kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

স্বাস্থ্যের নতুন ডিজি ও আমাদের প্রত্যাশা

ড. মো. সহিদুজ্জামান

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্বাস্থ্যের নতুন ডিজি ও আমাদের প্রত্যাশা

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেলেন এ বি এম খুরশীদ আলম।

মিডিয়া মারফত জানা যায়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ও প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজনদের মাধ্যমে খবর ছিল, এ বি এম খুরশীদ আলম একজন অত্যন্ত সৎ, নির্লোভ এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর তাঁর ব্যাপক দখল রয়েছে। ঢামেকে সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বর্তমানে তিনি বিসিপিএসের অনারারি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সার্জন হিসেবে তাঁর হাতের যশ সর্বমহলে প্রশংসিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ওপরই আস্থা রাখতে মহাপরিচালকের গুরুদায়িত্ব তাঁকে দিতে নির্দেশনা দেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তিনি যোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে এই গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন। এটি সত্য, যাঁরা পেশায় ভালো করেন, তাঁরা অবশ্যই পেশাকে ভালোবাসেন। এমন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা পেশার উন্নয়নের স্বার্থে কোনো কারণে কাজ করতে না পারলেও ক্ষতি হয়তো বা করবেন না এমন প্রত্যাশা করা যায়।

এসব পদের জন্য যাঁরা নানা রকম তদবির, সুপারিশ, নেটওয়ার্ক, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে এগিয়ে থাকেন তাঁদের কথা প্রায়ই শোনা যায়। তাঁরা পেশাজীবী রাজনৈতিক সংগঠনে যে সময় ও শ্রম দেন তার বিনিময়ে এসব পদ-পদবির আশা করে থাকেন। আবার তাঁদের ধারণা যে তাঁরা প্রশাসক হিসেবে অধিকতর যোগ্য এবং পারদর্শিতায় পাহাড় সমতুল্য। পেশার সাধারণ ও কর্মঠ বা ভালো মানের ব্যক্তিদের কোনো মূল্যায়ন তাদের কাছে থাকে না। কিন্তু এটি তো হওয়ার কথা নয়। যাঁরা পেশার মর্যাদা, উন্নয়ন ও উৎকর্ষে যাঁরা কাজ করেন তাঁরাই প্রকৃত নেতা হওয়ার কথা, তাঁরাই অধিকতর যোগ্য।

আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কখনোই নিজেদের পদ-পদবির জন্য তদবির করবেন না বা অতি উৎসাহী হবেন না। যাঁদের জন্য সুপারিশ আসে, যাঁদের ফাইল অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে হঠাৎ করে নিচ থেকে দ্রুত ওপরে ওঠে, তাঁদের ক্ষেত্রে অতি সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অতি উৎসাহী, তদবির ও সুপারিশে বিশ্বাসী এবং অতি রাজনৈতিক ব্যক্তির নেতৃত্ব দিয়ে কোনো একটি সেক্টরের পেশাগত উন্নয়ন কতটুকু হয় তা আমরা এত দিনে উপলব্ধি করতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রীও হয়তো বা সেটি উপলব্ধি করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আমাদের দেশে দেখা যায়, একজন দায়িত্ব নিতে না নিতেই একটি সুবিধাবাদী দল এসব মহাদায়িত্বপ্রাপ্তদের ঘিরে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে উঠেপড়ে লাগে। অন্যদিকে ওই পদে আসীন হওয়ার প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়া গ্রুপটি তাঁর পেছনে লেগে যেতে বা ঝামেলা পাকাতে শুরু করে। ব্যক্তি ভালো মনের হলে দুষ্টচক্রে পড়ে অপদস্থ ও হেনস্তা হতে হয়। কখনো কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে পদ ছেড়ে দিতে হয়। এই বিষয়গুলো আমাদের দেশের একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

আবার কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠী দেখভালের অন্তরালে নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্যে লিপ্ত থাকে। ক্ষমতাসীনদের অনুগত না হলে বা সুপারিশ না মানলে তাঁকে সরানোর হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ফন্দিফিকির করা, কখনো কখনো ফাঁদে ফেলে হেনস্তা করা বা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এসব সামলাতে সামলাতে আর নিজের চেয়ারটা ঠিক রাখতে সময় গড়িয়ে যায়, আর উন্নয়নের চিন্তা করাটা বা কোনো উদ্যোগ নেওয়াটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। দায়িত্ব বা পদ ছেড়ে দেওয়াটার বিষয়টি ব্যর্থতার সংস্কৃতি হওয়ায় অনেকে স্রোতের অনুকূলে গা ভাসান। আবার অনেকে কোনোভাবে টেনিউর বা চুক্তির সময়কাল ক্ষেপণ করে থাকেন।

 দেশের কমবেশি প্রতিটি সেক্টরে একই সমস্যা আছে বলে ধারণা করা যায়। পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পেশার সার্বিক মানোন্নয়নের পরিবর্তে বিভিন্ন পদ-পদবি পাওয়ার আশায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। পেশাজীবী এসব সংগঠনকে জাতীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করা, বিশেষ করে সরকারদলীয় সংগঠনগুলোকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। এসব সংগঠন আদর্শ ও নীতির কথা বলে ব্যক্তিস্বার্থকে চরিতার্থ করতে তৎপর। পেশাগত দায়িত্ব ফেলে পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধার খোঁজে ব্যস্ত সময় কাটান। তাঁদের দলীয় কার্যক্রম জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব না ফেললেও পেশাগত উন্নয়নের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেখা যায়, গুটিকয়েক ব্যক্তির কারণে পুরো সেক্টর জিম্মি হয়ে যায়। ব্যাহত হয় সেবা ও উন্নয়ন, বঞ্চিত হয় পেশায় পারদর্শীরা। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেলে এসব পেশাজীবী সংগঠনে অসৎ ও অযোগ্য ব্যক্তির আগমন ও অনুপ্রবেশ কমে যাবে। তৈরি হবে যোগ্য নেতৃত্ব এবং সঠিক ব্যক্তির সঠিক জায়গায় পদায়িত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

শুধু ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তনের ফলে কোনো খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির আমূল পরিবর্তন আসবে না। কাজের পরিবেশ ভালো না থাকলে, সিস্টেমে সমস্যা থাকলে এবং আশপাশের সহকর্মীরা ভালো না হলে ভালো মানুষ দিয়ে অনেক সময় ভালো কাজ করানো কঠিন হয়ে পড়ে। এটি নিঃসন্দেহে একটি টিমওয়ার্ক। টিমে যদি দুষ্ট লোকের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তাহলে ওই কর্তাব্যক্তির অনেক সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো উদ্যোগ নিতে গেলে হোঁচট খাওয়া বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। চেষ্টা করতে করতে ব্যর্থ হয়ে একসময় স্থবির হয়ে যায়। তখন রুটিন কাজ করে সময় পার করা বা কালক্ষেপণ করাটাই তার জন্য একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়।

এমন কিছু অধিদপ্তর আছে, যেখানে অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের মন্ত্রণালয়ে ফাইলের পেছনে ছুটতে হয়, প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে পড়ে থাকতে হয় মন্ত্রণালয়ে। এতে দপ্তরের কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে, ব্যাহত হয় উন্নয়ন।

বিদ্যমান প্রতিকূলতায় কাজের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা অবশ্যই চ্যালেঞ্জের। এ জন্য প্রয়োজনে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হতে পারে, যা অত্যন্ত কঠিন কাজ। স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ও যুগোপযুগী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যদি কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন হয়, সেখানেও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তবে সরকারের সদিচ্ছা থাকায় এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে অনেক কিছু অসম্ভব হচ্ছে না বলে প্রতীয়মান।

 কোনো একটি সেক্টরের উন্নয়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টেকসই পদক্ষেপ (স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি) গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কাজ করা উচিত। এককথায় উন্নত বিশ্ব যেভাবে, যে প্রক্রিয়ায় তাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ঘটিয়েছে তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়াটাই উত্তম।

একটি বিশেষায়িত দপ্তরের বিশেষায়িত কর্তারাই মাঠপর্যায় থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হন। তাঁরা তাঁদের পেশার সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা থেকে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রয়োজনে পেশার অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। গৃহীত সিদ্ধান্ত যাতে সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করা যায় সে জন্য অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তি ও সরকারের মধ্যে যাতে দূরত্ব না থাকে সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

সময় এসেছে সিস্টেমের পরিবর্তন আনার। সময় এসেছে সরকার তার বিশ্বস্ত সূত্র দিয়ে এসব সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকেও খুঁজে বের করে তালিকা করার এবং তাঁদের সঠিক জায়গায় পদায়ন করার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এবং নতুন মহাপরিচালকের যোগ্য নেতৃত্বে স্বাস্থ্য খাত সেবার মান নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে এই প্রত্যাশা সবার।

 

 লেখক : গবেষক ও অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা