kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

একাত্তরের রক্তে লেখা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)   

৫ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



একাত্তরের রক্তে লেখা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জায়গাটি এখন আর মোটেই ঠুনকো অবস্থানে নেই। এ রকম সম্পর্কের ঐতিহাসিক লিগ্যাসির দ্বিতীয় উদাহরণ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। ভিয়েতনামের স্বাধীনতাযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধে ফ্রান্স সব ধরনের সহযোগিতা ও সমর্থন দিলেও প্রকাশ্যে ঘোষণার মাধ্যমে নিজস্ব সেনাবাহিনী পাঠিয়ে যুদ্ধে নামেনি, যেটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত করেছে। সুতরাং কোনো দেশের একটি টেলিফোন অথবা কারো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপচেষ্টা এবং তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। আজ অন্তত এ কথা বলা যায়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, ১৯৭৫ সালের পর এই সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল, যেটি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল ২০০১-০৬ মেয়াদে। কী কারণে এ রকমটি হয়েছিল, তা এখন সবাই জানেন। কিন্তু গত ১০-১১ বছরে দুই দেশের সম্পর্ক যে উচ্চতায় উঠেছে সেটি এখন বিশ্ব অঙ্গনে প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর সম্পর্কের একটি উদাহরণ। এটি সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টি এবং ভারতের সব রাজনৈতিক দল ও জনগণের বাস্তব উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে স্থলসীমান্ত চিহ্নিতকরণ ও ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ২০১৫ সালে ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের সম্মিলিত অধিবেশনে পাস হওয়ার সময়; যেখানে একজন সদস্যও প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেননি, শতভাগ হ্যাঁ ভোট পড়ে। নজিরবিহীন ঘটনা। ওড়িশা রাজ্যের একজন অবাঙালি সদস্য সেদিন প্রস্তাবের পক্ষে বক্তৃতার সময় বাংলায় গেয়েছিলেন সেই গানটি, ‘শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের...।’ দুই দেশের রাজনৈতিক নেতা, জনগণ, বিশ্লেষক—সবাই এখন উপলব্ধি করেন ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক লিগ্যাসির সূত্রে উভয়েরই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং উন্নয়নের জন্য একের সঙ্গে অপরের সহযোগিতা একান্ত অপরিহার্য। এর কোনো বিকল্প নেই এবং এটি কোনো একতরফা বিষয় নয়।

লেখার শুরুতেই এক নিঃশ্বাসে এত কথা বলে ফেললাম। কারণ গত ২২ জুলাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কর্তৃক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনাকে ফোন এবং দুই প্রধানমন্ত্রীর কথা বলা নিয়ে একটি ধূম্রজাল ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে, যা এই করোনার দুঃসময়ে মোটেই কাম্য নয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করেছেন এবং সৌজন্যের খাতিরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন। বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু গোল বাধিয়েছে পাকিস্তানের মিডিয়া, তার সঙ্গে ভারতের কিছু মিডিয়া এবং বাংলাদেশের কেউ কেউ এর সঙ্গে আরো কিছু জোড়া লাগিয়ে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা প্রথমে পাকিস্তানের মিডিয়া শুরু করেছে, বিশেষ করে ২৬ জুলাই করাচির ডন পত্রিকার বিশাল প্রতিবেদন ও তার শিরোনাম পড়ে আমার সেটিই মনে হয়েছে। ডন পত্রিকা শিরোনাম করেছে, বাংলাদেশ চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। এর থেকে কাল্পনিক, অবাস্তব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথা আর হতে পারে না। পাকিস্তান ভুলে যাওয়ার ভান করলেও বাংলাদেশের মানুষ কিছুই ভোলেনি। পাকিস্তানের সঙ্গে এখন বাংলাদেশের ওয়ার্কিং রিলেশন আছে, যেমনটি রয়েছে ভারতের সঙ্গেও। ঝুঁকে পড়ার তো প্রশ্নই ওঠে না এবং এর কোনো কারণও নেই। একাত্তর থেকে আজ পর্যন্ত যে সমস্যাগুলো পাকিস্তান জিইয়ে রেখেছে তার মীমাংসা না হলে কী করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটবে। প্রথমত, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তান ক্ষমা তো চায়ইনি, এমনকি সামান্য দুঃখও প্রকাশ করেনি। দ্বিতীয়ত, ১৯৭৪ সালে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও যেসব সেনা সদস্য যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তার বিচার এ পর্যন্ত করেনি এবং এ সম্পর্কে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। তৃতীয়ত, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট যে সম্পদ ছিল তার শতকরা ৫৬ ভাগ হিস্যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত কনভেনশন ও প্রথা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্য। এ বিষয়ে পাকিস্তান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, কোনো আলাপ-আলোচনাও নেই। চতুর্থত, একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে তারাই প্রথম যুদ্ধ শুরু করেছে বিধায় আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী পাকিস্তান আগ্রাসী রাষ্ট্র। তাই যুদ্ধের সম্পূর্ণ দায় তাদের। বাংলাদেশব্যাপী পাকিস্তানি সেনারা নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর সীমাহীন হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণ অনুযায়ী সব হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষতিপূরণ পাকিস্তানকে বহন করতে হবে। পঞ্চমত, অবাঙালি পাকিস্তানি নাগরিক, যারা পাকিস্তানে ফেরত যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে,  পাকিস্তানকে তাদের ফেরত নিতে হবে।

এ তো গেল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ঘটনা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট অমীমাংসিত ইস্যু। তারপর গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যে আপত্তিকর বক্তব্য ও তৎপরতা, তারও তো একটা মীমাংসা হতে হবে। ২৬ জুলাই ডন পত্রিকার ওই বিশাল প্রতিবেদনের ভেতরেই অত্যন্ত আপত্তিকর কথা আছে। বাংলাদেশের বিচার প্রসঙ্গ টেনে ডন পত্রিকা বলেছে, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। এই তথাকথিত কথাটির মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পাকিস্তান এখনো কী ধরনের ধারণা পোষণ করে। প্রতিটি যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকরের পর পাকিস্তানে গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিক শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। তারা যদি সত্যি সম্পর্ক উন্নত করতে চায়, তাহলে এসব ঔদ্ধত্যপূর্ণ কাজ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অপরাধেও পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে। ১৯৯৯ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের দূতাবাসে ইরফান রাজা নামের একজন ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন। একবার এক আলোচনাসভায় প্রসঙ্গক্রমে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উঠতেই ইরফান রাজা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন এবং বললেন, কিসের ক্ষমা, কী জন্য ক্ষমা ইত্যাদি। ওই সময়ের আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে বহিষ্কার করেছিল। ২০১৪-১৫ সালে পাকিস্তানের ঢাকাস্থ দূতাবাসের কর্মকর্তা মাজহার খান ও শারমিন আরশাদ বাংলাদেশি জঙ্গিদের মধ্যে টাকা বিতরণের সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। এ দুজনকেও বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

২৬ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে ডন পত্রিকা আরেকটি মিথ্যাচার করেছে। বলেছে, বঙ্গবন্ধু নাকি সব যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আর পেছনে না-ই বা গেলাম। সুতরাং পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ার আদৌ কি কোনো কারণ আছে? ২৬ জুলাইয়ের ডন পত্রিকার ওই প্রতিবেদনেই আছে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের সব সূচকে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক অনেক এগিয়ে আছে।

প্রসঙ্গক্রমে এবং ডন পত্রিকার প্রতিবেদন সূত্রেই চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে দু-একটি কথা বলতে হয়। আগেই বলেছি, ডন পত্রিকা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঝুঁকে পড়া কথাটি ব্যবহার করেছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো, এ কথা বলতেই হবে এবং তা মূলত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে, যার মধ্য দিয়ে দুই দেশই লাভবান হচ্ছে। এর সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের তুলনা টানা অর্থহীন, আর নয়তো উদ্দেশ্যমূলক। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যে ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে এবং তার ভেতরে যেসব বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে সে কারণেই সেটির ওপর অন্য কোনো দেশের প্রভাব পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। দারিদ্র্য বিমোচন ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এই সময়ে চীনের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একান্ত প্রয়োজন—এ কথা ভারতও উপলব্ধি করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের কেউই কোনো জোটের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং ভারত যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, তেমনি বাংলাদেশও সেটি পারে। এটিই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের প্রথা। এটিকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো জিইয়ে থাকা অবস্থায় এবং আরো অন্য যে বিষয়গুলো রয়েছে, যার কিছু ওপরে উল্লেখ করেছি তাতে পাকিস্তান আর বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনে আলাপ করা নিয়ে ভারতের কিছু মিডিয়া এবং বাংলাদেশের কেউ কেউ যে আশঙ্কা প্রকাশ করতে চেয়েছেন তার কোনো ভিত্তি নেই।

আমার আশঙ্কার জায়গাটি অন্যখানে। ২০১৬ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে সেই থেকে বাংলাদেশের একটি পক্ষ ও কিছু ব্যক্তি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে একটি ফাটল ধরানোর ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ—উভয় পক্ষেরই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তবে আমি বিশ্বাস করি, একাত্তরের রক্তে লেখা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এত সহজে কেউ বিনষ্ট করতে পারবে না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা