kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

করোনার প্রভাবে গড়ে উঠছে নতুন জীবনদর্শন

অনলাইন থেকে

৩০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনাভাইরাসের বিশ্বব্যাপী বিস্তার অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে এবং প্রতিষ্ঠিত চিন্তাধারার অনেক ফাঁকফোকর দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা এখন যে দুর্দশার মধ্যে বসবাস করছি, সে বিবেচনায় আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনে ভাইরাসটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব কী হবে—সেদিকে একনজর তাকানো দরকার। ভবিষ্যতে আমরা কিভাবে বসবাস করব এবং এর রাজনৈতিক পটভূমি কী হবে—এত দিন ধরে এ নিয়ে প্রশ্নাতীত বিবরণ চলে আসছে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই আমাদের নজরটা দিতে হবে।

ইংরেজিভাষী দুনিয়ায় দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত একটা মন্ত্র বারবার উচ্চারিত হয়, পৃথিবী জনবহুল হয়ে গেছে, সম্পদ শেষ হয়ে আসছে এবং জলবায়ু বা অন্য কিছু আমাদের সবাইকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ধ্বংস করে দেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কেউ কেউ ধর্মবাণীর মতো গ্রহণ করে। কেউ কেউ বলতে চায় যে মানবজাতির ভবিষ্যৎ হচ্ছে একটি ‘বৈশ্বিক হংকং’, যা অনেকটা কমিক সিরিজ জাজ ড্রেডে বর্ণিত মেগা সিটি ওয়ানের মতো।

আমরা মনে করি, ক্রমহ্রাসমান সম্পদ নিয়ে একটি মারাত্মক জনবহুল বিশ্বে বাস করছি এবং অটোমোবাইলগুলো হচ্ছে শয়তানের ঘোড়া। তাই হংকংয়ে গড়ে ওঠা লম্বা ঘনবসতির অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকগুলোতে ‘কফিন হোম’ (এক কক্ষের মিনি বাসা) নির্মাণের যুক্তি আমরা মেনে নিই। গাদাগাদি করে এভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস অবশ্য বড় বাজারও সৃষ্টি করে, যা ব্যবসার জন্য খুব ভালো। কিন্তু করোনাভাইরাস যে প্রভাব ফেলেছে, এরপর আমাদের ভবিষ্যৎ ঘনবসতির এই নগরায়ণকে আর গ্রহণ করবে না। ফলে আমাদের পেশা ও নাগরিক জীবনের অনেক অপরিহার্যতাই বদলে যাবে।

যাতায়াত হচ্ছে পেশাজীবনের অপরিহার্য বিষয়। করোনাভাইরাস যে প্রভাব রেখে যাচ্ছে, তাতে একসময় যাতায়াত আর বাধ্যতামূলক থাকছে না। অথচ নিত্যদিনের এই রীতি এত সত্য হয়ে উঠেছিল যে কখনো মনেই হয়নি তা বদলে যেতে পারে। কভিড-১৯ এসে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মীদের বাড়িতে রেখে কাজ করাতে বাধ্য করেছে। অথচ করোনা-পূর্ববর্তী সময়ে বাড়িতে বসে যখন সার্ভার টেকনিশিয়ান, টক শো হোস্ট বা অফিস ম্যানেজাররা কাজ করতেন, তখন তাঁদের অদ্ভুত মানুষ মনে হতো; কিন্তু চলমান বাস্তবতায় মানুষ বাড়ি থেকে ভালোভাবেই কাজ করছে এবং এটা পুরো সমাজের জন্যই প্রযোজ্য হয়ে উঠেছে।

চাকরির জন্য শহরেই বাস করতে হবে—সেই ধারণাও বদলে যাচ্ছে। উজ্জ্বল পেশাজীবন গড়তে যেসব মানুষ নিউ ইয়র্ক সিটির যাতনা সইতে চায়, তারা যদি ওহাইও অঙ্গরাজ্যের গ্রামীণ এলাকায় থেকে সেটা পায়, তো তারা কী করবে? মানুষ আসলে ভালো ক্যারিয়ার ও ভালো বেতন অর্জন করতে চায়। সে ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একটি বিরাট অংশই এসব নগরকে সহ্য করা অর্থহীন মনে করবে।

দৃশ্যমান দোকানপাটের বিদায় ঘটাবে করোনা। লস অ্যাঞ্জেলেসে নগর পরিকল্পনাবিদদের বলতে শোনা যায়, শহরের রাস্তার ৮০ শতাংশ জায়গায় গাড়ির দখল থাকা ভয়ানক ব্যাপার। তাই হাঁটার জন্য আরো জায়গা দরকার। কিন্তু কভিড-১৯ বলছে, অনলাইনভিত্তিক পণ্য সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় এখন বরং গাড়ির জন্যই রাস্তা আরো ছাড়তে হবে। তাই ২১ শতাব্দীতে রোডসাইড শপ বা দৃশ্যমান দোকানপাট স্থাপনকে জায়গা নষ্ট হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। শপিং মলগুলো দ্রুত উঠে যাবে এবং দোকানপাট স্থাপন সাধারণত অর্থহীন হয়ে পড়বে।

নগরজীবন মানসিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিকভাবে ক্ষতিকারক—এই বার্তাটা নতুন করে দিয়েছে কভিড-১৯। যখন খারাপ সময় আসে এবং আমরা একা থাকি, তখন শহরে অতিক্ষুদ্র কংক্রিট বাক্সে আটকা পড়ার তুলনায় গ্রামে বা শহরতলিতে নিজ বাড়িতে থাকাটা ছুটি ভোগ করার মতো ব্যাপার হয়ে ওঠে। করোনা এসে মানুষের অর্থসম্পত্তি নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং বাচ্চাদের সঙ্গে আরো বেশি সময় কাটানোর সুযোগ করে দিয়েছে। দার্শনিক ভাষ্য হলো, অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটজীবন পুরুষ মনস্তত্ত্বের জন্য খুব ক্ষতিকর। ঐতিহাসিকভাবে নারীর ক্ষেত্রটি ঘর বা পরিবারের অভ্যন্তরীণ দিকে নিবদ্ধ এবং পুরুষের প্রবণতা হচ্ছে সম্পদ আহরণ ও চ্যালেঞ্জ জয়ের বহির্মুখী দৃষ্টি। এ অবস্থায় পুরুষ যখন একটি ছোট বাক্সে (ক্ষুদ্র বাসা) আটকা পড়ে, তখন তার শক্তি ক্ষয় হয়। তাই ভবিষ্যতে কংক্রিট বাক্সের পরিবর্তের মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন বাড়ি নির্মাণেই মানুষ মনোনিবেশ করবে।

ভবিষ্যৎ জীবন যাপনের জন্য একটি বিকল্প দর্শন আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই দর্শন ছোট ছোট টিনে সামুদ্রিক পোনা চাষের মতো মানুষের বসবাসকে নিরুৎসাহ করবে।

সূত্র : স্ট্র্যাটেজিক কালচার

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা