kalerkantho

সোমবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৭ । ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৩ সফর ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব অনেক বেশি জরুরি

জয়ন্ত ঘোষাল

১০ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব অনেক বেশি জরুরি

সিএএ। এ হলো সংক্ষেপে ভারতীয় আইনের পরিচিত নাম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাম দিয়েছেন ‘ক্যা’। সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-২০১৯। বাংলায় বলা হচ্ছে, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। ২০১৯ সালের ১০-১১ ডিসেম্বর সংসদে এই আইন পাস হয়। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করা হলো। লোকসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই বিলটা পেশ করেন। ১০ ডিসেম্বর লোকসভায় এবং ১১ ডিসেম্বর বিলটি রাজ্যসভায়ও পাস হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ আইনটিতে স্বাক্ষর করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেন।

এই আইন অনুসারে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর অথবা তার আগ পর্যন্ত যারা ভারতে অনুপ্রবেশকারী তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। কারণ এই আইনের লক্ষ্য আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা কিছু শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানকে নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন। এই আইনে মুসলমানদের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে এই আইন পাস হওয়ার পর ভারতের নানা প্রান্তে এর তীব্র বিরোধিতা ও বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। এই আইন সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থাৎ জনসমক্ষে বিরোধিতা করেনি। বাংলাদেশের ভাষ্য, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু অন্দরমহলের খবর হলো, তখনই শেখ হাসিনার সরকার ভারতকে তাদের ক্ষোভ, আশঙ্কা ও অসন্তোষ জানায়। দিল্লিতে বাংলাদেশের তৎকালীন হাইকমিশনার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেও এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানান। কারণ অনুপ্রবেশকারী শব্দটি নিয়েই বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ভারতের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছেও এটি হলো অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। আমি জানি, তখনই পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ঢাকাকে জানিয়ে দেন, যাতে এই আইন নিয়ে তারা কোনো আশঙ্কায় না ভোগে। বাংলাদেশ সমস্যায় পড়বে এমন কোনো কাজ ভারত করবে না। এরপর জয়শঙ্কর ঢাকায় গিয়ে হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেও এই আশ্বাস দেন। নতুন পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাও (যিনি আগে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন) ঢাকায় যান। তবে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে বিশেষত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হুংকার দিয়েছেন বারবার, যেকোনো মূল্যে ‘ক্যা’ বাস্তবায়িত হবে। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এই আইন প্রয়োগের কথা।

কিন্তু এরই মধ্যে প্রকাশিত সর্বশেষ খবর হলো, সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এই ‘ক্যা’ বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিধিগুলো (রুল) চূড়ান্ত করার জন্য আরো তিন মাস সময় চেয়েছে। লোকসভা ও রাজ্যসভা এই দুই কক্ষেই স্ট্যান্ডিং কমিটিগুলোর মধ্যে সাব-অর্ডিনেট লেজিসলেশনের পৃথক কমিটি আছে। এই কমিটিতে একজন চেয়ারম্যান এবং ২৫ জন সদস্য আছেন। ভারতীয় সংবিধানে আইন ও বিধির মধ্যেও ফারাক আছে। আইন প্রণয়নের পরও ছোটখাটো সব বিধি প্রণয়ন করতে হয়, তা না হলে আইন কার্যকর হয় না। এই হলো প্রধান আইন প্রণয়নের অধীন আইনি প্রক্রিয়া। তাই এটি সাব-অর্ডিনেট আইন প্রণয়ন। সংসদ ম্যানুয়াল অনুসারে ছয় মাসের মধ্যে এই বিধিগুলো প্রণয়ন করতে হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই কাজটি করার জন্য আরো তিন মাস সময় চাইল স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছ থেকে।

কারণ? আপাতভাবে কারণ হলো করোনা মহামারি। গোটা দেশ এখন বিপর্যস্ত। কোনো সন্দেহ নেই, এই সময়ে এ ধরনের আইন ১৩৫ কোটি মানুষের দেশে বাস্তবায়ন করা কার্যত অসম্ভব ব্যাপার। এ ছাড়া এখন করোনার জন্য কেন্দ্রকে বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে সংঘাত নয়, সুসম্পর্ক রক্ষা করে সমন্বয় রক্ষা করে মোদি সরকারকে এগোতে হচ্ছে। এ অবস্থায় নাগরিকত্ব আইন প্রয়োগ করা মানেই ভয়াবহ সংঘাত সৃষ্টি করা। তাই আপাতত আরো তিন মাস সময় চাওয়াই বিচক্ষণতা।

তবে আমার মনে হচ্ছে, শুধু দেশের ভেতরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, চীনের সাম্প্রতিক সময়ের আগ্রাসনের পর নরেন্দ্র মোদির কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। চীনের আগ্রাসনের পর নড়েচড়ে বসেছে পাকিস্তান। সে দেশের সন্তোষের যথেষ্ট কারণ আছে। পাকিস্তানের কূটনীতিকরা আমাকে অনেকবার বলেছেন, আপনার ভারত সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে রাজি নয়। কিন্তু ঘাড়টা একটু ঘোরাতেই যখন অন্যদিকে চীন নামের দেশটি, তখন আপনাদের মনোভাব বদলে যায়। চীন যতই আগ্রাসন করুক, আপনারা আলোচনার পথ থেকে সরেন না। তাই পাকিস্তানের জন্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক আর চীনের জন্য বন্ধুত্ব? এত কিছুর পরও? এবার তাই চীনের মনোভাবে পাকিস্তান যারপরনাই আহ্লাদিত।

শুধু চীন নয়, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, এমনকি শ্রীলঙ্কা—এসব রাষ্ট্রে চীন যেভাবে বেশ কয়েক বছর ধরে অর্থ সাহায্য ও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাতে ভারত এখন বুঝতে পারছে সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে প্রকৃত বন্ধু বাংলাদেশ। প্রথম ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রবল সংঘাতের মধ্য দিয়ে রক্তক্ষয় করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেখানে বাংলাদেশ আর যা-ই হোক অতীত ইতিহাস সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, এ ভাবনা যাঁরা ভাবেন, তাঁরা জেনেবুঝে, নয় ষড়যন্ত্র রচনা করছেন অথবা তাঁরা বিশুদ্ধ আহাম্মক। বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষত এত সহজে ভুলে যাবে দেশের মানুষ? ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের যখন ফল প্রকাশিত হলো বাংলাদেশের এক টিভি চ্যানেল সেদিনই আমার সাক্ষাৎকার নেয়, নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ নীতি কী হতে পারে তা নিয়ে। দিল্লির জনপথ হোটেলের একটি ঘরে অস্থায়ী স্টুডিও বানানো হয় ক্যামেরা লাগিয়ে। সেদিন আমাকে অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। কারণ ভোটের আগে মোদি উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও কলকাতা গিয়ে বলেছিলেন ভোটে জিতলে দেশের অনুপ্রবেশকারী তাড়াবেন। আমিও বলেছিলাম, ভোটের আগে দলের ইশতেহার বা ঘোষিত কর্মসূচির কথা মোদি বলেছেন। এটা বিজেপির বহুদিনের প্রাচীন দলীয় কর্মসূচি। ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত যখন দেব গৌড়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন, সেদিন রাষ্ট্রপতি ভবনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সিপিআইয়ের প্রবীণ নেতা বলেছিলেন, অনুপ্রবেশ সমস্যা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণ করতে হবে। সেদিন কিন্তু লালকৃষ্ণ আদভানি বিজেপির বিরোধী নেতা হিসেবে ইন্দ্রজিৎ বাবুর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, কোনো সভ্য দেশ পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া অন্য দেশের নাগরিককে থাকতে দেয়? আপনি ভিসা ছাড়া আমেরিকা যেতে পারেন আইনি পথে? কাজেই মোদি, অমিত শাহ যা করছেন তা দলের বহু পুরনো বিষয়। অতীতে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না, আজ আছে। তাই এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে এই সরকার। সংঘ পরিবারও এ জন্য খুব খুশি।

কিন্তু আমি সেদিন বলেছিলাম, মোদি মতাদর্শগতভাবে এ কথা বললেও এটা বাস্তবে প্রয়োগ করতে ব্যস্ত হবেন না। আজও বলছি, মোদি সরকার বাংলাদেশকে ক্ষুব্ধ করে এ ব্যাপারে আর এগোতে চায় না। বরং ইমিগ্রেশন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে সরকারের অন্দরমহলে। জয়শঙ্কর এই ভাবনা-চিন্তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। করোনা বিপর্যয়েও অভিবাসন, পরিযায়ী মানুষের কথা বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শেষ করি সম্প্রতি পড়া ইমিগ্রেশন নিয়ে একটি বইয়ের কথা বলে। লেখক সুকেতু মেহেতা। তিনি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার অধ্যাপক। গুজরাটে পারিবারিক শিকড়, কিন্তু জন্ম কলকাতায়। তারপর লন্ডন ও নিউ ইয়র্ক। তিনি তাঁর দাদামশাইয়ের গপ্পো লিখেছেন। তিনি গুজরাট থেকে আফ্রিকা চলে যান ব্যবসার জন্য। পরে লন্ডনে এসে থাকতে শুরু করেন। একদিন সকালে লন্ডনের পার্কের বেঞ্চে বসে একা একা রোদ পোহাচ্ছিলেন। হঠাৎ এক সাহেব এসে তাঁকে বলেন, তুমি কে হে? কেন এ দেশে এসে আমাদের জায়গা দখল করছ? করো কী তোমরা? জবাবে দাদামশাই বলেন, আমরা ঋণদাতা। তোমাদের ঋণ দিয়েছি অনেক। তোমরা আমাদের দেশকে কলোনি বানিয়ে বহু বছর ধরে সোনা, হীরা ও নানা সম্পদ লুট করে এ দেশে নিয়ে এসেছ। সেই ঋণ দেওয়া সম্পত্তি আজ ফেরত নিতে এসেছি। যেমন—বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে তিনি তাঁর বই ‘ঞযরং খধহফ রং ঙঁৎ খধহফ : অহ ওসসরমত্ধহঃং গধহরভবংঃড়’-তে লিখেছেন, ব্রিটিশরা ভারত থেকে মুসলিম শ্রমিকদের নিয়ে যায় বার্মায় ধান চাষ করানোর জন্য। এই নীতির ফলে ১৮৭১ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে ওই মুসলমান জনসংখ্যা তিন গুণ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা প্রতিশ্রুতি দেয় যে এই রোহিঙ্গাদের জন্য এক পৃথক মুসলিম জাতীয় এলাকা তৈরি করে দেবে, যদি তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে সমর্থন জানায়। স্বাধীনতার পর বৌদ্ধ শ্রীলঙ্কাবাসীরা এদের বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী ভাবতে থাকে। ভারত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রাধিকার না দিয়ে ভারসাম্য করতে চেয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গেও এ জন্য ঢাকার ক্ষোভ ছিল। এদিকে বাংলাদেশি নাগরিক বলে ভারত থেকে কিছু মানুষকে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অত্যন্ত খুশির কথা, বাংলাদেশের এই বিষয়গুলো নিয়ে ভারত মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার রাস্তা নির্মাণের বিষয়টি নিয়েও ভারত প্রকাশ্যে বক্তব্য পেশ করেছে।

আশার কথা, নরেন্দ্র মোদি নিজে সমস্যার গভীরে যেতে চান। আর এমন কিছু করতে চান না, যাতে বাংলাদেশ সমস্যায় পড়ে।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা