোনো মামলা-মোকদ্দমা, আপিল, রিভিশন, দরখাস্ত ইত্যাদি দায়ের ক্ষেত্রে তামাদির মেয়াদ মওকুফ বা বর্ধিত করার এখতিয়ার কোনো আদালতের নেই; অর্থাৎ বিশেষ আইনে বর্ণিত তামাদির মেয়াদ কোনো অবস্থায়ই মওকুফ বা বর্ধিত করার সুযোগ নেই ।

কভিড-১৯ ভাইরাসজনিত কারণে ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের আদালতসমূহে নিয়মিত বা স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল বা আছে। এই দীর্ঘ সময়ে কোনো নিয়মিত আদালতে দেওয়ানি-ফৌজদারি মামলা-মোকদ্দমা, আপিল, রিভিশন ইত্যাদি দায়েরের কোনো সুযোগ ছিল না, যদিও কোনো কোনো আদালতে সীমিত আকারে ভার্চুয়াল বিচার কার্যক্রম চালু ছিল বা আছে। আদালতসমূহের নিয়মিত বা স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে অনেক মামলা-মোকদ্দমা, আপিল, রিভিশন, দরখাস্ত দায়েরের ক্ষেত্রে তামাদির নির্ধারিত মেয়াদ এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়ে গেছে বা যাবে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সম্প্রতি সিভিল আপিল নম্বর ২৮/২০১৯ মো. ফজলুল হক সরদার গং বনাম গ্রামীণফোন লিমিটেড মামলায় ৬ আগস্ট ২০২০ তারিখে একটি যুগান্তকারী আদেশ প্রদান করেছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আপিল বিভাগ কমপ্লিট জাস্টিস নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওই আদেশ প্রদান করে সকল প্রকার মামলা-মোকদ্দমা, আপিল, দরখাস্ত, রিভিশন ইত্যাদি দায়েরের ক্ষেত্রে তামাদির মেয়াদ যা ২৬ মার্চ ২০২০ তারিখে অতিক্রান্ত হয়ে গেছে তা ৩১ আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত বর্ধিত করেছেন। বিশেষ আইনে বর্ণিত তামাদির মেয়াদ বর্ধিতকরণের ক্ষেত্রে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার না থাকার বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট তাদের আদেশে উল্লেখ করেছেন ।

আমাদের সুপ্রিম কোর্টের ওই আদেশটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বিশেষ আইনে উল্লিখিত তামাদির মেয়াদ বর্ধিতকরণ বা তামাদির মেয়াদ মওকুফকরণের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী নজির বটে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী উল্লিখিত আদেশটি দেশের সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালের জন্য বাধ্যকর মর্মে ঘোষণা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সময়ের প্রয়োজনে মহামারিজনিত কারণে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তামাদি মওকুফের বিষয়টি নিয়ে যথার্থ আদেশ প্রদান করেছেন; কিন্তু আমাদের সংবিধান মহান জাতীয় সংসদকে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে অপরিসীম ক্ষমতা প্রদান করেছেন তার আলোচনাও এই বিষয়ে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন বা আইনের সংশোধন বিষয়ে গবেষণা, চর্চা ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে বলেই মনে হয়। আইন কমিশনও বিশেষ পরিস্থিতিতে সংসদ বা মন্ত্রণালয়কে উপযুক্ত আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছে কি না তা-ও দৃশ্যমান নয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সংসদে অনেক বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ও আইনজ্ঞদের সরব উপস্থিতি ছিল এবং তাঁরা তাঁদের জ্ঞান, বিদ্যা, বুদ্ধি, যুক্তি ও দূরদর্শিতা দিয়ে জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সময়োপযোগী অনেক আইন প্রণয়ন করে গেছেন। বর্তমান কভিড-১৯ ভাইরাসজনিত কারণে বাংলাদেশের আদালতের কার্যক্রম যেমন দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ ছিল বা আছে, অনুরূপ পরিস্থিতি কিন্তু ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সৃষ্টি হয়েছিল। স্বাধীনতাকামী বাঙালি ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল যদিও ওই সময়ে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জোরপূর্বক কিছু আদালতের কার্যক্রম চালু রেখেছিল। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস স্বাধীনতাযুদ্ধের কারণে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মামলা-মোকদ্দমা দায়েরের ক্ষেত্রে তামাদি আইনের প্রয়োগের ফলে বিচারপ্রার্থীদের আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি জটিলতার বিষয়টি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তৎকালীন সরকার অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বিধায় এই সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁরা উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করেছিলেন এবং সেই আইনটি হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ (লিগ্যাল প্রসিডিং) অর্ডার ১৯৭২ [১৯৭২ সালের ১২ নম্বর আইন]’ বা

‘The Bangladesh (Legal Proceedings) Order 1972 [Act 12 of 1972]’ [Ref. bdlaws.minlaw.gov.bd/act-print-372.html]|

 এই আইনের ভূমিকায় স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে জনগণ কর্তৃক আদালতের আশ্রয়বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি এবং যথাসময়ে আদালতের আশ্রয় না পাওয়ার কারণে তামাদির মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়াজনিত উদ্ভূত সমস্যা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।

স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে আদালতের আশ্রয় না পাওয়ার কারণে মামলা-মোকদ্দমা, আপিল, রিভিশন, দরখাস্ত দায়েরের ক্ষেত্রে তামাদির মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়াসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ওই আইনের ৪ ধারায় সকল প্রকার তামাদি মেয়াদ মওকুফ করে যে বিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা নিম্নরূপ :

4. Notwithstanding anything contained in any other law for time being in force, in computing the period of limitation prescribed for any legal proceeding by or under any law, the period between the 1st day of March, 1971 and the 1st day of March, 1972 (both days inclusive), shall be excluded.

উল্লিখিত ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রচলিত অন্য কোন আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, বিচারিক কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত তামাদির মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে ১ মার্চ ১৯৭১ হইতে ১ মার্চ ১৯৭২ সালের মধ্যবর্তী সময় তামাদিকাল গণনা হইতে বাদ যাইবে।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার কর্তৃক প্রণীত উল্লিখিত আইনটি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দীর্ঘ ৯ মাস দেশের জনগণ বিভিন্ন কারণে আইন-আদালতের আশ্রয় লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল এবং বর্তমান সময়েও জনগণ কভিড-১৯ ভাইরাসজনিত কারণে আইন-আদালতের আশ্রয় লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে বা হচ্ছে এবং এরই মধ্যে অনেক মামলা, আপিল, রিভিশন ইত্যাদির নির্ধারিত তামাদির মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় বিচারপ্রার্থীদের আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে আমাদের জাতীয় সংসদ বিশেষ আইন ও সাধারণ আইনে উল্লিখিত তামাদির মেয়াদ বর্ধিতকরণ বা মওকুফকরণের বা তামাদিকাল গণনাসংক্রান্ত আইনগত জটিলতার বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য ‘বাংলাদেশ (লিগ্যাল প্রসিডিং) অর্ডার ১৯৭২’-এর প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ওই আইনের ৪ ধারার অনুরূপ একটি নতুন ধারা সংযোজন করে অথবা এই বিষয়ে একটি নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। তামাদির মেয়াদ বর্ধিতকরণ বা মওকুফকরণের বিষয়ে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য ‘বাংলাদেশ (লিগ্যাল প্রসিডিং) অর্ডার ১৯৭২’-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়ন করা আবশ্যক বলে মনে করি। কারণ সুপ্রিম কোর্টের ৬ আগস্ট ২০২০ তারিখের আদেশ বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো নতুন আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হবে না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না।

লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, সিনিয়র পার্টনার, অ্যাকর্ড চেম্বার্স

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা