kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

ভিন্নমত

শেয়ারবাজারে বড় কম্পানি আনতে কার্যকর পদক্ষেপ চাই

আবু আহমেদ

৮ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শেয়ারবাজারে বড় কম্পানি আনতে কার্যকর পদক্ষেপ চাই

দেশের শেয়ারবাজারের দুরবস্থা কাটাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ভালো কম্পানি আনার জন্য দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। সাবেক ও বর্তমান অর্থমন্ত্রী যেসব উদ্যোগের কথা বলেছেন, যা করতে চেয়েছেন, তার কোনো ফল বাস্তবে আমরা দেখতে পাই না। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সব সময়ই নানা পদক্ষেপের কথা শোনায়; কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য যা করা দরকার তা দেখি না।

বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদন খাতের তিন ভাগের দুই ভাগ ভালো কম্পানি এখনো শেয়ারবাজারের বাইরে আছে। ওষুধ কম্পানিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বা তৃতীয় নম্বরে অবস্থান এমন কোনো কম্পানির সঙ্গে কেউ কি কোনো দিন বৈঠক করেছেন? আসি ইউনিলিভার প্রসঙ্গে। আরেক বহুজাতিক কম্পানি গ্ল্যাক্সোকে কিনে নিয়েছে অন্য একটি কম্পানি। এখন এই কম্পানি নাম বদল করে নতুন নামে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে। তবে যাদের অসংখ্য আইটেম, যাদের টার্নওভার হাজার হাজার কোটি টাকা, সেই মূল কম্পানি কিন্তু লিস্টেড হতে যাচ্ছে না। অথচ মূল প্রতিষ্ঠানটি ঠিকই মুম্বাই, করাচি, ব্যাংকক সব জায়গার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আসল বিষয়টা হলো গ্ল্যাক্সোর জায়গায় এখন নতুন প্রতিষ্ঠান অন্য নামে থাকবে। অনেকে ভাববে, হয়তো মূল কম্পানিই শেয়ারবাজারে লিস্টেড হয়ে গেছে। আমরা বীমা কম্পানি অ্যালিকোর দিকে তাকাই। দেশের মোট বীমার ৫০ শতাংশ তাদের অধীনে। অথচ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কেউ কোনো দিন কম্পানিকে বললেন না, আপনারা তালিকাভুক্ত হচ্ছেন না কেন। অথচ দুর্বল কতগুলো বীমা কম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার তোড়জোড় চলছে।

শেয়ারবাজারের শোচনীয় পরিস্থিতিতে গত ১৭ জানুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একটা নির্দেশনা জারি করা হয় যে দেশি ভালো কম্পানি ও বহুজাতিক কম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এর মধ্যেই ছয় মাস চলে গেছে। অথচ শেয়ারবাজার দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এমনকি দু-তিনটা বহুজাতিক কম্পানিও এ বছর ডিভিডেন্ড দেয়নি।

আমি শুধু নজর রাখতে বলব যে ভালো কম্পানির শেয়ারের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। মেট্রোপলিটন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট নিহাদ কবির সম্প্রতি বলেছেন, বিদেশিরা এসে তাঁদের বলেন যে তাঁরা বিনিয়োগ করার জন্য এখানকার সাত-আটটা কম্পানির বেশি যোগ্য কম্পানি পান না। অবশ্য স্থানীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি বলব, দেশে ১৫ থেকে ২০টি ভালো কম্পানি আছে, যেগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা যায়। বাদবাকিগুলোর অবস্থা ভালো নয়। তারা প্রতারণা করছে। গত পাঁচ বা ১০ বছরে যেসব কম্পানি আইপিওতে এসেছে, বলতে গেলে কেউ না কেউ হয় প্রডাকশন বন্ধ করেছে, নয়তো তাদের অফিসে তালামারা। আমি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে অনুরোধ করব, যারা প্রতারণা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা করা যায় কি না ভেবে দেখতে। লক্ষণীয় বিষয়, ভালো ১৫ থেকে ২০টি কম্পানির বাইরে আমরা যে বাদবাকি কম্পানিগুলোর টার্নওভার ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার মতো দেখে থাকি, এগুলোর প্রধান অংশ হচ্ছে জুয়া খেলা।

মাঝে এই কমিশনের আগে একটা প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয়েছিল এমালগেমেশন বা একত্রকরণের নামে। মানে তালিকাভুক্ত খারাপ কম্পানির সঙ্গে মার্জ করে প্রতারক উদ্যোক্তা লাখ লাখ শেয়ার নিয়ে যেতেন। পরে সেগুলো বিক্রি করে দিয়ে তাঁরা ধনী হয়েছেন। মাঝখানে পড়ে মারা গেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাঁরা বুঝতে পারেননি এই ট্র্যাপ বা ফাঁদ। এভাবে অনেক কিছু হয়েছে শেয়ারবাজারে। এ ছাড়া কম্পানিগুলোকে ভুল সার্টিফিকেশনও করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হচ্ছেন।

ব্যাংকিং খাতে তাকালে দেখা যাবে, আমরা পাঁচ বছর আগে উৎসাহ নিয়ে ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগ করতাম। আজ গুটিকয়েক ব্যাংক ছাড়া বাদবাকিগুলোর অবস্থা শোচনীয়। সাত-আট বছর, এমনকি চার-পাঁচ বছর আগেও আইসিবির হাতে যেসব মিউচুয়াল ফান্ড ছিল, সেগুলো অত্যন্ত ভালো মানের ছিল। তারা ৭০০ থেকে ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত ডিভিডেন্ড দিত প্রতি ইউনিটে। এখন সেগুলো লিকুইডেশনে দিয়ে ওপেন-এন্ড করে দিয়েছে। বাকিগুলো ছিল ক্লোজ-এন্ড। ওপেন-এন্ড করে দেওয়ার কারণে সেগুলো আর ট্রেডিং হয় না। বাদবাকি যাদের তথাকথিত মিউচুয়াল ফান্ড ম্যানেজার বলে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই টাকা-পয়সা লুট করেছে। এ বিষয়টার তদন্ত হওয়া উচিত যে মিউচুয়াল ফান্ড ম্যানেজার হয়ে যারা দু-তিন শ কোটি টাকা করে নিয়ে গেল, তারা ফান্ডগুলো কিভাবে ম্যানেজ করল? দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এর কোনো তাগাদা বর্তমান রেগুলেশনে নেই।

আমার প্রশ্ন, অনেক বহুজাতিক কম্পানি শেয়ারবাজারে ব্যাংককে লিস্টেড, পাকিস্তানে লিস্টেড, মুম্বাইয়ে লিস্টেড হলে বাংলাদেশে কেন নয়? আবার সরকারি কম্পানিগুলোরও ভালো শেয়ার আসছে না। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নির্দেশনা আসার পরও কাজ হচ্ছে না। আসলে আমাদের সামগ্রিক প্রচেষ্টা নিয়েই প্রশ্ন আছে। এবার যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, তাতেও শেয়ারবাজার ও পুঁজিবাজারের পক্ষে কিছু নেই। বরং উল্টোটা হয়েছে। নন-লিস্টেড কম্পানির আড়াই শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে নন-লিস্টেড ইউনিলিভারও সেই সুযোগটা নেবে।

গ্রামীণফোনের বিষয়টা এখানে আলোচনার দাবি রাখে। গ্রামীণফোন যখন ২০০৯ সালে শেয়ারবাজারে লিস্টেড হতে এলো তখন তারা ১০ শতাংশ করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স কম দিত নন-লিস্টেড কম্পানিগুলোর তুলনায়। অর্থাৎ নন-লিস্টেড সেলুলার কম্পানিগুলোর তুলনায় লিস্টেড গ্রামীণফোন তখন ১০ শতাংশ কম কর দিত। তিন-চার বছর যাওয়ার পর সেই সুবিধাটা ৫ শতাংশে নিয়ে আসা হলো। তাহলে ঠকল কারা? ঠকলেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সরকার গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো পাবে—এ নিয়ে টেলিফোন রেগুলেটরি কমিশন ও গ্রামীণফোনের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু ৪০ হাজারের বেশি সাধারণ বিনিয়োগকারী এই গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু তাঁরা জানেন না, কখন এটার সুরাহা হবে, কিভাবে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কি ভেবে দেখছেন, এই অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অবস্থা কী দাঁড়াচ্ছে? শুধু গ্রামীণফোনের মার্কেট ভ্যালু হারানোর কারণে পুরো আইসিবির ব্যালান্সশিট মাইনাসে চলে গেছে। কিন্তু সরকারের কোনো সামগ্রিক চিন্তা আমরা দেখি না যে বিষয়টা সুরাহা না হওয়ার কারণে অন্য দিক দিয়ে আমরা কত টাকা হারাচ্ছি।

সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশই করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স ২০ শতাংশের নিচে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশে এটা গড়ে ৩৫ শতাংশ। এবার করপোরেট ট্যাক্স কমানো হয়েছে নন-লিস্টেড কম্পানিগুলোর জন্য। কিন্তু কোন বিবেচনায় এটা করা হয়েছে, তা বোধগম্য নয়। উচিত ছিল লিস্টেড কম্পানিগুলোরও আড়াই শতাংশ কমানো। একসময় এক লাখ টাকা পর্যন্ত ডিভিডেন্ড ইনকাম করমুক্ত ছিল। সেটা উঠিয়ে দিয়ে ২৫ হাজার করা হলো। এখন করা হয়েছে ৫০ হাজার। আবার একটা ভালো কম্পানিও আনা গেল না। এর ওপর পদ্মা, মেঘনা, যমুনা—অয়েল কম্পানিগুলোর রিজার্ভ অর্থ সরকার নিজস্ব অ্যাকাউন্টে নিয়ে গেছে, যেগুলো লিস্টেড কম্পানি। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এগুলোতে বিনিয়োগ করেছেন। এখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখার মতো কেউ নেই। বিপরীতে প্রতারক উদ্যোক্তারা তাঁদের শেয়ার বিক্রি করেছেন। তাঁদের শেয়ারহোল্ডিং ২ শতাংশও নেই। মোট শেয়ারহোল্ডিং ২০ শতাংশের নিচে বহু কম্পানির। তারা কোনো ডিভিডেন্ড দেয় না, কাউকে পরোয়াও করে না।

ফিন্যানশিয়াল রিপোর্টিংয়ের অবস্থাও খারাপ। দু-তিনটা কম্পানিকে মানুষ কিছুটা বিশ্বাস করে। বাদবাকি যে ২০০ বা ৩০০ অডিট ফার্ম আছে, তারা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। এর মধ্যে অডিট কম্পানিগুলোকে জবাবদিহি করতে ফিন্যানশিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) করা হয়েছে। কিন্তু তারাও খুব একটা কাজ করতে পারছে না কিংবা করতে দেওয়াও হচ্ছে না।

মোট কথা, শেয়ারবাজারকে ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। আর সরকারের উদ্যোগ শুধুই কথার মধ্যে আটকে আছে। ১০ বছর ধরে একই কথা শোনা যাচ্ছে। অথচ জিডিপির শতাংশের তুলনায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এ অঞ্চলের মধ্যেই সর্বনিম্ন। পাকিস্তান, ভারত, নেপালসহ এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশের শেয়ারবাজার আমাদের চেয়ে উন্নত।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা