kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

করোনাকালীন শিক্ষা : উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা

মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনাকালীন শিক্ষা : উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা

কভিড-১৯ সারা বিশ্বের মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। মানুষের জীবনযাত্রাকে পাল্টে দিয়েছে অনেকখানি। দৈনন্দিন জীবনাচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক, চলাফেরা, সৌজন্য—সব কিছুতেই পরিবর্তন লক্ষণীয়। প্রতিষ্ঠিত কবিরা করোনাকে নিয়ে কবিতা লিখছেন, আবার করোনা নতুন কবি, নতুন ছড়াকার তৈরি করছে। করোনা আক্রান্তদের সেরে ওঠার ঘটনাবলিও নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করছে। করোনাকালে প্রেম-ভালোবাসা-আবেগ-অনুভূতিরও ধরন পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে গোটা পৃথিবীর শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলাদেশে ১৬ মার্চের পর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। চার থেকে ২৩ বছর বয়সের শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণীরাই প্রধানত মূল শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত (শিশু শ্রেণি থেকে স্নাতকোত্তর)। এই বয়সের শিক্ষার্থীরা যাতে করোনায় আক্রান্ত না হয় সে জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সর্বাত্মকভাবেই বন্ধ রয়েছে। কারণ আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর বা প্রজন্মকে হারাতে চাই না। সাধারণভাবে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীরা ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করে। শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ—সর্বত্রই শিক্ষার্থীরা পারস্পরিকভাবে ঘনিষ্ঠ থাকে। ফলে একজন করোনায় আক্রান্ত হলে আর রক্ষা নেই। ফলে রাষ্ট্রের সব দপ্তর খুলে গেলেও এই মুহূর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে না। প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কাজকর্ম সীমিতভাবে চললেও শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনার জন্য আরো সময় নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একসময় সেশনজট নামে একটি শব্দ চালু ছিল। তিন বছরের অনার্স কোর্স শেষ করতে সময় লাগত ছয় বছর। গত ১৩-১৪ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই অবস্থা সম্পূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠেছে। বর্তমানকালের শিক্ষার্থীরা যেহেতু ওই সময়কে দেখেনি, সেশনজটের অভিজ্ঞতাও যেহেতু তাদের নেই; তাই করোনাকালে তাদের পিছিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। কারণ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করতে না পারলে চাকরির প্রতিযোগিতায় তারা অবতীর্ণ হতে পারবে না। শিক্ষার্থীদের পরিবার সব সময় অপেক্ষা করে তাদের সন্তান কখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে। শুধু পরিবারকে তাদের সন্তানরা দেখভাল করবে সে আশায় তারা উদ্বিগ্ন হয় তা নয়, বরং তার সন্তান যেন নিজের পায়ে দাঁড়ায়—এটি পরিবার দেখতে চায়। কিন্তু বর্তমানে এমন একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা বিচরণ করছি যে কখন এই পরিস্থিতির অবসান ঘটবে কেউ তা জানে না।

করোনাকালীন সেশনজট যেন কম হয়, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত চলে যাওয়া সময় থেকে কিছুটা যদি ধরে রাখা যায়, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ইউজিসি ও সরকার নানামুখী চিন্তা-ভাবনা করেছ এবং বিভিন্ন রকম উদ্যোগও নিচ্ছে। এই উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় অনলাইনে ক্লাস গ্রহণ। এই বিষয়টিকে দুইভাবে ভাগ করে দেখতে হবে। অনলাইন ক্লাসের উদ্যোগটি প্রথম নেওয়া হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকে। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে তিনটি টার্ম বা সেমিস্টার চালু আছে। একটি সেমিস্টার শেষ না হলে পরে যেহেতু ভর্তি করা যাবে না, তাই তারা অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষাও গ্রহণ করছে। এমনকি টিভি স্ক্রলে দেখা যাচ্ছে যে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রমও শুরু করছে। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হলেও পরীক্ষা নেওয়ার জন্য এখনো তারা প্রস্তুত নয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি নিলেও শিক্ষার্থীদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু বিষয় আছে, যা অবশ্যই হাতে-কলমে শিখতে হয়। হয়তো একসময়ে এই ব্যবস্থাও অনলাইনে হয়ে যাবে। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব নয়। আমরা এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে অনলাইনে পরীক্ষামূলক ক্লাস নিচ্ছি। প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী এখানে অংশগ্রহণ করতে পারে না। কারণ কারো কারো স্মার্টফোন নেই, কারো এলাকায় ইন্টারনেট বা বিদ্যুৎ সুবিধা নেই, কারো বা নেট ক্রয়ের সামর্থ্য নেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের জোগান দেয় রাষ্ট্র; তাই শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো মাথায় রেখেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব সমস্যার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও কেন আমরা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছি—এমন একটা প্রশ্ন অনেকেই উত্থাপন করছেন। প্রথমত, আমাদের ভাবনা হলো, কভিডের কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব বাসা বা গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছে। প্রকৃতপক্ষে তারা হাঁপিয়ে উঠেছে। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। সে জন্য তাদের আমাদের সঙ্গে যুক্ত রাখা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনে সবচেয়ে বেশি আনন্দে থাকে ক্যাম্পাসে। এ জন্য ছুটিতেও তাদের বাড়ি যেতে ইচ্ছা করে না। বিষয়টি আমরা অনুধাবন করি বলেই এই ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ।

আমরা এরই মধ্যে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বিনা সুদে পাঁচ হাজার টাকা শিক্ষাঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। প্রতিটি ডিসিপ্লিনের ১৪ জন শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে। অনেকে আবার প্রশ্ন করেন, ঋণ কেন, অনুদান হতে পারত। আমরা মনে করি, আমাদের শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিত্ববান হয়ে গড়ে উঠবে। কারো কাছে নতজানু হয়ে সহায়তা চাইবে না। তারা শিক্ষাজীবনের যেকোনো সময়ে এই ঋণ পরিশোধ করবে। এ ছাড়া যখন আনুষ্ঠানিকভাবে কোর্স রেজিস্ট্রেশন হবে তখন কল্যাণ তহবিল থেকে আমরা অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের কিছু সহায়তার উদ্যোগ নেব। আর রাষ্ট্রীয় অর্থ বিলিয়ে দেওয়ার অধিকার বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকার দেয়নি। এ জন্য অন্য কোনো চিন্তা করা সম্ভব হয়নি। আমাদের এত যে ভাবনা বা উদ্যোগ এ নিয়েও অনেকের সমালোচনা আছে। বলা হচ্ছে দু-তিন বছরে যদি কভিড না যায়, তাহলে কী হবে। এ বিষয়ে সরকার ভাবছে। তার পরও আমরা তাত্ত্বিক ক্লাস গ্রহণ অব্যাহত রাখতে চাই। পরীক্ষার ভাবনা পরে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরীক্ষা শুরু হবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি টার্মে ১৩ সপ্তাহ ক্লাস নিতে হয়। এই ১৩ সপ্তাহের মধ্যে যদি আট সপ্তাহ আমরা অনলাইনে ক্লাস নিতে পারি, তাহলে রিভিউ ক্লাস নিয়ে কোর্সগুলো শেষ করা যাবে। এতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে যতটুকু সময় ধরে রাখা যায় ততটুকুই লাভ। একেকজনের চার বা পাঁচ মাস সময়ও যদি বাঁচে, তা কম নয়। যেসব শিক্ষার্থী সরাসরি অনলাইনে আসতে পারছে না তাদের ই-মেইলে লেকচারগুলোর তথ্য দিয়ে দেওয়া হবে। আবার প্রতিটি শিক্ষা ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ফেসবুক গ্রুপ আছে, এর মাধ্যমেও তাদের ক্লাসের বিষয়গুলো আদান-প্রদান হবে। এ ছাড়া শিক্ষকরা তাঁদের লেকচারশিট তাঁদের ডিসিপ্লিনের ওয়েবসাইটে নিজ নিজ লিংকে রেখে দেবেন। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা সুবিধামতো সময়ে এই তথ্যগুলো নিয়ে নেবে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে সম্মানিত শিক্ষকদের নিয়ে একটা কর্মশালার আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া প্রতিটি ডিসিপ্লিনের প্রাথমিকভাবে একটা করে ক্লাসরুমকে অনলাইন ক্লাসরুমের উপযোগী করা হবে। যেসব শিক্ষক ক্লাসরুমে অনলাইনে ক্লাস নিতে চান, তাঁদের জন্য এই ব্যবস্থা। অনেক সম্মানিত শিক্ষক তাঁদের প্রণোদনার কথাও বলেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এই উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারব। এ ছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। বহু দেশের সরকার এরই মধ্যে তাদের দপ্তরগুলোর জনবল হ্রাস করেছে অথবা বেতন কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সরকারি সেক্টরে এ ঘটনা ঘটেনি। তাই শিক্ষার্থীদের পেছনে কিছু খরচ করলে তা রাষ্ট্রের সেবা করা হবে ভাবলে প্রশান্তি লাভ করা যাবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের আশরাফুল মাখলুকাত। তাদের জন্য যে ব্যয় হবে তা বড় ধরনের বিনিয়োগ বলে গণ্য করা যেতে পারে। আর রাষ্ট্র যদি শিক্ষকদের ইন্টারনেট সুবিধা দেয়, তাহলে তো আর কোনো জিজ্ঞাসা থাকবে না।

আমাদের এই যে প্রয়াস বা উদ্যোগ, সবই শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে কিছু সময় বাঁচানোর চেষ্টা মাত্র। এই ক্লাসগুলোই যে চূড়ান্ত তা নয়। আমরা সবেমাত্র অনলাইন যুগে প্রবেশ করছি। নানা সীমাবদ্ধতা আছে। এগুলো ধীরে ধীরে অতিক্রম করা যাবে। আমাদের হয়তো অনলাইন পরীক্ষা নেওয়ার কথাও ভাবতে হবে। এ জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন। করোনাভাইরাস পৃথিবীর অনেক কিছু ধ্বংস করছে; কিন্তু কিছু সৃষ্টিশীল কাজেও এর মধ্যে মানুষ আত্মনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অনলাইন বা ডিজিটাল সংস্কৃতি। করোনা আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, তা হলো এই অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে এই বিপ্লবের ফলাফল সুদূরপ্রসারী হবে।

লেখক : উপাচার্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা