kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

বঙ্গমাতা : এক মহীয়সী নারী

এম এম ইমরুল কায়েস

৯ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বঙ্গমাতা : এক মহীয়সী নারী

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াল কালরাতে ইতিহাসের জঘন্যতম কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ডে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের সঙ্গে তিনিও নির্মমভাবে নিহত হন।

জাতির পিতা সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি; যদিও তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বকে সম্পূর্ণরূপে জানা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বাঙালি জাতির হাজার বছরের লালিত স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তাঁর জন্যই সার্থক রূপ লাভ করে। আর বঙ্গমাতা ছিলেন স্বামী-সংসার অন্তপ্রাণ এক প্রকৃত বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি; যিনি শোষিত-নিপীড়িত জনসাধারণকে মুক্তির মন্ত্রে জাগিয়ে তোলার সংগ্রামে স্বামীর ছায়া আঁকড়ে থাকা সহযোদ্ধাও ছিলেন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে বঙ্গমাতা সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন এবং প্রেরণা জুগিয়েছেন। স্বামীর সব সিদ্ধান্তে মনস্তাত্ত্বিক সহযোগিতা ছাড়াও এই মহীয়সী নারীর দেওয়া পরামর্শ অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হয়েছে।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণার পর কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতা ছয় দফাকে আট দফায় রূপান্তরের অপচেষ্টা করেন। সেই সময় ছয় দফা থেকে একচুল এদিক-ওদিক যাবেন না—এটাই ছিল বঙ্গমাতার সিদ্ধান্ত। বঙ্গমাতার রাজনৈতিক সচেতনতার জন্যই তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। আর ছয় দফা আন্দোলনের সব থেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কারাবন্দিদের মুক্তির জন্য ৭ জুনের হরতাল সফল করা, সেটাও সফল হয়েছিল বঙ্গমাতার প্রচেষ্টায়। তিনি নিজ বাসা থেকে আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে সেখান থেকে স্যান্ডেল আর বোরকা পরে জনসংযোগে বেরিয়ে পড়তেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন জাতির পিতা জেলে, তখন আইয়ুব খান গণমানুষের প্রবল আন্দোলনের মুখে দিশাহারা হয়ে বঙ্গবন্ধুকে গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়। ওই বৈঠকে যোগ দিতে হলে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোর যেতে হবে। তখনকার সময়ের অনেক জাঁদরেল রাজনীতিবিদও বঙ্গবন্ধুর ওপর চাপ প্রয়োগ করেন বৈঠকে বসার জন্য। কিন্তু তিনি সরাসরি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বৈঠকে যোগ না দিতে অনুরোধ জানান। জাতির পিতা সেদিন তাঁর সহধর্মিণীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বৈঠকে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব অভিযুক্ত একসঙ্গে নিঃশর্ত মুক্তিলাভ করেন। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়।

১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় বঙ্গমাতা পুলিশ ও গোয়েন্দা চক্ষুর আড়ালে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন। বিচক্ষণতার সঙ্গে ছাত্রদের তিনি নির্দেশনা দিতেন এবং অর্থ সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতেন। এমনকি নিজের গয়না বিক্রি করেও অর্থ জুগিয়েছেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় বিভিন্ন দল দাবি তুলেছিল, ভোটের আগে ভাত চাই। কিন্তু বঙ্গমাতা আওয়ামী লীগের নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেন।  

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের নেপথ্যেও ছিলেন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব। যে ভাষণ আজ সারা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। ১৯৭১-এর ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় যাওয়ার আগে দুপুরে খাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বঙ্গমাতা ও বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সেদিন জাতির পিতা কী বলবেন, সে সম্পর্কে অনেকে অনেক পরামর্শ দেন। বঙ্গমাতা বলেছিলেন, ‘তুমি মনে রেখো—তোমার সামনে আছে জনতা আর পেছনে বুলেট। তোমার মন যা চাইবে, সে কথাই আজ বলবে।’

জাতির পিতা ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। বঙ্গমাতা তাঁর সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে পালিয়ে থাকা অবস্থায় গ্রেপ্তার হলে তাঁঁকেসহ পরিবারের সবাইকে ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়। বড় ছেলে শেখ কামাল যুদ্ধে গেছেন এবং শেখ জামালও একদিন পালিয়ে যুদ্ধে চলে যান। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু দমে যাননি বঙ্গমাতা। বন্দি অবস্থায়ও কোনো আপস বা পাকিস্তান সরকারের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণ করেননি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। বিশেষ করে সম্ভ্রমহারা মা-বোনদের সহযোগিতা করা, তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং অনেক বীরাঙ্গনাকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেন তিনি। নিজের গয়না পর্যন্ত তাঁদের দিয়েছেন। সম্ভ্রমহারা নির্যাতিতা নারীদের জন্য বঙ্গমাতা নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তাঁদের পুনর্বাসন ও জীবিকার ব্যবস্থা করেন।

বঙ্গমাতা কখনো বিলাসিতা প্রশ্রয় দেননি। ছেলে-মেয়েদের সেই আদর্শেই গড়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আমলে মন্ত্রী ছিলেন। চা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি ছিলেন। কিন্তু বঙ্গমাতার মধ্যে বিত্ত-বিলাসিতার মোহ কখনো তৈরি হয়নি।

দেশে ও দলের জন্য বঙ্গমাতা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বঙ্গবন্ধু জেলে গেছেন আর বঙ্গমাতা সন্তানদের নিয়ে সংসার সামাল দিয়েছেন। আদর্শ মা হিসেবে সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়েও তিনি গভীর মনোযোগী ছিলেন। স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি গড়ে তোলেন সন্তানদের। সংসার-সন্তান নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে কোনো দিন ভাবতে হয়নি। তাই আমরণ তিনি দেশ ও জাতি নিয়ে ভাবতে পেরেছেন। এর ফলে আমরা পেয়েছি আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ।

বঙ্গমাতার চিন্তাচেতনায় সবার ওপরে স্থান ছিল আদর্শ ও মূল্যবোধের। তিনি ছিলেন চিরকালই প্রচারবিমুখ। আত্মকেন্দ্রিকতা কখনো স্পর্শ করতে পারেনি এই নির্লোভ মহীয়সী নারীকে। এ কারণে তাঁর সাহচর্যে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ হতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা একে অন্যের পরিপূরক।

বঙ্গবন্ধুর জীবনে তিনি ছিলেন বাতিঘর। জীবনের একটি বড় সময়ই কারাগারে কাটিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর অবর্তমানে একদিকে যেমন সংসারের দায়িত্ব পালন, অন্যদিকে মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করা, আন্দোলন পরিচালনা করাসহ প্রতিটি কাজে বঙ্গমাতা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব আমাদের সমাজের অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর মহত্ত্ব, ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও নির্ভীকতা বঙ্গবন্ধুকে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নে সব সময় সহায়তা করেছে। এই মহীয়সী নারীর জীবনী চর্চা করলে নতুন প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত হবে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন ও এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাসংগ্রামে তাঁরও কতটা অবদান ছিল।

লেখক : প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেসসচিব-১

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা