kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

গ্রামীণ অর্থনীতি আরো গতিশীল করা সময়ের দাবি

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

৭ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



গ্রামীণ অর্থনীতি আরো গতিশীল করা সময়ের দাবি

দেশে এখন চলছে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব। এর আগে থেকেই দেশে কতগুলো সমস্যা চলে আসছে। যেমন দারিদ্র্য বিমোচনটা ধীরগতিতে হয়েছে, কর্মসংস্থান কম হয়েছে, উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল দরিদ্র মানুষগুলোর না পাওয়া ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে গ্রামের লোকজনই বেশি বঞ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে বেকার মানুষের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের সময় এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতি বা গ্রামীণ খাতটাকে আরো গতিশীল ও সম্প্রসারণ করে সেখানে কর্মসংস্থান বা আয়সংস্থান আরো বাড়ানো। গ্রামীণ অর্থনীতি বলতে শস্য উৎপাদন ছাড়াও মৎস্য, পশুপালন, পোল্ট্রি, সবজি চাষ, ফুল চাষ, আরবরি কালচারকে বোঝায়। আমাদের অর্থনীতিতে এগুলোর অবদান অনেক বেশি। জিডিপিতে এর অবদান ১৮-১৯ শতাংশ হবে। কিন্তু আমার মনে হয়, এ হিসাবে গ্রামীণ খাতের অবদানকে ছোট করে দেখা হয়। সব কিছু মিলিয়ে এসব খাতে মানুষের জড়িত থাকার অবদান জিডিপির ৫০ বা ৫৫ শতাংশ হবে। আর জিডিপিতে তাদের অবদান যা-ই হোক, বিপুল কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস হিসেবে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরাট অবদান রয়েছে। এখন দরকার এটাকে গতিশীল করা।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এখন শহর থেকে অনেক মানুষ গ্রামে চলে যাচ্ছে। ন্যূনতম আশ্রয়টা পাওয়া যাবে—এই চিন্তায় তারা গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। মূলত স্বল্প আয়ের মানুষই চলে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই গ্রাম তথা গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বটা আবারও সামনে এসেছে। বিআইডিএসের সমীক্ষা বলছে, করোনার কারণে ১৩ শতাংশ লোক নতুন করে দরিদ্র হয়ে গেছে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে লোকজন ফেরত আসছে। তাদের অনেকেই ফেরত যেতে পারবে না। দেশে রয়েছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকার। করোনাকালে তাদের জীবিকা নির্বাহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে গেছে। সরকারের সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। সেখানে আবার নানা রকম লিকেজ হচ্ছে, দুর্নীতি হচ্ছে। আবার এই সহায়তা দীর্ঘস্থায়ীও করা যাবে না। অতএব গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করাই বেশি জরুরি।

গ্রামের প্রতি মনোযোগ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে আমাদের কাজটা শুরু করতে হবে। শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও মনোযোগ দিতে হবে। কৃষিপণ্যের বিপণনে জোর দিতে হবে। আমরা দেখে আসছি, দেশে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খুব কম হয়। তারা শস্য বিক্রি করতে না পারলে ফেলে দেয়। অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীরা ক্রয় করতে চায় না। দেশীয় ফলের দিকে তাকালে দেখতে পাই, সারা বছর আম পাওয়া যায় নাা। লিচুও সারা বছর পাই না। এগুলো মৌসুমি ফল এবং মৌসুমেই খাব। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করে রাখলে অন্য সময়ও পাওয়া যেত। থাইল্যান্ডে যেমন আম, জাম, লিচু সব ফলই প্রক্রিয়াজাত অবস্থায় পাওয়া যায়। ক্যান বা প্যাকেটে করে তারা বিক্রি করে। রপ্তানিও করে। আমাদের গ্রামেও এই প্রক্রিয়া চালু করা দরকার।

আমাদের গ্রামগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। আমরা যদি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারি, তখন শুধু কৃষি নয়, আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজও হবে। গ্রামে ছোট ছোট কুটির শিল্প বা সেবা খাত রয়েছে। রূপান্তরের ফলে গ্রামে লন্ড্রি দরকার, সেলুন দরকার। গ্রামে এখন অনেক বিউটি পার্লারও চালু হয়েছে; এমনকি ছোটখাটো জিমনেসিয়ামও গড়ে উঠছে। গ্রামের বাজারগুলোতে রেস্টুরেন্টের প্রয়োজন হচ্ছে। আমি চাইছি, ব্যাপক আকারে না হলেও এসব শহুরে সুযোগ-সুবিধা গ্রামে থাকলে গ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। সবচেয়ে বড় কথা, আত্মকর্মসংস্থান বাড়বে। উদ্যোক্তা গড়ে তোলা যাবে।

আবার গ্রামে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত না করলে গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল করা কঠিন হবে। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা যদি শিক্ষা না পায়, শুধু বড় বড় শহরে সব পাওয়া যায়—এই পরিস্থিতি বিরাজ করলে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উৎসাহিত হবে না। আমাদের এখানে নগরায়ণ হয়েছে; কিন্তু বিদেশের তুলনায় আদর্শ নগরায়ণ ঘটেনি। আমাদের নগরায়ণ বিশ্বে শীর্ষে; কিন্তু নাগরিক সেবায় বিশ্বে পিছিয়ে। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ অর্থনীত চাঙ্গা করতে পারলে নগরের ওপরও চাপ কমবে।

গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে হলে শুধু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান যথেষ্ট হবে না। গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল করার জন্য প্রথমেই দরকার হবে শাসনব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ। স্থানীয় সরকার স্তরগুলো—ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও জেলা পরিষদকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে। গ্রোথ সেন্টারগুলো হবে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও জেলা পরিষদ। আমাদের সংবিধানে আছে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হবে। কিন্তু কোনো সরকারই স্থানীয় সরকারকে বিকেন্দ্রীকরণ করেনি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বাজেটে বরাদ্দের প্রশ্ন এলে বলা হয়, স্থানীয় সরকারে দুর্নীতি হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্নীতি ও অপচয় কি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে হচ্ছে না? সঠিক মনিটরিং হলে সব পর্যায়েই দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করা সম্ভব। যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে যে স্থানীয় সরকার দায়িত্ব পেয়েছে, কারিগরি ও অর্থ সহায়তা পাচ্ছে, তখন তারা আরো যত্নসহকারে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়বে। তখন লোকজনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও থাকবে।

দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনটা হলো অর্থায়ন। আমাদের ব্যাংকগুলো গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় শাখা খুললেও তারা মূলত এসব শাখা খোলে অর্থের উৎস হিসেবে। তারা গ্রাম থেকে টাকা নিয়ে এসে শহরে বিনিয়োগ করে। গ্রামের মানুষ গ্রামে যতটুকু সঞ্চয় করে, সেই টাকাটা ওখানে আর থাকে না। সেখানকার কোনো কাজে লাগে না। এটাকে ট্রান্সফার অব রিসোর্সেস বলে, যেটা আমরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদের স্থানান্তর হতে দেখেছি।

তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, যাতায়াত ও বাজার সুবিধা বৃদ্ধি। আমরা গ্রামের ওপর দিয়ে বড় বড় রাস্তাঘাট করছি, ফিডার রোড করছি। কিন্তু অনেক রাস্তাঘাট হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকমতো হচ্ছে না। গ্রামীণ বাজারগুলোর উন্নয়নও জরুরি।

ঐতিহাসিক বিবেচনায় দেখব, আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি দারিদ্র্য বিমোচনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ না হলে আমাদের বিরাট সমস্যা হয়ে যেত। মৎস্য উৎপাদন, পোল্ট্রি ও গবাদি পশু পালনে যদি আমরা উন্নতি করতে না পারতাম, তাহলে তো বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য সংস্থান খুবই কঠিন হতো। সাড়ে সাত কোটি থেকে মানুষ ১৬ কোটি হয়ে গেল, এর পরও খাদ্যে সমস্যা হয়নি। আমি মনে করি, এর বড় অবদান গ্রামীণ অর্থনীতির। এ ক্ষেত্রে আমি সবচেয়ে প্রশংসা করি বা বাহবা দিই আমাদের কৃষি প্রযুক্তিবিদ, কৃষি গবেষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের। তাঁদের অবদান কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যাবে না। ভবিষ্যতেও তাঁদের সব ধরনের উৎসাহ, প্রণোদনা দিয়ে কাজে লাগাতে হবে।

আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির ইতিবাচক রূপান্তরের সময় এখন। গার্মেন্টশিল্প প্রবৃদ্ধিতে বেশি অবদান রাখছে বলে আমরা অনেক কথা বলি। এখন আমাদের ভারসাম্য বা সুষম উন্নয়নের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। এ জন্য আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নও দরকার, যেটার প্রয়োজন আমরা স্বাস্থ্য খাতের জন্য অনুভব করছি। আমাদের কৃষি খাতেও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠান এবং তাদের কার্যক্রমের প্রক্রিয়াগুলো যদি সুষ্ঠু ও দক্ষ না হয়, তাহলে যেকোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন করা দুরূহ হবে। এটা আমরা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের মন্থরগতির মধ্যে।

গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য আরেকটি বিষয় হচ্ছে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষের ওপর নজর দেওয়া। যে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী রয়েছে, তা আরো ব্যাপক করা। এখন বয়স্ক ভাতাসহ যেসব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, এগুলো যথেষ্ট নয়। সামাজিক সুরক্ষা মানে গ্রামে বাসকারী মানুষের আয়েরও ব্যবস্থা করতে হবে, অর্থের সংস্থান করতে হবে। প্রয়োজন হলে ঋণ দিতে হবে। লোকজনের স্বাস্থ্যের সমস্যা হলে কিভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে বা উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায়, সেটা করতে হবে।

আরো চারটি বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়ার দরকার আছে। প্রথমটি হচ্ছে, আমাদের সার্বিক উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে যুক্ত করতে হবে। বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি নিয়ে গ্রামের উন্নয়ন হবে না। নির্দিষ্ট কিছু গ্রাম, তথাকথিত জেলা বাজেট দিয়ে চলবে না। সামগ্রিক নীতি ও পরিস্থিতির সঙ্গে এটাকে খাপ খাওয়াতে হবে। দ্বিতীয় হলো, গ্রামের অথনৈতিক উন্নতির জন্য লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কর্মসূচি নিতে হবে। কতসংখ্যক মানুষের আত্মকর্মসংস্থান হবে, কতজনের কর্মসংস্থান হবে ইত্যাদি। তৃতীয়ত, গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য প্রধান অংশীদারগুলো তথা সরকার, বেসরকারি খাত, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা। চতুর্থত, বিষয়টা হচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিকে গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা