kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

সাদাকালো

দুর্নীতি দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু

আহমদ রফিক

৩০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুর্নীতি দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু

দুর্নীতি দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশের নানা খাতকে দূষিত করে চলেছে, ক্রমাগত এর বাড়বাড়ন্ত। প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকার পাতা খুলতেই ছোট বা বড় একটা না একটা দুর্নীতির খবর পড়ে মনটা খারাপ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে অবশ্য বড় একটি সান্ত্বনার কথা মনে পড়ে যায় : দেশের স্বার্থে, জনস্বার্থে সৎ সাংবাদিকতা অপরিহার্য, এর কোনো বিকল্প নেই।

এ জন্যই বহু কথিত প্রথাটি আবার বলতে হয় : সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও অপরিহার্য, তবে এখানে ‘সৎ’ শব্দটির ব্যবহারও সমমাত্রায় প্রযোজ্য। বিশ্বজুড়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ। আর এই কর্মযাত্রায় মাদকবিরোধিতার কারণে মাফিয়া ডনদের প্রতিশোধস্পৃহায় প্রাণ দিতে হয়েছে সাংবাদিকতা পেশার সৎ কর্মী কাউকে কাউকে।

বাংলাদেশে চোরাকারবারিদের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকা নেওয়ার কারণে যশোরের অনুসন্ধানী সাংবাদিক শামছুর রহমান (কেবল)-কে প্রাণ দিতে হলো দুর্বৃত্তের হাতে। বহু সমালোচিত এই সাংবাদিক হত্যার বিচার হয়নি। এ রকম আরো দু-চারটে ঘটনাও নজিরবিহীন।

অন্যায়, সন্ত্রাস, খুন ও দুর্নীতি উদ্ঘাটনে সক্রিয় বলেই সাংবাদিকতাকে (আমার হিসাবে বিষেত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা) ‘ফোর্থ এস্টেট’ সম্মানে ভূষিত করে আলাপচারিতায় বেশ গর্ববোধ করতেন আমার অভিজ্ঞতায় প্রবীণ সাংবাদিক ওবায়দুল হক সাহেব। একালে হয়তো ব্যতিক্রমও দেখা দিতে শুরু করেছে। তবু মূল সত্যটার ব্যত্যয় ঘটেনি।

দুই.

জানি না কী করছে বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলো, বিশেষ করে ‘দুদক’—দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত দমনে। কিন্তু তাদের জন্য সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা দুর্নীতির কালো বোরকা উন্মোচন করে বা অন্ধকার গর্ভ থেকে দুর্নীতির ঘটনাকে টেনে এনে। দুর্নীতির কী যে রকমারি বাহার, কী তার কৃেকৗশল বা অভিনবত্ব।

সমাজে প্রভাবশালী, প্রতাপশালীদের দুর্নীতির শেষ নেই, কখনো তা রাজনীতির প্রশ্রয়ে-আশ্রয়ে। এর যাত্রা দীর্ঘদিন থেকে। তবে বিস্ময়কর ঘটনা হলো, করোনা সংক্রমণ দুর্নীতির নানা মাত্রিক ঘটনার উদ্ঘাটনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এমনকি করোনা উপলক্ষে দুর্নীতির একাধিক ধারায় প্রকাশ অনেককে অবাক করেছে, আবার কাউকে কাউকে এ বিষয়ে বিচার-ব্যাখ্যায় লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

সৎ সাংবাদিকের কার্যকারণে আমরা যেমন জানতে পেরেছি সংসদ সদস্যের পবিত্র আসন অলংকৃত করা সদস্যের মানবপাচার-মুদ্রাপাচারের মতো হীন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কুয়েতি ঘটনা, তেমনি জানা যেত না যে করোনা দুর্যোগে আক্রমণবিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ ‘কিট’ নিয়েও দুর্নীতি চলতে পারে?

জাতীয় দুর্যোগ দুর্নীতিবাজদের বিবেকে দাগ কাটে না। তাই দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম : ‘কিটের দামে কেলেঙ্কারি’। আরেকটু স্পষ্ট ভাষায় ‘সরকারের পক্ষ থেকেই ১৪০০-১৬০০ টাকার কিটের দাম ধরা হয় ২৭০০ টাকা। ধরা পড়ায় কমানো হয়েছে ৫০০ টাকা, বেঁচেছে সরকারের ১৬৫ কোটি টাকা’ (কালের কণ্ঠ, ১১.৭.২০২০)।

আর যদি কিটের সঠিক দাম কার্যকর করা  যেত, তাহলে তো সরকারের আরো অনেক অনেক টাকা ঘরে থাকত। সেটা কেন হলো না, সে প্রশ্ন মানুষ মাত্রেই করতে পারেন। আরো প্রশ্ন উঠতে পারে, এর জন্য কে বা কারা দায়ী। এই সংবাদ প্রকাশের পরও কি তাত্ক্ষণিকভাবে এই দুর্নীতির ঘটনা নিয়ে তদন্ত হয়েছে? অথচ এর মধ্যে অনুরূপ আরেকটি ঘটনায় জড়িত এক চিকিৎসক। আরেকটি খবর, তা-ও ওই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেনাকাটা বিভাগেই। শিরোনাম : ‘৪ লাখ টাকার ক্যানুলা কিনতে ৯ লাখ’। এখানেও কৃত্রিম মূল্য দ্বিগুণেরও অধিক দুর্নীতির কারণে। অবাক হচ্ছি ভেবে সরকারের আর্থিক স্বার্থ বা ক্ষতি দেখার মতো কেউ কি নেই, যে বা যারা এ ধরনের ঘটনার প্রতিবাদ করে? করোনাবিষয়ক দুর্নীতি তো শুরু সেই প্রথম থেকে—মাস্ক আর প্রতিরোধক ব্যবস্থা (পিপিই) ক্রয়-বিক্রয় ও সরবরাহের আমল থেকে।

তিন.

লক্ষ করার বিষয় করোনাসংক্রান্ত দুর্নীতি প্রায় সবটাই স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের অন্তর্গত—হোক তা প্রতিরোধ-বিষয়ক সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি ক্রয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতাল পরিচালনা এবং অনুরূপ বিষয়াদি নিয়ে।

তাই একের পর এক দুর্নীতির খবর ফাঁসে দেখা গেল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভাগ থেকে বিভাগ তাতে ফেঁসে যাচ্ছে। প্রবল সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে স্বাস্থ্য খাতের স্বনামখ্যাত পদাধিকারী ব্যক্তিরা। অভিযোগ উঠছে নানা উপলক্ষে। যেমন—কেনাকাটা, তেমনই করোনা পরীক্ষার সনদপত্রের জালিয়াতি নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। সেগুলোর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।

যে রিজেন্ট হাসপাতালটিকে করোনা সনদ জালিয়াতি ও অন্যান্য কারণে র‌্যাবের অভিযানে সিলগালা করে বন্ধ করা হলো, তাকে নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের সর্বোচ্চ পদস্থদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশিত দৈনিক কালের কণ্ঠে (১২.৭.২০২০), শিরোনাম : ‘স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মহাপরিচালক আবার তোপের মুখে’। ‘বহুল আলোচিত রিজেন্ট গ্রুপের দুটি হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের মধ্য দিয়ে আবার ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ভূমিকা।’

ছোট হরফের শিরোনাম-সহায়ক লেখা : ‘সাহেদের সঙ্গে তাত্ক্ষণিক চুক্তি স্বাক্ষর, নিজেই তৈরি করে নিয়ে এসেছিলেন কাগজপত্র। মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সুপারিশ আসে।’ একই বিষয় নিয়ে আরেকটি জাতীয় দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম: ‘রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে’ (১৪.৭.২০২০)। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ওই চুক্তির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। কিন্তু প্রথম আলোর ওই চুক্তি অনুষ্ঠানের সচিত্র প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে উপস্থিত দেখা যাচ্ছে সাহেদের সঙ্গে।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে : ‘স্বাস্থ্যে কেলেঙ্কারির দায় কার?’ এই প্রশ্ন নিয়ে যেমন একদিকে সংসদ, তেমনি অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মহল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বিব্রত। শেষোক্ত মহল থেকে একাধিক বিশেষজ্ঞের তীব্র সমালোচনা, বিশেষ করে সমপেশার মহাপরিচালকের (চিকিৎসক) বিরুদ্ধে, মন্তব্যে ও লেখায়।

এ প্রসঙ্গে একটি অতীত ঘটনা উল্লেখ করছি। পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ থেকে মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন থেকে আমাদের উত্থাপিত বহু দাবির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দাবি ছিল, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য খাতের প্রধান তিনটি পদেই (মন্ত্রী, সচিব ও পরিচালক) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিয়োগ।

যত দূর জানি, অতীতে তাঁদের ক্ষেত্রে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি, বিশেষ করে শেষোক্ত দুটি পদে বরং শেষোক্ত ক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রকাশই ঘটেছে। তৎকালীন অভিজ্ঞতায় চিকিৎসা পেশাদারির সঙ্গে যোগ্যতা ও  সততার এক রকম অদৃশ্য যোগসূত্র ছিল। আমরা কখনো ভাবিনি, স্বাধীন বাংলাদেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য বিভাগে প্রশাসকের (পরিচালক, মহাপরিচালক) পদে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পেশাগত সুনাম এভাবে নষ্ট করতে পারেন, দূষিত করতে পারেন পেশাদারির চরিত্র।

এরই মধ্যে ঘটনার দ্রুত পরিবর্তন। একরাশ দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও একজন পরিচালকের পদত্যাগ, তাঁরা দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তের অপেক্ষায়। অন্য পদস্থ চিকিৎসকদের আতঙ্কে দিন কাটছে। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী অভিযোগের অনেক চাপ সত্ত্বেও নির্বিকার; স্বপদে আসীন। নিরপেক্ষ সুষ্ঠু তদন্ত শুরু হলে তাঁর অবস্থানটিও স্পষ্ট হবে।

আমরা অনেকবার লিখেছি স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজানোর জন্য সৎ, দক্ষ, মেধাবীদের নিয়োগ দিতে। এখন বলছি, তার আগে দরকার স্বাস্থ্য খাতের চরম দুর্নীতি ও দূষণের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সৎ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির বিধান এবং তা অতি দ্রুততার সঙ্গে। কমিটি বা কমিশনের নামে কালক্ষেপণ নয়। স্বাস্থ্য বিভাগকে ঝেড়েমুছে পরিচ্ছন্ন করে তোলা অতি জরুরি। সেখানে চাই যোগ্যতা, সুশাসন, জবাবদিহি এবং প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতার প্রকাশ।

দেশের নানা খাতে দুর্নীতির ব্যাপক চালচিত্র নিয়ে আলোচনায় এ দফায় স্বাস্থ্য খাতই প্রধান বিবেচিত হলো। কারণ এটি মানুষের জীবন-মরণের সঙ্গে যুক্ত। এর গুরুত্ব অপরিসীম।

 

লেখক : কবি, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য