kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৭। ৬ আগস্ট  ২০২০। ১৫ জিলহজ ১৪৪১

দুঃস্বপ্নের নীরব সাক্ষী ছিটমহলের নীলকমল

ড. শফিক আশরাফ

৩১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুঃস্বপ্নের নীরব সাক্ষী ছিটমহলের নীলকমল

সারা পৃথিবী যখন করোনায় কাঁপছে তখন স্বাভাবিক নিয়মে বয়ে চলেছে সময়ঘড়ি। চীন থেকে শুরু হওয়া ক্ষুদ্র একটা ভাইরাসের যাত্রা। সেটা ইউরোপকে সন্ত্রস্ত করে যখন আমাদের দেশে আসি আসি করছিল, তখন আমরা ভেবেছিলাম এই আমাদের এখানে তেমন কিছু করতে পারবে না! গরমের দেশ, এমনিতেই মরে যাবে ভাইরাস! কিন্তু না, এমনিতেই মরেনি। সরকার বিচক্ষণতার সঙ্গে বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ করা থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা, দেশকে লকডাউন করা সব চেষ্টাই করেছিল এই ভাইরাসের অবাধ যাত্রাকে ব্যাহত করতে। এসব সিদ্ধান্তের সফলতাও অনেকখানি ছিল; কিন্তু মানুষ যখন এর বাহন তখন এটা মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো মানুষের অনেকটা সাধ্যাতীত। এই ভাইরাস এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কিছুটা আশার কথা হলো, বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষ এখনো এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে এখনো মুক্ত আছে।

পাঁচ বছর আগেও আমাদের মানচিত্রের জটিল ও দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল এই ছিটমহলের সমস্যা। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার যে কয়টা উল্লেখযোগ্য কাজ করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে তার মধ্যে একটা ছিল ছিটমহল সমস্যার সমাধান। শুধু এই সমস্যা সমাধান করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর উন্নয়নে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে তাদেরকে আমাদের মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সাধারণত বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করা কিংবা প্রবল সমালোচনার তোপে সব ভালো কাজকেও উড়িয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা আমাদের অনেকের মধ্যে লক্ষণীয়। আমাদের ঘরে পরের বেলার খাবার না থাকলেও মোড়ের চায়ের দোকানে বসে সকাল-বিকাল রাজা-উজির মারায় আমরা অনেকে অভ্যস্ত। কিন্তু বুদ্ধিমানের ধর্ম হলো সমালোচনা করে, সময় নষ্ট না করে, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। স্যার রেডক্লিফ কেন এ রকম একটা ম্যাপ করেছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সেই সমালোচনার একটি হলো, ব্রিটিশরা মনে করত এই উপমহাদেশের মানুষ এখনো রাজ্যশাসন কিংবা নিজেদের সমস্যা সমাধানের জন্য উপযুক্ত নয়! ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গেলে তারা নিজেদের তুচ্ছাতিতুচ্ছ সমস্যা নিয়ে দিনের পর দিন মারামারি করবে। যদি এই বক্তব্য মেনেও নিই, তাহলে কিন্তু এই ক্যালকুলেশন এতটা সরল নয়। ব্রিটিশদের বলা হয় দোকানদারের জাতি। ব্রিটিশরা যখন এখানে ব্যবসা বা দোকানদারির উদ্দেশ্যে আগমন করে তখনো এই দেশ ধনে, সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল এবং চিনি, মসলা, কাপড়ের মতো অনেক জিনিস রপ্তানিও করত। তবে আবার এটাও ঠিক, এই ব্রিটিশরা ছিল অপার কৌতূহলী জাতি। তাদের কৌতূহলের কারণে আমাদের জমিগুলোয় মোটামুটি নিখুঁত মানচিত্র তৈরি হয়েছে। শুধু জমি কেন! আমাদের ভাষা, আমাদের জলবায়ু, মাটি এমনকি এখানকার বিভিন্ন সামাজিক প্রথা নিয়েও তারা গবেষণা করে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে নানা গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, যা আমরা নিজেরা করিনি বা পারিনি। এখানে দীর্ঘদিনের সেন, পাল বা মোগল শাসনে এসব কিছুই হয়নি, যা হয়েছে ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনে। ফলে তাদের তৈরি করা মানচিত্র নিয়ে যত সহজে আমরা সমালোচনা বা বিতর্ক করতে পারি তত সহজে এই সমস্যার সমাধান করতে পারিনি। কাজেই বর্তমান সরকারের হাতে এই সমস্যার সমাধান ফলাফল অনেক গভীরে প্রোথিত।

বর্তমানে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা কেমন আছে? এই পাঁচ বছরে তাদের জীবনমানের কেমন পরিবর্তন হয়েছে? তাদের দুর্ভোগ ও দুঃস্বপ্নের রাত কেটে কতটুকু আলোর দেখা তারা পেল? এসব বিষয়ে খোঁজখবর করতে সেই সময়ের ছিটমহল আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। কথা বলে গোলাম মোস্তফাকে খুশিই মনে হলো। তিনি জানালেন, একসময় তাদের অনেকটা লুকিয়ে বা পালিয়ে বাঁচতে হতো। কেউ অসুস্থ হলে নিজেদের পরিচয় নিয়ে কোনো চিকিৎসাসেবা পেত না! শিক্ষা অর্জনের জন্য মিথ্যা ও ভুয়া পরিচয়পত্র নিয়ে তা করতে হতো। এখন তারা একটা স্বাধীন দেশের পরিচয়পত্র নিয়ে মাথা উঁচু করে চলে। তাদের সন্তানেরা শিক্ষার জন্য আর হাহাকার করে না। এখানে এখন রাস্তাঘাটের চেহারা পাল্টে গেছে, আগের মেঠো রাস্তা এখন পাকা ও পিচঢালা। যেকোনো বাজারঘাট তাদের জন্য এখন উন্মুক্ত। এখানে এখন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হয়েছে, কাজেই চিকিৎসার জন্য আর লুকিয়ে ডাক্তার দেখাতে হয় না। তারা বেঁচে আছে মুক্ত স্বাধীন দেশে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে। তবে যারা ভারতকে তাদের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছে, তারা এতটা ভালো নেই বলে জানালেন গোলাম মোস্তফা। এপার থেকে ওপারে যাওয়ার সময় অনেকে তাদের সহায়সম্পত্তি নামমাত্র দামে বিক্রয় করে দিয়ে যায়, আবার কেউ এমনি ফেলে রেখে চলে যায়, পরে সেগুলো সরকারি সম্পত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এপার থেকে ভারতকে দেশ হিসেবে বেছে নেওয়া এ রকম একজন ছিলেন, তাঁর নাম মৃণাল। ওপারে যাওয়ার পর তাঁর মা-বাবা মারা যান; কিন্তু এটা ছিল মৃণালের দুর্ভোগের শুরু। এরপর তাঁর একমাত্র মেয়েকে দুর্বৃত্তরা অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত এপারে ঘটিবাটি বিক্রয় করা টাকায় কেনা একখণ্ড জমিও বেদখল হয়। মৃণাল এখন বুক চাপড়ে হাহাকার করছেন, কেন দেশ ছেড়ে এলেন! দেশমায়ের অভিশাপে তিনি আজ সর্বস্বান্ত বলে মনে করছেন। আমাদের এখানে গোলাম মোস্তফাদের এ ধরনের কোনো সমস্যা নেই। তবে তাঁদের কিছু চাহিদার কথা তাঁরা জানালেন। যেমন—এখানে কোনো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। তারা বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহণ করে দেশসেবায় নিয়োজিত হতে চায়। অন্য যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আছে তার বেশির ভাগই প্রাইভেট, শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন পান না। ফলে যোগ্য শিক্ষকরা এখানে পাঠদান করতে উৎসাহী নন। যদিও পঞ্চগড়ে তিনটি ও কুড়িগ্রামে একটি ছিটমহলের মোট চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এরই মধ্যে জাতীয়করণ করা হয়েছে, তবে তারা আশা করে এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে আরো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হবে। তাঁরা বলেন, আমরা উন্নয়ন পেয়েছি, নাগরিকত্ব পেয়েছি এবং নাগরিক সেবাও পাচ্ছি, তবে শিক্ষার দিকটায় আরো মনোযোগের দাবি করছি। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ যেহেতু কৃষক ও কৃষি পেশার সঙ্গে জড়িত, সুতরাং এই করোনাকালেও তাদের অন্নের কোনো সংকট নেই।

নীলকমল নদীবেষ্টিত দাশিয়ারছড়ায় কোনো করোনার প্রকোপ নেই। টইটুম্বর নীলকমলের পানি এখনো বন্যার প্লাবন ঘটায়নি। এরই মধ্যে এখানকার অধিবাসীরা ছিটমহল বিলুপ্ত ও নাগরিকত্ব পাওয়া উপলক্ষে সীমিত আকারে আনন্দ দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই দিন তারা হয়তো তাদের অতীত দুঃস্বপ্নের কথা স্মরণ করে শিহরিত হবে, হয়তো নীলকমল থেকে উঠে আসা লিলুয়া বাতাস তাদের সেই দুঃখস্মৃতিতে শান্তির পরশ বুলিয়ে যাবে, যে নদীটিই ছিল তাদের সব ঘটনার একমাত্র নীরব সাক্ষী।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

 

মন্তব্য