kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

দীর্ঘ দুর্ভোগের আরেকটি অধ্যায়

অ্যান্টন ইসা

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লেবানিজ হওয়ার অর্থই হচ্ছে দুর্ভাগ্যজনক এক জীবন। অসাধারণ আর বর্ণিল রাতের এই দেশ পর্যটকদের সাদরে আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু স্থানীয়দের জন্য এসব দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারেনি। সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর জীবন পার করে এমন একটি দেশকে দেখে, যে দেশের অবস্থা অনেকটাই ডুবতে থাকা শিশুর মতো। শিশুটি জান বাঁচাতে একটু বাতাস পাওয়ার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে চলেছে।

লেবাননের জনগণের দুর্ভোগের যে দীর্ঘ তালিকা তাতে আরেকটি অধ্যায় যুক্ত করল গত মঙ্গলবারের ভয়াবহ বিস্ফোরণ। এই তালিকার শুরু অস্পষ্টতা দিয়ে। ১৮৬০-এর দশকে লেবাননে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। নিহত হয় ১০ হাজার মানুষ। ওটাই কি দুর্ভাগ্যের সূচনা ছিল? নাকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন দুর্ভিক্ষ শুরু হয় তখন? সেবার মারা যায় দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। এর পর আসে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধ। এতে প্রায় দেড় লাখ লেবানিজ নিহত হয়, যাদের বেশির ভাগই আজও নিখোঁজের তালিকায়। গণকবরের নিচে শুয়ে আছে।

লেবানন একটি ছোট্ট পার্বত্য দেশ। উৎপাদন প্রায় নেই বললেই চলে। দুটি জিনিস লেবানন বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করেছে—ধ্বংস আর প্রবাসী। গত ১৬০ বছরে লেবাননে যে কয়টি প্রজন্ম জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে—প্রতিটি ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে। প্রতিটি নবজাতক এসেছে পুরনো ক্ষত নিয়ে। একই সময় মাতৃভূমির এই যন্ত্রণাময় বাস্তবতা ছেড়ে পালিয়ে গেছে বিপুলসংখ্যক লেবানিজ। লেবাননের জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। আর দেশটির প্রবাসীর সংখ্যা এক কোটি। লেবানন বিশ্বের সেই স্বল্পসংখ্যক দেশগুলোর অন্যতম, যাদের বেশির ভাগ নাগরিকই প্রবাসী।

এই প্রবাসীদের মধ্যে আমরাও আছি। এই প্রবণতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে। আমার বাবার বংশের একজন ভাগ্যের খোঁজে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। পরের শতাব্দীতে আমার বাবাও তাঁকে অনুসরণ করেন। তাঁর গন্তব্য ছিল অস্ট্রেলিয়া। আমার নানির জীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল গৃহযুদ্ধের সময়। ওই যুদ্ধে সাত সন্তান রেখে আমার নানা নিহত হন। অতল অন্ধকারে পড়া আমার নানি সন্তানসমেত দেশান্তরি হন।

লেবাননের সব পরিবারেই এমন গল্প রয়েছে। আমি বৈরুতে ফিরে এসেছিলাম ২০১১ সালে। থেকেছি ২০১৫ সাল পর্যন্ত। মা-বাবা ওই সময় আমাকে পাগল ভাবছিল। হতে পারে ওটা ছিল তারুণ্যের উন্মাদনা অথবা জেদ—লেবাননে বসবাস করা সম্ভব সেটা দেখিয়ে দেওয়া। যে অ্যাপার্টমেন্টে আমি থাকতাম এবারের বিস্ফোরণে সেটা ধসে গেছে। আমার প্রতিবেশীদের বাড়িগুলো এখন ভাঙা কংক্রিটের স্তূপ। বন্ধুরা গৃহহীন। বহু বছরের কাজ আর পুঁজি মিলিয়ে আমরা লেবাননকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের বাবা বা দাদারা যা পারেননি, তাই অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম আমি। চাইছিলাম, লেবানন একটি কার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হোক। কিন্তু এবারের বিস্ফোরণের পর যে ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে উঠেছে, সেগুলো আমাকে পূর্ব প্রজন্মের কাছে শোনা গৃহযুদ্ধের গল্পগুলোকেই আবার মনে করিয়ে দিল। কয়েক মিনিটেই যেন ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধের ক্ষত তৈরি হয়ে গেল বৈরুতের। কংক্রিটের নিচ থেকে টেনে বের করা ধূলিধূসর লাশগুলো দেখছিলাম। পথে পথে লাশ ছড়িয়ে পড়ে আছে। এই দুর্ভোগের শেষ নেই।

শত বছর আগে মহাদুর্ভিক্ষের পর এখন লেবাননের অর্থনীতি সবচেয়ে বাজে অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বের তৃতীয় ঋণগ্রস্ত জাতি এটি। দেশের অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্য বা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে।

মুদ্রার দরপতনের কারণে বহু লেবানিজের পক্ষে মৌলিক খাদ্যের ব্যবস্থা করাও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবাননের মৌলিক খাদ্য চাহিদার বেশির ভাগই অন্য দেশ থেকে কিনে আনতে হয়। এর বেশির ভাগই হয় বৈরুত বন্দরের মাধ্যমে। যে বন্দর মঙ্গলবারের পরমাণু বোমার মতো বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু খাদ্যগুদাম ছিল বন্দরের আশপাশের এলাকাগুলোতে। সেগুলোও ধসে পড়ে লেবানিজদের দুর্ভিক্ষের কিনারায় ঠেলে দিয়ে। হাজারো বাড়িঘর ধুলার সঙ্গে মিশে গেছে।

জানি না এই ক্ষতি লেবানন কী করে কাটিয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নেওয়ার আলোচনা গত কয়েক মাস থেকেই স্থবির হয়ে আছে। আইএমএফ কিছু সংস্কারের জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে। যে সংস্কারে সরকার আগ্রহী নয়। সে ক্ষেত্রে এবারের বিস্ফোরণের পর আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হবে লেবাননকে।

বিস্ফোরণের আগে থেকেই লেবানিজরা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিক্ষুব্ধ ছিল। সরকারে তাদের আস্থা নেই। বিস্ফোরণের তদন্ত সরকার স্বচ্ছভাবে করতে পারবে বলেও মনে করে না তারা। দুই হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট অরক্ষিত অবস্থায় বন্দরের গুদামে পড়ে থাকার জন্য যে অবহেলা দায়ী, সেই অবহেলার কারণেই দেশের বিদ্যুৎ, পানি সংকট দেখা দিয়েছে। আর আমাদের মতো যারা প্রবাসী, তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের অব্যবস্থাপনায় চোখের পানি ফেলছি। এই যন্ত্রণার কোনো শেষ নেই।

লেখক : রাজনৈতিক কলামিস্ট

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা