kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

করোনাকালেও নিরাপদ নয় সড়ক

হীরেন পণ্ডিত

২৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনাকালেও নিরাপদ নয় সড়ক

কভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও সড়কে মৃত্যু থেমে ছিল না। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে, এখনো ঘটছে। ৩১ মে থেকে স্বল্প পরিসরে সব কিছু চালু হয়েছে এবং সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে দূরপাল্লার যানসহ গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে পণ্য পরিবহনসহ জরুরি সেবায় ব্যবহৃত গাড়িগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে ছিল। অঘোষিত লকডাউনে মানুষ মূলত ঘরবন্দি থাকলেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থেমে থাকেনি। বেপরোয়া ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান কিংবা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে মানুষ। করোনাকালসহ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৪৯৫ ব্যক্তি নিহত হয়েছে এবং ৯৭৫ জনের মতো আহত হয়েছে; যদিও মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ ছিল।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ আছে। মানুষের চলাচল সীমিত করতে বন্ধ রাখা হয়েছিল গণপরিবহন। তাই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়ক ও মহাসড়কগুলো অনেকটাই ফাঁকা ছিল। তার পরও বন্ধ হয়নি সড়ক দুর্ঘটনা। কোনো কিছুই থামাতে পারছে না সড়ক দুর্ঘটনা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ছিল ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান দুর্ঘটনা, তারপর পর্যায়ক্রমে ছিল মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজি বাইক দুর্ঘটনা, নছিমন-করিমন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার দুর্ঘটনাও পিছিয়ে ছিল না, দূরপাল্লার বাস যেহেতু ছিল না, তাই বাস দুর্ঘটনা ছিল না সে সময় দু-একটি ঘটনা ছাড়া। তবে ৩১ মের পর বাস দুর্ঘটনা এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর তথ্য অনুযায়ী গড়ে প্রতিদিন ১৮ জনের প্রাণহানি হচ্ছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, এ সংখ্যা আরো বেশি। তাদের মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ ব্যক্তির প্রাণহানি হচ্ছে। আর বাংলাদেশ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২ হাজার মানুষ নিহত এবং ৩৫ হাজার আহত হয়। বলা বাহুল্য, সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও পাওয়া যায় না। সব দুর্ঘটনা ও হতাহতের হিসাব থানায় লিপিবদ্ধ হয় না বা সংবাদপত্রেও আসে না। এ কারণেই এবিষয়ক পরিসংখ্যানে সংগঠনভেদে পার্থক্য দেখা যায়। সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং আইনের যথারীতি প্রয়োগ না করাই দুর্ঘটনার কারণ। সড়ক দুর্ঘটনার এ সবই প্রকৃত কারণ। বিভিন্ন সংগঠনের পর্যবেক্ষণ, সমীক্ষা ও গবেষণায় এই কারণগুলোই পাওয়া যায়।

কারণ জানা থাকার পরও সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা কেন সম্ভব হচ্ছে না এবং প্রতিবছর তা বাড়ছে কেন—সেটাই প্রশ্ন। সড়ক দুর্ঘটনার মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ব্যাপক, যা নির্ণয় করাও কঠিন। এক হিসাবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মৃত্যুবরণ করে, তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। এই পরিবারগুলো রীতিমতো পথে বসে যায়। আহতদেরও অনেকে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তাদের পরিবারও বিপন্ন হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আর কাজে আসে না। এতে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তা অপূরণীয়। সবচেয়ে বড় কথা, জীবনের চেয়ে দামি কিছু নেই, সড়ক দুর্ঘটনা সেই জীবনকেই হরণ করে নেয়, যার সংখ্যা প্রতিবছরই বাড়ছে। এই দুর্ঘটনা কমানোর জন্য ট্রাফিক সংকেত মেনে চলা, যততত্র পার্ক না করা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ করা, সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় স্কুলের পাঠ্য তালিকাভুক্ত করা, গণমাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো, দক্ষ চালক তৈরিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, প্রধান সড়ক-মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং সড়কের বাঁক দূর করা।

যেহেতু সড়ক দুর্ঘটনার প্রধানতম কারণ চালকের অদক্ষতা ও প্রতিযোগিতাপ্রবণ মনোভাব, সুতরাং সর্বাগ্রে চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ ও ধৈর্যের শিক্ষাও দিতে হবে। সতর্কতা ও সচেতনতার অভাব দুঘর্টনা ও প্রাণহানির অন্যতম কারণ হওয়ায় পথচারী, যাত্রী, চালক—সবাইকে সচেতন করার পদক্ষেপ নিতে হবে। গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সবাই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে পথচারী ও যাত্রীদের অধিক সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। তারা সচেতন হলে দুর্ঘটনা প্রায় অর্ধেক কমে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, আইন আছে কিন্তু তার যথাযথ প্রয়োগ বাস্তব ক্ষেত্রে তেমন নেই। সড়ক-মহাসড়কে ছোট ও ধীরগতির যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ হলেও অবলীলায় তা চলছে এবং ছোট-বড় দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে। মোটরসাইকেলচালকদের জন্যও নানা নির্দেশনা রয়েছে। তা তারা মানছে না এবং মানানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে না। সড়ক-মহাসড়কে বেপরোয়া ও প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো বন্ধ করা সম্ভব হয়নি এত দিনেও। আইনের প্রয়োগই যদি না হয়, তবে আইন করা আর না করা একই কথা। বাংলাদেশে চালক ও পথচারী উভয়ের জন্য কঠোর বিধান যুক্ত করে কার্যকর করা হয়েছে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮।

ঢাকার দুই কলেজ শিক্ষার্থী সড়কে বাসচাপায় প্রাণ হারানোর পর শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সড়ক পরিবহন আইন পাস করে সরকার। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই আইন প্রয়োগে কতটা তৎপর সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে অনেক আইন আছে; কিন্তু সেটার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার। এ জন্য পুলিশকে সক্রিয় হতে হবে। বিদেশে রাস্তায় এত গাড়ি, কেউ কিন্তু আইন ভাঙে না, কারণ পুলিশ অনেক টাকা জরিমানা করে। আসলে ভয় দেখানোর মতো আইন প্রয়োগ করলে সড়কে শৃঙ্খলা আপনা-আপনি আসবে। নতুন আইনে বেশ কয়েকটি কঠিন বিধান রয়েছে। তার পরও এগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে না এবং পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না।

কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানের বিরোধিতা করে আসছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। এ কারণে এই আইন বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার আইন কার্যকর করতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে শ্রমিকদের যাতে হয়রানির শিকার হতে না হয় সে বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে এই আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে; কিন্তু সে রকম কোনো লক্ষণ আমরা দেখছি না।

তবে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে নিষ্পত্তি পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতা এবং সাক্ষ্যগ্রহণে জটিলতা মীমাংসা না করার কারণে এই আইনের সুফল থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করে। একটা মামলায় রায় হয়, তারপর আপিল এবং এরপর রিভিউ হয়। সব মিলিয়ে অনেক সময় লেগে যায়। সে কারণে ঘটনার প্রভাবটা সেভাবে থাকে না।

এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় সাক্ষ্যগ্রহণ নিশ্চিত করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশি তৎপরতারও একটা ব্যাপার আছে। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যদি একটা ট্রাইব্যুনাল থাকত, তদন্ত কর্মকর্তারা যদি চাপে থাকতেন যে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, তাহলে সাধারণ মানুষ এই আইনের সুফলটা পেত এবং সড়ক দুর্ঘটনাও অনেক কমে যেত।

লেখক : প্রাবন্ধিক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা