kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

আমাদের নিষ্ঠুরতা উত্তর প্রজন্ম কিভাবে দেখবে

নিকোলাস ক্রিস্টফ

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমরা যখন কোনো বিতর্কিত ভাস্কর্য  টেনে নামাই কিংবা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের পুনর্মূল্যায়নে  মেতে উঠি, তখন আমি এটা ভেবেও অবাক হই যে আমাদের চতুর্থ প্রজন্ম বা প্রপৌত্ররাও কতটা বিস্ময়করভাবে আমাদের অনৈতিকতাকে আবিষ্কার করবে? আমাদের আজকের দিনের যারা, তারা কি তখন নিন্দিত হবে? তাদের ভাস্কর্যও কি ধ্বংস করা হবে? আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের নৈতিকশূন্যতা কী পরিমাণ দেখতে পাবে? আমার ধারণা, আমাদের সময়ের এসব অসংগতির মধ্যে তাদের কাছে বড় একটা বিষয় হয়ে ধরা দেবে পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা। আমাদের আধুনিক সমাজ সস্তা ও প্রচুর পরিমাণে আমিষ উৎপাদনের জন্য যেভাবে কারখানা খামারের (ফ্যাক্টরি ফার্ম) ওপর নির্ভর করে আছে, তা পশু-পাখিদের প্রতি নিষ্ঠুরতা অপরিমিত মাত্রায় নিয়ে গেছে।

গত ২০০ বছরে বিশ্ব প্রাণী অধিকারের ব্যাপারে অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। সামন্ত ইউরোপে এমন একটি খেলা ছিল যে খাঁচায় ভরে বিড়ালকে মাথা ঠুকাতে বাধ্য করা হতো, যতক্ষণ না সে মারা যায়। আর এখন প্রাণী সুরক্ষায় আইন করা দেশের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ম্যাকডোনাল্ড তো খাঁচামুক্ত ডিমের দিকেই ঝুঁকছে। এমনকি নির্দিষ্টসংখ্যক কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর পক্ষে আদালতে মামলা করা যায় কি না সে বিতর্কও চলছে। এর ফলে তো সিটাসিয়ান কমিউনিটি বনাম প্রেসিডেন্ট বুশের মামলাও দেখেছি আমরা। বিপরীত দিকে আমাদের পোষা প্রাণীগুলোকে আমরা পরম আদর-যত্ন করি এবং একটি ধনী পরিবারের একটি কুকুর যে পরিমাণ চিকিৎসা ও দাঁতের যত্ন পায়, সেটা দরিদ্র পরিবারে শিশু কিন্তু পায় না।

আমাদের সমাজ এখনো সহানুভূতির জায়গাটা নজর এড়িয়ে যাওয়া খামারের প্রাণীগুলোর প্রতি সম্প্রসারণ করতে পারিনি, বিশেষ করে পোল্ট্রি খামারে। যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর ৯.৩ বিলিয়ন মুরগি জবাই করা হয়েছে। এখানে মুরগিগুলোকে কিভাবে মারা হয়? শ্রমিকরা প্রথমে মুরগির ঠ্যাংগুলোকে ধাতব শিকলে উল্টো করে বেঁধে রাখে। পরে বিদ্যুতায়িত বাথটবের ওপর রেখে ঘূর্ণমান করাত মুরগিগুলোর মাথা কাটে। এরপর মুরগিগুলোকে ফুটন্ত পানিতে চুবানো হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় যখন কোনো পাখি মারা না যায়, তখন তারা নিদারুণ যন্ত্রণায় ছটফট করে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের মতে, গত বছর পাঁচ লাখ ২৬ হাজার মুরগিকে সঠিকভাবে জবাই করা হয়নি। ফলে এর বড় একটি অংশই ফুটন্ত পানিতে জীবিত সিদ্ধ হয়।

আমাদের শিশুরা যখন কোনো জীবন্ত পাখির পালক তুলে ফেলে, সে হয়তো শাস্তি পায়। কিন্তু করপোরেট নির্বাহীরা যাঁরা কোটি কোটি পাখিকে এভাবে নির্যাতন করেন, তাঁরা ঠিকই বিকল্প তহবিল অর্জনের আনন্দে ভাসেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে লোকজনের মানসিকতায় পরিবর্তনও আসছে। ২০১৮ সালে ৮ শতাংশ তরুণ আমেরিকান জানিয়েছিল তারা নিরামিষভোজী। ৫৫ বছর বয়স্ক আমেরিকানদের মধ্যে নিরামিষভোজীর সংখ্যা মাত্র ২ শতাংশ। গত দুই বছর ধরে আমি নিজেও নিরামিষভোজী হয়েছি (তবে কড়াকড়িভাবে নয়, কারণ আমি মাছ খাই)। আমার মেয়ের জ্বালাতনের কারণেই আমাকে নিরামিষভোজী হতে হয়েছে। আমার অনুমান, নৈতিক ও পরিবেশগত বিবেচনায় এবং মাংসের বিকল্প মজাদার খাবার ক্রমেই বাড়তে থাকায় আমাদের খাবারে মাংস কমিয়ে দিতে হবে।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিটার সিংগার নামের দার্শনিক আমাকে বলেছিলেন, একদিন আমাদের উত্তর প্রজন্ম রোমানের কোলিসিয়াস গেমের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে আমাদের বর্তমান কালের ফ্যাক্টরি খামারের প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে তুলনা করবে।

আমাদের হৃদয়হীনতার দ্বিতীয় আরেকটা বিষয় দেখে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিস্ময়কর ঠেকবে। সেটি হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলোতে মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। চলতি বছরেও বিশ্বব্যাপী ৫০ লাখেরও বেশি ছোট শিশু ডায়রিয়া, অপুষ্টি ও অন্যান্য রোগে ভোগে মারা যাবে। আমরা শুধু আমাদের নিজস্ব উপজাতীয়বাদের (ট্রাইবালিজম) কারণে এসব শিশুকে মরতে দিয়েছি। আমরা এখন কোটি কোটি ব্রয়লার মুরগির প্রতি নিষ্ঠুরতার নিন্দা করছি। কিন্তু আফ্রিকার সাবসাহারা অঞ্চলে যখন ৭.৮ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছরের মধ্য মারা যায়। সে তুলনায় হৃদয়হীন কৃষি-বাণিজ্য (অ্যাগ্রিবিজনেস) অপেক্ষাকৃত ভালো মনে হয়।

আমাদের চতুর্থ প্রজন্মের চোখে তৃতীয় আরেকটি বিষয়ও বিস্ময়কর ঠেকবে। আমি ভেবে পাই না, জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে আমাদের তারা কতটা নির্মম বিবেচনা করবে। আমাদের প্রজন্মের অস্বীকার প্রবণতা (ডিনায়ালিজম) আবহাওয়াকে আরো চরম মাত্রায় নিয়ে যাবে। ফলে চতুর্থ প্রজন্মের জন্য আরো বিরক্তির কারণ হবে ২১ শতকের প্রারম্ভিক কালের মানুষজন কতটা স্বার্থপর ছিল।

সুতরাং আমি হয়তো ইতিহাস নতুন করে পরীক্ষা কিংবা ‘কনফেডারেট জেনারেলদের’ ভাবমূর্তি অপসারণের কথা বলে যাব। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমরা যে আমাদের নৈতিকতা নিয়ে দৃষ্টিস্বল্পতায় ভুগছি, তা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবা। একই সঙ্গে সময় থাকতেই এর মোকাবেলা করা দরকার।

লেখক : দুইবার পুলিত্জার পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা