kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

রপ্তানি বিনিয়োগ আকর্ষণে কূটনীতির গুরুত্ব

এ কে এম আতিকুর রহমান

৩০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রপ্তানি বিনিয়োগ আকর্ষণে কূটনীতির গুরুত্ব

কূটনীতি চর্চার প্রারম্ভিক পর্যায়েও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক উন্নয়নে বাণিজ্যের পদচারণ লক্ষণীয়। তবে ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়কে একত্রে বিবেচনা করা শুরু করল, তখন অর্থনৈতিক কূটনীতি এক ভিন্ন আঙ্গিক লাভ করে। বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে কূটনীতি বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক আন্তর্নির্ভরতার মাপকাঠিতে বিচার্য হওয়ার কারণে দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে অর্থনীতি একটি নির্ধারক উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি দেশগুলোর মধ্যে যেমন সম্পর্কের গভীরতা নির্ণয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তেমনি এটি প্রায়ই তাদের রাজনৈতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা, বিষয়বস্তু এবং তীব্রতাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও সনাতন রাজনৈতিক কূটনীতি এবং বর্তমান অর্থনৈতিক কূটনীতি অবিচ্ছেদ্য, তবে কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে এখন অর্থনৈতিক কূটনীতিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনীতি অর্থনৈতিক কূটনীতিনির্ভর হয়ে পড়ায় এরই মধ্যে তার পরিধি ও কর্মক্ষেত্রকে প্রচলিত সীমা ছাড়িয়ে অনেকটাই প্রসারিত করেছে।

অর্থনৈতিক কূটনীতিকে দেশের সঙ্গে দেশের ব্যাবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ ও প্রচার কৌশল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এ ক্ষেত্রে উভয় দেশের ব্যবসায়ী নেতারা এবং সরকারি নীতিনির্ধারকরা বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয়ে পারস্পরিক সুবিধার জন্য একত্রে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসহ কুশলী, দেশপ্রেম ও প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন নমনীয়তা, বিচক্ষণ ও শক্তিশালী ব্যাবসায়িক দক্ষতা অর্থনৈতিক কূটনীতিকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সাফল্যপ্রত্যাশী দেশের এটি ভাবা সংগত হবে না যে তারা ফুল এবং ব্যবসা মৌমাছি। পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে না। যেকোনো কিছু ঘটার পেছনে অন্ততপক্ষে একটি কারণ অবশ্যই থাকবে। ব্যবসাকে আকর্ষণ করতে জড়তা ভেঙে সক্রিয় হতে হবে, অবশ্যই সুযোগ খুঁজতে হবে এবং ব্যবসাকে স্বপক্ষে আনতে শিখতে হবে।

আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। যদিও ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশ বিশ্বসম্প্রদায়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে অর্থনীতি আমাদের কূটনীতির একটি উপাদান ছিল, তবে কয়েক দশক ধরে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ই কূটনীতিতে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের নির্দেশনা ও নীতি অনুসরণ করে দেশে ও বিদেশে অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যাওয়া সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। আমরা কেন প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছি না? আমরা কী কী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি? অন্যরা কিভাবে এতটা ভালো করছে? তাদের এই সাফল্যের পেছনে ‘গোপন মন্ত্রগুলো’ কী কী? আমাদের সেই উত্তরগুলোর সন্ধান করতে হবে এবং সমাধানও বের করতে হবে।

আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতি মূলত তিনটি খাতকে ঘিরে, যেমন—ক. বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই), খ. পণ্য রপ্তানি (বস্তু ও প্রযুক্তিগত পণ্য) এবং গ. বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসী। তবে বিভিন্ন দেশ বা সংস্থা থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও আমাদের কূটনীতির আশ্রয় নিতে হয়। তাই বর্তমান সময়ের ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ শুধু বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে কর্মরত পেশাদার কূটনীতিকরাই নন, দেশে বসে মন্ত্রী, সরকারি কর্মচারী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদরাও অনুশীলন করে থাকেন। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কূটনীতির সঙ্গে জড়িতরা হলেন—১. আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সব সরকারি সংস্থা, ২. বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), যারা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংযুক্ত এবং ৩. ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী। স্বীকার করতেই হয় যে দুর্বল অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব, বহুবিধ রপ্তানি পণ্যের অপর্যাপ্ততা, সরকারের বিভিন্ন অফিসের মধ্যে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দেশে ও বিদেশে অবস্থিত সরকারি অফিসগুলোতে শৃঙ্খলার অভাব ইত্যাদি আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতি থেকে প্রত্যাশিত ফল পাওয়ার প্রধান অন্তরায়। আমাদের কাছে পুরো মাঠ ও খেলোয়াড় রয়েছে, তবে এই সমস্যাগুলো সমাধান না করা হলে খেলায় জেতা কঠিন হয়েই রবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় প্রথমেই বলতে চাই বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) নিয়ে। কূটনৈতিক পেশায় থাকার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ঢাকা সফর নিয়ে অনেক সময়ই অপ্রীতিকর কাহিনি শুনতে হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মতে, এফডিআইয়ের জন্য আমাদের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘ। আসলে বিনিয়োগকারীদের হয়রানি নয়, বরং উৎসাহিত করা উচিত। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের পাশাপাশি তুলনামূলক ভালো ব্যবসা করা যায় এমন দেশকেই প্রাধান্য দেবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল পেতে হলে বিদ্যমান কাঠামোর পুনর্গঠন আবশ্যক। এটিকে শুধু সময়োপযোগী করাই নয়, বিনিয়োগবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক করারও প্রয়োজন রয়েছে।

বিনিয়োগ আকর্ষণের পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ করার জন্য প্রয়োজন—ক. প্রাথমিক তথ্য, নির্দেশিকা এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ বিদেশে আমাদের মিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহের সুবিধা এবং খ. একটি কেন্দ্রীয় বিদেশি বিনিয়োগ অনুমোদন কমিটি (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সদস্যদের সমন্বয়ে) থাকবে, যা আগ্রহী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত আবেদন (আমাদের মিশন বা অনলাইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত বা সরাসরি জমা) নিয়ে আলোচনা করবে এবং সিদ্ধান্ত (অনুমোদিত/প্রত্যাখ্যাত) দেবে। একজন বিনিয়োগকারী অনুমোদন পাওয়ার পর তিনি প্রকল্পের আকার সাপেক্ষে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অন্য সব আনুষ্ঠানিকতা (যা তিনি এরই মধ্যে অবগত আছেন) শেষ করবেন। সেই কমিটিকে যাবতীয় পরিষেবা সরবরাহ করার জন্য একটি অফিস থাকবে (বিনিয়োগ বোর্ডও হতে পারে)। এমনকি নির্ধারিত কিছু খাত বাদে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের মাধ্যমে (অনলাইন) বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কথাও ভাবা যায়। এ ধরনের অনুমোদন ছোট বা মাঝারি আকারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য একটি ভোগান্তিহীন বিকল্প হতে পারে।

আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা এবং তার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির নীতিমালা প্রণয়ন করে সেগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করা। তবে এসব নীতিমালা এবং আমাদের প্রচেষ্টা সফল হবে না, যদি না আমরা বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে না পারি; কারণ তার ওপরই নির্ভর করে আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির সাফল্য।

আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার ওপর বর্তিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে প্রায়ই সরকারের অন্যান্য দপ্তরের কর্মচারীদের, যারা আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতি প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট, একক নেতৃত্বে আনতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। কোনো মন্ত্রণালয় বা ব্যক্তির আচরণ, ভুল-বোঝাবুঝি বা নেতৃত্ব দ্বন্দ্বের জন্য কেন দেশ ভুগবে? আমরা অন্যান্য দেশ, যেমন—ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, চীন প্রভৃতির এ ক্ষেত্রে কর্মপরিকল্পনা এবং সমন্বয় ব্যবস্থা জানতে পারি। আমরা যদি আমাদের কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও সর্বোত্তম সমন্বিত পরিবেশ আনতে ব্যর্থ হই—নীতিমালা ও প্রচেষ্টা যা-ই থাকুক না কেন, এটি দেশের জন্য ভালো ফল এনে দেবে না।

কভিড-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক বিশ্বে মানুষের পরিবর্তিত আচরণ এবং অর্থনৈতিক ধারায় পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতএব বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মনোযোগসহকারে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করে আমাদের সঠিক উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। প্রবল প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ অনুযায়ী নিজেদের উপযোগী করে তৈরি করতে না পারলে আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। আমরা যেমন একটি করোনামুক্ত বিশ্ব, নতুন মাত্রা এবং সমীকরণের বিশ্ব, নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষার বিশ্ব, নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার বিশ্বের অপেক্ষা করছি—আমাদের প্রস্তুতির কাজটিও এমনভাবে শেষ করতে হবে, যাতে আমরা সেই যাত্রায় অন্যদের থেকে পিছিয়ে না পড়ি।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা