kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

উন্নয়ন কৌশল ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার

রুশিদান ইসলাম রহমান

২৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উন্নয়ন কৌশল ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক উন্নয়ন দুই দশক ধরেই ক্রমান্বয়ে অগ্রগতির পথে চলছিল। সারা পৃথিবীতেই এ রকম অগ্রগতি হচ্ছিল। করোনাভাইরাস মহামারি এই আশাব্যঞ্জক দৃশ্যপটে বিশাল আঘাত হানল। বাংলাদেশেও এই আঘাতে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে গেল। উন্নয়নের যেসব দিকে দেশটি সাফল্যের উদাহরণ হয়ে উঠেছিল, যেমন দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষায় অগ্রগতি, সেখানেও বিপর্যয় দেখা দিল।

এখন প্রথম অগ্রাধিকার তাই করোনা সংক্রমণ বিস্তার রোধ করা, জীবনহানি কমানো। এ ক্ষেত্রে কার্যকর কৌশল হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব বা সঙ্গনিরোধ। কিন্তু এই কৌশলের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্তব্ধ হয়ে যায়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পায়।

তার পরের প্রশ্ন অর্থনীতির অগ্রগতি ও পুনরুদ্ধারে কী ধরনের কৌশল নেওয়া হবে। অর্থনীতিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যের সঙ্গে সামগ্রিক উন্নয়নের দ্বন্দ্ব ঘটলে সেটা কিভাবে নিরসন করা হবে? ভাইরাস মহামারির বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তাই উন্নয়ন কৌশল নিয়ে পুনঃপর্যালোচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। প্রচলিত উন্নয়ন তত্ত্ব ও গবেষণার ভিত্তিতে যেসব উন্নয়ন কৌশল কার্যকর হয়েছিল, প্রয়োজনে সেগুলো পাল্টাতে হবে।

দ্রুততম সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির আগের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো বনাম সামগ্রিক কল্যাণের লক্ষ্যে অর্থনীতিতে সাফল্যের অন্যতম মানদণ্ড হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং এই প্রবৃদ্ধির ত্বরায়নে বাংলাদেশের সাফল্য অতীতে প্রশংসিত হয়েছে। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়ে উঠেছিল দারিদ্র্য নিরসনের একটি প্রধান পন্থা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পৃথিবীর অনেক দেশের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটি কার্যকর হবে কি?

এ ছাড়া বৃহৎ শিল্প, বিশেষত রপ্তানিমুখী পোশাক খাত বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করছে বলে খবরে প্রকাশ। পরে তারা সরকারি নীতি সহায়তা এমন দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরো পুঁজিঘন প্রযুক্তির দিকে যেতে সহায়ক হবে। এভাবে কর্মসংস্থানের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, তাতে দারিদ্র্যঝুঁকি বাড়বে।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর আরেকটি কৌশল হবে সরকারি ব্যয়নির্ভর মেগাপ্রকল্পগুলোর কাজ ত্বরান্বিত করা; কিন্তু এগুলোতেও শ্রমঘনত্ব কম। ফলে দারিদ্র্য হ্রাসে অবদানও হবে কম।

প্রচলিত উন্নয়নতত্ত্বের ভিত্তিতে দেড়-দুই দশক ধরেই বাংলাদেশ জোর দিচ্ছে জিডিপি ও কর্মসংস্থানের কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর। তার অর্থ হচ্ছে, জিডিপিতে কৃষি খাতের অংশ হ্রাস পাবে আর আধুনিক শিল্প ও সেবা খাতের প্রসার ঘটবে।

কিন্তু বৃহৎ শিল্পের দ্রুত উত্থান বর্তমান সময়ে সর্বোত্তম কৌশল নয়, আধুনিক সেবা খাত, যেমন পরিবহন, হোটেল, পর্যটন ইত্যাদির প্রসারও এখন নয় সহজ কাজ।

কাজেই এবার ফিরে আসতে হবে কৃষি খাতের অগ্রাধিকারের কৌশলে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে কৃষির দ্রুত প্রবৃদ্ধির ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে। এটা প্রয়োজন। কারণ খাদ্য আমদানির ক্ষেত্রে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সেই সঙ্গে এই খাত আগামী দুই-তিন বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও বড় অবদান রাখতে পারবে।

স্পষ্ট করা প্রয়োজন, কৃষির মধ্যে শস্য ছাড়া অন্য উপখাতগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে সহায়ক কৌশল নিতে হবে কৃষির সঙ্গে জড়িত সম্মুখবর্তী ও পশ্চাত্বর্তী উপখাতগুলোর জন্য। তার মধ্যে থাকবে কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের, বিপণনের ও সংরক্ষণের উপখাতগুলো।

এই সঙ্গে ধীরে ধীরে অকৃষি খাতের অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে চাঙ্গা করে তোলা প্রয়োজন। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এগুলোর অবদান বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার, ই-বিপণন ইত্যাদি দিকে কিভাবে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা দেওয়া যায় সেসব নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

আর বৃহৎ শিল্পের মধ্যে যেগুলো অত্যাবশ্যক পণ্য প্রস্তুত করে, যেমন ওষুধ ও চিকিত্সাসামগ্রী, অত্যাবশ্যক যন্ত্রপাতি, সেগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।

এবার করোনার আঘাত আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে অর্থনীতির কৌশল বিষয়ে, যা শুধু এখন বা মধ্য মেয়াদে নয়, দীর্ঘ মেয়াদেও উপকারী হতে পারে। বিগত কয়েক দশকে উৎপাদন কার্যক্রম প্রধানত কয়েকটি বড় শহরে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে সারা দেশ থেকে শ্রমিককে এসব শহর অভিমুখী হতে হয়েছে। ভাইরাস সংক্রমণে এর বিরূপ প্রভাব আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। ভাইরাস পরিস্থিতি ছাড়াও বিকেন্দ্রীকরণের অনেক সুবিধা সম্পর্কে সবারই ধারণা ছিল। এখন সময় হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার।

দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি একটি প্রধান উপায়। গত এক দশক বা সাত-আট বছর ধরে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হয়েছে শ্লথ গতিতে। সেই সমস্যাটি অতিক্রম করে দারিদ্র্য হ্রাস এগিয়ে যাচ্ছিল বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর ভর দিয়ে।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হলে দেশে প্রকৃত মজুরি ও বেতন বৃদ্ধি হতে পারত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেটা ঘটেনি (এসব তথ্য বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত)।

তবে এই সময়কালে বিদেশে কর্মসংস্থান বেড়েছে। গত দুটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বছরে তিন বা চার লাখ বিদেশি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তা ছাড়িয়ে গেছে প্রকৃত অভিবাসী কর্মসংস্থানে। কয়েকটি বছরে তা পাঁচ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে কর্মসংস্থান সেসব পরিবারের দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক হয়েছে। তাই সরকারি নীতিমালায় বিদেশি কর্মসংস্থান উত্সাহিত করা হয়েছে।

কিন্তু ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম ধাক্কাতেই বিদেশে কর্মসংস্থান দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক ফিরে এসেছে। শুধু যে সংক্রমণ বিস্তারের ভয়ে তা নয়, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে তেলের মূল্য পতনের ফলে আরব দেশগুলোতে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা হ্রাস ও শ্রমিক ফেরত পাঠানোর তৎপরতা।

এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। শ্রমঘন খাতগুলোকে উত্সাহিত করে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করে এই পথে এগোতে হবে। মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে মনে রাখতে হবে যে অদক্ষ শ্রমিকদের বিদেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ঝুঁকিপূর্ণ, যেকোনো সময় হ্রাস পেতে পারে। আর শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি, কর্মক্ষেত্রে অধিকারহীনতা, অত্যাচার—এসব পুরনো সমস্যা তো আছেই।

বিদেশি কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষতার সরবরাহ বৃদ্ধি করে সেই ধরনের অভিবাসী শ্রমিকের চাহিদা তৈরির জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগ ও কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের নির্বাহী চেয়ারপারসন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য

মন্তব্য