kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ভূমিকা

ড. আতিউর রহমান

২৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ভূমিকা

এমনিতেই করোনার দাপটে আমাদের অর্থনীতি দারুণ চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে আবার শুরু হয়েছে বন্যা। প্রবল বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে। বিশেষ করে গরু উৎপাদনকারী কৃষকের জন্য বাজার চাহিদায় খুবই মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। তাদের পুঁজি উঠে আসবে কি না সেটা নিয়েই সন্দেহ দেখা দিয়েছে। আর অনেক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। পোল্ট্রি খামারও এবারের বন্যায় বিপর্যস্ত। কৃষকের বীজতলা পানির নিচে। আগামী চাষাবাদ ও ফসল নিয়ে কৃষকরা তাই চিন্তিত। স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থার কারণে দেশের ভাবমূর্তিও চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে হালে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার বেশ কিছু ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। এর মধ্যেও আশার কথা এই যে রপ্তানি খাতের ছন্দ ফিরে আসতে শুরু করেছে। খেটে খাওয়া মানুষ ফের জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়েছে। তবে পর্যটন ও খাবারদাবারের সঙ্গে সম্পর্কিত আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে এখনো স্থবিরতা মোটেও কাটেনি। তাই এসব খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য নেই বললেই চলে। বেকারত্বও তীব্র। এই নতুন বাস্তবতায় আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে। সরকারের দেওয়া প্রণোদনা কর্মসূচি একমাত্র পোশাকশিল্প ভালোভাবে নিতে পেরেছে। এর পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতা এবং ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ভূমিকাকে ইতিবাচক বলতেই হবে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যেভাবে প্রায় পোশাকশিল্পের সব কর্মীকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় এনে তাদের বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা সত্যি প্রশংসনীয়। তবে পুরো দেশেই আর্থিক সেবাসহ ব্যাংকিং খাত নিরন্তর কাজ করে চলেছে। একেবারে প্রান্তের মানুষকেও অর্থ প্রদানে মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ও এজেন্টদের ভূমিকা আসলেই ছিল চোখে পড়ার মতো। আশা করছি, বাদবাকি আর্থিক প্রণোদনা কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়নেও ব্যাংকিং খাত সমান তৎপর হবে। বিশেষ করে কৃষি, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সহযোগিতা নিলে ভালো ফল নিশ্চয় মিলবে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার কৃষকসহ সেসব ছোটখাটো উদ্যোক্তা এখনো কাঙ্ক্ষিত এই প্রণোদনা সেভাবে পাচ্ছে না। এ জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি নিতে হবে। কোথায় বাধা, তা খুঁজে বের করতে হবে। আসলে খুব ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ব্যাংক কখনোই তেমন উৎসাহী ছিল না। ব্যাংক তাদের চেনে না, জানে না। তাদের কাছে নানা দলিলপত্র চাইলে তারা আর এগোতে চাইবে না—সে কথা ব্যাংক জানে। সে জন্য সৃজনশীল উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো কৃষকসহ এসব খুদে উদ্যোক্তাকে খুব ভালো করে চেনে। প্রায় তিন কোটি ৩০ লাখ ঋণগ্রহণকারী এদের থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। তাদের আকার এখন আর খুব ছোট নেই। তাদের খুদে উদ্যোক্তা বললে ভুল হবে না। প্রণোদনা কর্মসূচির একটি অংশ তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা। এই অঙ্ক আরো বাড়াতে হবে। বিশেষ করে খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা ২০ হাজার কোটি টাকার অর্ধেকটা বাংলাদেশ ব্যাংক পুনরর্থায়ন হিসেবে দেবে। এই ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় অংশ এমএফআইদের সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চয় সৃজনশীল পন্থা বের করতে পারে। এ ক্ষেত্রে পিকেএসএফ ও সিডিএফকে যুক্ত করতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় খানিকটা প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন দিয়ে (ক্রেডিট স্কিম চালু করে) এদের ঋণ প্রদানে উৎসাহী করা যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক তার প্রাপ্য সুদের হার হয় শূন্য অথবা নামমাত্র রেখে ব্যাংকগুলোকে প্রণোদনা আরেকটু বাড়িয়ে দিতে পারে। আমরা দেখেছি, পার্টনারশিপ ব্যবস্থা চালু করা গেলে ব্যাংক গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগে যথেষ্ট উৎসাহ দেখায়।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ২৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকার কৃষিঋণ নীতিমালা ঘোষণা করেছে। বিতরণের এই লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের চেয়ে বেড়েছে ৯ শতাংশ। তবে গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার প্রকৃত বিতরণ কমেছে গত বছরের চেয়ে ৩.৬৭ শতাংশ। অবশ্য কয়েক মাস দেশে লকডাউনের কারণেও এটা হতে পারে। কৃষিঋণের ক্ষেত্রেও সরকারি ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঋণ দিলেও মুখ চেনা কিছু গ্রাহকের বাইরে নতুন কৃষকদের তারা ঋণ দিতে খুব বেশি আগ্রহী নয়। এ ছাড়া ঋণ বিতরণে জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির নানা কথাও শোনা যায়। সে জন্যই প্রযুক্তির ব্যবহার করে আরো স্বচ্ছভাবে গ্রামীণ ঋণ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সনাতনি পদ্ধতিতেও ঋণ দিতে গেলে স্থানীয় গণ্যমান্য মানুষের সামনে প্রকাশ্যে এই ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ মিলে উপযুক্ত মনিটরিং কাঠামো গড়ে তোলা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনকেও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। আমরা কৃষিঋণ বিতরণে জনসম্পৃক্তি পদ্ধতির ব্যবহার করে ভালো ফল পেয়েছিলাম। ব্যাংকগুলোকে ঋণ গ্রহণকারীর মোবাইল ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়ভিত্তিক ই-কেওয়াইসি এবং কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর সহযোগিতা নিয়ে এগোলে নিশ্চয় প্রকৃত কৃষককে ঋণ দেওয়া সম্ভব। বন্যা ও করোনায় আক্রান্ত এই সময়ে কৃষিই হতে পারে আমাদের রক্ষাকবচ। কৃষিই হতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল শক্তি। কিন্তু কৃষিঋণ বণ্টনে সেই তোড়জোড় এখনো দেখতে পাচ্ছি না। কৃষকদের পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনামূলক ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার। তা সত্ত্বেও কৃষিঋণ বিতরণে গতি মন্থর কেন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষির জন্য অন্তপ্রাণ। এর প্রতিফলন কৃষিঋণ বিতরণে দেখতে চাই। তাই ব্যাংকগুলোকে সচল করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো তৎপর হতে হবে। বিশেষ করে বন্যার্ত এলাকায় কৃষির পুনর্বাসনে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো সক্রিয় হতে হবে।

হালের দুটি খবরে খুবই আশান্বিত হয়েছি। একটি ইংরেজি দৈনিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ওপর প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং লেনদেন বেশ বেড়ে গেছে। গত মার্চ নাগাদ এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাব বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ। গত বছরের এই সময়ের চেয়ে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ উভয় ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যাংকিং সেবা বেড়েছে। আমানত বেড়েছে ১২৯ শতাংশ। আর ঋণ প্রদান বেড়েছে ৩০৬ শতাংশ। যদিও আমানতের পরিমাণ ঋণ প্রদানের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ, তবু হালে ঋণদানের হার বাড়ছে। প্রণোদনার আওতায় কৃষিঋণ ও এসএমই ঋণ বিতরণে এজেন্ট ব্যাংকিং তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষি এখন আর শুধু ফসল উৎপাদন বোঝায় না। কৃষিঋণও শুধু ফসলি ঋণ বোঝায় না। মাছ, মুরগি, টার্কি, ছাগল ও গরুর খামারও কৃষিঋণের আওতায় পড়ে। সবজি, ফল ও ফুলের চাষ, নার্সারি, জৈব সার উৎপাদনও কৃষিঋণ পাওয়ার দাবিদার। এমনকি কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত নানামুখী অকৃষি উদ্যোগও (সেচযন্ত্র, ধান মাড়াই ও সার বিক্রিসহ) কৃষিঋণ পেতে পারে। এ সবই বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এর বাইরে কুটির শিল্প, এসএমই খাত তো আছেই। এ সবই প্রণোদনাযুক্ত ঋণ পেতে পারে। এমন সংকটকালে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিশেষভাবে চাঙ্গা রাখাটা খুবই জরুরি। আশা করছি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ অর্থনীতির পাশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং করোনা ও বন্যায় আক্রান্ত মানুষগুলোর মন থেকে হতাশা কাটাতে সাহায্য করবে। কৃষি চাহিদা ও সরবরাহ দুই দিকেই অবদান রাখে। এর মধ্যে শহর থেকে কাজ হারিয়ে অনেকেই গ্রামে চলে গেছে। বিদেশ থেকে কাজ হারিয়েও অনেকে গ্রামে ফিরে এসেছে। শহরে পড়াশোনা করত এমন অনেক শিক্ষিত তরুণও এখন গ্রামে চলে গেছে। তাদের অনেককেই এখন খুদে উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করা সম্ভব। তাদের জন্য সরকার দুই হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনাও দিয়েছে।

এরা এখন কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে আধুনিক কৃষির উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা নিশ্চয় রাখতে পারে। কৃষিপণ্যের সরবরাহ চেইন হঠাৎ ভেঙে পড়েছিল। এখনো পুরোপুরি তা মেরামত করা সম্ভব হয়নি। ডিজিটাল তথ্য ও মার্কেটিং সুযোগ-সুবিধা কী করে কৃষকরা পেতে পারে শিক্ষিত তরুণরা তা-ও তাদের সেই তথ্য ও পরামর্শ দিতে পারে। আগামী দিনের ‘স্মার্ট’ কৃষি রূপান্তরের বীজ এরাই এখন বুনতে পারে। অনেক নারীও এখন আধুনিক কৃষির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। প্রতিবছর কয়েক হাজার সফল আধুনিক কৃষক বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কারের জন্য আবেদন করে। তাদের যাচাই-বাছাই করে সীমিতসংখ্যক কৃষককে বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার দেওয়া হয়। নানা ক্যাটাগরিতে তাদের পুরস্কার দেওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদনকারীদের ও বিজয়ীদের তথ্যভাণ্ডার আছে। ব্যাংকগুলো চাইলে এই তথ্যভাণ্ডার কাজে লাগিয়ে এসব সফল কৃষককে আরো উন্নত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। এরাই সরকার ঘোষিত প্রণোদনা কর্মসূচির প্রথম দাবিদার হতে পারে। বিশেষ করে মৎস্য, মুরগি ও গরুর খামারিদের চলতি মূলধনের খুবই প্রয়োজন। তাদের হাতে প্রণোদনার অর্থ তুলে দিলে একদিকে গ্রামীণ উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানও নিশ্চিত করা যাবে। যেসব ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু আছে, তারা এসব সফল উদ্যোক্তাকে নিশ্চয় এসএমই ঋণ দিতে পারে। অন্যান্য ব্যাংকও তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে। যারা নিজেরা আসতে পারবে না তারা এমএফআইয়ের সঙ্গে অংশীদারি গড়ে তুলে এই গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে গ্রামীণ উৎপাদিত পণ্যের মার্কেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তাদেরও তারা ঋণ দিতে পারে। ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত নয়া উদ্যোক্তাদের তারা সহায়তা করতে পারে।

গ্রামে ছোটখাটো ব্যবসায়ীদের স্বল্প সময়ের জন্য হঠাৎ অর্থের প্রয়োজন হয়। সনাতনি ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে তাদের এই চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তাই তারা উচ্চ হারে মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেয়। তাদের জন্য বিশেষ ডিজিটাল আর্থিক সেবার উদ্যোগ নিশ্চয় নেওয়া যায়। শুনে খুশি হলাম, বিকাশ ও সিটি ব্যাংক মিলে এমন একটি আর্থিক সেবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ১০ হাজার টাকার নিচে যখন-তখন ঋণের সুযোগ পাবে এই খুদে ব্যবসায়ীরা। তিন মাসের জন্য সমান তিন কিস্তিতে ঋণ দেবে সিটি ব্যাংক। তাদের বিকাশ হিসেবে চলে যাবে এই টাকা। বিকাশ এখানে শুধু লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। বিকাশের সঙ্গে কাজ করছে চীনের বিখ্যাত ই-কমার্স উদ্যোক্তা আলিবাবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান অ্যান্ট গ্রুপ। বিকাশ গ্রাহকের অর্থ লেনদেনের তথ্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে। বিকাশ গ্রাহকদের ই-কেওয়াইসি করাই আছে। তাই উপযুক্ত মনে হলে পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে ঋণ প্রসেসিং করে দেবে ব্লক চেইন প্রযুক্তি। সেই ঋণ চলে যাবে বিকাশ হিসাবে। প্রতিদিনই সুদের হিসাব হবে। তিন মাসের আগেই যদি ফেরত দিতে চায় কোনো উদ্যোক্তা, তাহলে তার সুযোগও রয়েছে এই কর্মসূচিতে। দিন হিসাবে তখন কম সুদেই সে তার ঋণ ফেরত দিয়ে দেবে। ফের নিতে পারবে। এভাবে নিজের ঋণ ইতিহাস তৈরি করে একসময় ভালো উদ্যোক্তা হিসেবে তার সুনাম হয়ে যাবে। তখন হয়তো ব্যাংকঋণের ঊর্ধ্বসীমা বাড়াতে পারবে। পাইলট শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক তেমন সুযোগ নিশ্চয় তৈরি করতে ইচ্ছুক হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নয়া ধাঁচের এই ক্ষুদ্রঋণ গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারাটাই একসময় বদলে দিতে পারবে।

শুধু বিকাশ কেন, রকেটও তার হিসাবধারীদের ডেবিট কার্ড দিচ্ছে। হয়তো তারাও ক্ষুদ্রঋণ প্রদানে উৎসাহী হবে। গ্রামেই এখন হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ ফ্রিল্যান্সিং করছে। তাদের দরকার নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং বিদেশ থেকে সহজেই অর্থ গ্রহণের সুযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রেও বিকাশ বা রকেটের সঙ্গে যেকোনো ব্যাংকের গাঁটছড়া বেঁধে ‘পে-পল’ ধরনের লেনদেন ব্যবস্থার পাইলট করতে পারে। বিকাশ ও স্ট্যানচার্ট ব্যাংক মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স আনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। একই কায়দায় ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও লেনদেন সুবিধা সহজতর করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে একটি উদ্ভাবনী কেন্দ্র বা ইনোভেশন সেন্টার খুলেছে। এই কেন্দ্র ‘ফিনটেক’ সম্পর্কিত নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছে। এভাবেই এগোতে হবে। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ধারণার প্রবক্তা। সারা বিশ্বে তার সুনাম আছে। ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগগুলোকে উৎসাহ দিয়ে উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ ব্যাংক করোনায় আক্রান্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

আইএমএফ সম্প্রতি এক গবেষণায় বলেছে, যেসব দেশে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সচল রয়েছে সেসব দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি বাড়বে। আমাদের গ্রামে-গঞ্জের কৃষক ও খুদে উদ্যোক্তারাই শতকরা ৮০ ভাগের মতো কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে থাকে। তাদের কাছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রণোদনার অর্থনীতি নিতে পারলে গ্রামীণ চাহিদা ও সরবরাহ দুই-ই চাঙ্গা থাকবে। আর এরই মধ্যে আমরা ডিজিটাল অর্থায়নের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে স্থাপন করে ফেলেছি। এখন দরকার নানামুখী উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগের। এভাবেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি আনা সম্ভব। আর এই পুনরুদ্ধার হতে হবে অনেকটাই সবুজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

তাই এদিকটায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার বেশি করে নজর দেবে, সেই প্রত্যাশাই করছি।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

[email protected]

 

মন্তব্য