kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

‘পাচার’কাণ্ডের পাঁচকাহন

আহমদ রফিক

১৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘পাচার’কাণ্ডের পাঁচকাহন

‘পাচার’ শব্দটি অপরাধজগতে বহুমাত্রিক তাৎপর্য ও চরিত্র বহন করে। যেমন এর ব্যাপকতা তেমন এর ভয়াবহতা, তেমনি সামাজিক অনৈতিকতা। এর নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার সীমা-পরিসীমা নেই। এর সীমা দেশকাল ছাড়িয়ে। স্বভাবতই বাংলাদেশও এই কালো তালিকার বাইরে নয়। বরং একপর্যায়ে এর বাড়বাড়ন্ত অবিশ্বাস্য মাত্রায়।

‘পাচার’কে বহুমাত্রিক বলেছি শুধু এই কারণে নয় যে এতে জড়িত নারী ও শিশুপাচার, মুদ্রাপাচার, বেশ কিছুকাল থেকে ‘মানবপাচার’, ঐতিহ্যবাহী মাদকপাচারের ভয়াবহতা; এর সঙ্গে চোরাচালান, চোরাকারবারি শব্দ দুটিও দীর্ঘদিন থেকে জড়িত, যেখানে খুন-নির্যাতন অবধারিত ঘটনা।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা এদের নিষ্ঠুরতার শিকার। অনেক দিন আগের কথা। তবু বেশ মনে পড়ছে, যশোরের সাংবাদিক শামছুর রহমান (কেবল) খুন হলেন চোরাকারবারিদের কর্মকাণ্ড ফাঁস করতে গিয়ে। সাহসী সাংবাদিক ছিলেন তিনি।

ব্যাপক ও বহুবিচিত্র এই পাচারের পেছনে থাকে সন্ত্রাসী-অপরাধী চক্র, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাফিয়া সিন্ডিকেট; নেপথ্যে সমাজের প্রভাবশালী, বিত্তবান ব্যক্তি বা প্রতাপশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সমাজের যে অংশ অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িত হয়ে বিত্তবৈভবের পাহাড় তৈরি করে, তারাই এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের নেপথ্য নায়ক, প্রায়ই আন্তর্জাতিক চোরাচালান ও বহুমাত্রিক পাচারের সঙ্গে যুক্ত। তারা মহাশক্তিমান সংঘশক্তি।

নারীপাচারের মতো ভয়ংকর ব্যবসা বহুদিন থেকে চলে আসছে। বিয়ের প্রলোভন, চাকরির প্রতিশ্রুতিসহ বহুবিচিত্র উপায়ে কতশত তরুণীর জীবনে নিয়মিত সর্বনাশ ঘটে চলেছে তার কোনো হিসাব নেই। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতরা এই নারী বাণিজ্য তথা তরুণী বাণিজ্য বন্ধ করতে পারেনি। এর মধ্যে কিছুদিন নতুন উপদ্রুব তৈরি হয়েছিল শিশুপাচার এবং সেই সঙ্গে কিডনি ব্যবসা।

তবে গত কয়েক দশক থেকে মাদক চোরাচালানের যাত্রাপথ পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ মাদকের ঘোর চক্করে পড়ে। বাংলাদেশ শুধু মাদকের আমদানি-রপ্তানির যাত্রাপথ হয়েই শেষ হয়নি, বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের অংশবিশেষ মাদকের বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত। বাদ যায় না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে বস্তিবাসী তরুণ।

দুই.

স্বাধীন বাংলাদেশে তার অর্থনৈতিক উন্নতি এবং শ্রেণিবিশেষের অবিশ্বাস্য ‘ভার্টিক্যাল’ সমৃদ্ধির কারণে কিছুদিন থেকে এখানে ‘ধনী-অতি ধনী’ শব্দ দুটি আমাদের লেখকদের খাতায় উঠে এসেছে। এখানে ব্যবসায়ীকুল থেকে রাজনৈতিক ভুবনের বিশিষ্টজনও অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বায়নের যুগে এরা নিজদের ‘বিশ্বনাগরিক’ রূপে ভাবতে অভ্যস্ত।

আসলে বিষয়টি মননশীলতার দিক থেকে নয়, ভোগবিলাসিতা, অপরিমিত ব্যয়ের অস্বাভাবিক আচরণের বিচারে সত্য। সত্য আরো একাধিক কারণে। তাই এই শ্রেণির বেশির ভাগেরই দ্বিতীয় বসতিস্থান বিশ্বের সর্বাধিক উন্নত ও বিত্তবান দেশে। আর সেই সঙ্গে সেই সব দেশের ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয়। অর্থাৎ এককথায় অর্থপাচার-মুদ্রাপাচার।

কিছুদিন আগে সংবাদপত্রে একটি খবর পড়ে চমকাইনি, বরং এটাই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। খবরটি ছিল সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের অর্থ সঞ্চয় নিয়ে। এটা নিয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। অর্থাৎ কেন, কিভাবে এত বাংলাদেশি নাগরিকের এত অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা হলো, সে সম্পর্কে কোনো প্রকার তদন্তের প্রশ্ন দেখা দেয়নি। অথচ মুদ্রাপাচার নিয়ে বিশেষ কোনো ঘটনা উপলক্ষে মাঝেমধ্যে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি হতে দেখা যায়।

শুধু সুইস ব্যাংকই নয়, আজকাল সমাজসচেতন নাগরিকদের মুখে মুখে আলোচিত হতে শোনা যায়—কোন কোন দেশ আমাদের ওই ধনী-অতি ধনীদের দ্বিতীয় ভুবন, যা মুদ্রাপাচারের কেন্দ্রস্থল। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, দুবাই, কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশের নাম শোনা যায়। আর এ বিষয় নিয়ে চলে সরস আলোচনা।

দিনকয় আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ একটি দৈনিকে লেখা নিবন্ধে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন এমন শিরোনামে—ওরা ‘কার টাকাপয়সা পাচার করছে?’ এ মূল প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা কম হলেও পাচারের টাকা কোথা থেকে আসে, কিভাবে আসে, কোথায় যায়, কোন সূত্রে যায়—সেসব কথা মোটামুটি বিশদভাবেই বলা হয়েছে। এমনকি টাকা গচ্ছিত রাখা দেশগুলোর নাম কোনোটা বাদ পড়েনি।

তাঁর আলোচনা সূত্রেই প্রশ্ন, পাচারের টাকা যদি দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে এসে থাকে, তাহলে তা বন্ধ করা কি খুবই কষ্টকর? যদিও পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনা অসম্ভবই প্রায়। আর বলা বাহুল্য, ওই টাকা কার? সে প্রশ্নের জবাব একটাই—জনগণের। শাসনযন্ত্রের কড়াকড়ির অভাব, ব্যাংকিংয়ের সতর্ক নিয়ন্ত্রণের অভাব—এমন সব কারণে পাচার নির্বিঘ্নে সম্পন্ন। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব। দেশের স্বার্থ নষ্ট।

তিন.

যদি ধরে নেওয়া যায়, পাচারকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশেই থাকত, বিনিয়োগে লাগত, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করত, তাহলে কিছুটা হলেও বেকারত্ব হ্রাস পেত। পরিবর্তে এবং আরো একাধিক কারণে বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মহীন যুবক চরম হতাশায় বেপরোয়া হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজের তল্লাশে মূলত অবৈধ পথে বিদেশে যেতে গিয়ে মানবপাচারকারীচক্রের হাতে অসহায় শিকার হতো না। কিছুদিন আগেকার ট্র্যাজিক সংবাদ—২৬ বাংলাদেশি লিবিয়ায় ব্রাশফায়ারে নিহত। খবরটি রাজধানীতে বেশ তোলপাড় করা আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল, দৈনিক পত্রিকার পাতা দিনকয় আগে সে খবরের নানা দিক তুলে ধরেছিল। অসাধু, অপরাধী-পাচার চক্রের হাতে পড়ে বিদেশে কর্মের আশায় বেরিয়ে ওদের প্রাণ গেল। এই ভয়ংকর ঘটনার তথ্য উদ্ঘাটন, পাচারচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি—কতটা কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।

আজকে আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল আলোচনায় মানবপাচারকে প্রাধান্য দেওয়া। কিন্তু এরই মধ্যে লেখা মুদ্রাপাচারেই অনেকটা নিয়ে নিয়েছে। তবু বলি, প্রদীপের নিচে অন্ধকার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পেছনে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য তথা বেকারত্বও এত গুরুতর সত্য যে বৈধ-অবৈধ নানা পথে বেকার যুবকদের চেষ্টা বিদেশে পাড়ি জমানো, যেন সেসব স্বপ্নের দেশে একবার পৌঁছাতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব চেষ্টার পরিণাম ট্র্যাজিক। মানবপাচারকারীচক্রের হাতে পড়ে কারো প্রাণ যায়, কেউ নির্যাতনের শিকার, কেউ সর্বস্বান্ত। কিছুদিন থেকে এ প্রবণতা খুবই বেড়ে গেছে। দৈনিক পত্রিকার খবর পড়ে তেমনই মনে হয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত দু-তিনটি মানবপাচার ও অর্থপাচারের চাঞ্চল্যকর ঘটনা দৈনিক পত্রিকার জন্য সুস্বাদু খাবার হয়ে উঠেছে। কারণ ঘটনার নায়করা উঁচু ডালের বাসিন্দা। যাই হোক, শুরুতে আমরা একটু ছোট মাপের ঘটনার কথাই উল্লেখ করি। একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘মানবপাচারকারীচক্রের হোতাসহ গ্রেপ্তার ৩’।

সৌভাগ্যক্রমে ভিয়েতনামফেরত ১১ জন বাংলাদেশির তথ্য সূত্রে র‌্যাব রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে পাচারকারীচক্রের হোতাসহ সংশ্লিষ্ট তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পূর্বোক্তদের তথ্য মতে, ‘ভিয়েতনামে মানবেতর জীবন যাপন করছেন আটকে পড়া ২৭ জন বাংলাদেশি। কী হবে এদের? সংগ্রামী ভিয়েতনামিদের দেশে অবৈধভাবে গিয়ে এখন চরম দুর্দশায় বেকার বাংলাদেশি।

বাংলাদেশে পাচারের ক্ষেত্রে আপাতত অর্থ ও মানবপাচার এত শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে যে এ নিয়ে প্রায়ই সংবাদপত্রে চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশিত হয়। এ দীর্ঘ তালিকায় না গিয়ে দু-একটি ঘটনার উল্লেখই পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচারের জন্য যথেষ্ট।

একটি দৈনিকে পরিবেশিত মোটা হরফে সংবাদ শিরোনাম : ‘প্রভাবশালীরা জড়িত/বাড়ছে অর্থপাচার’। এর সঙ্গে অপেক্ষাকৃত ছোট হরফে সংবাদ : গোপনে বিদেশে টাকা যাচ্ছে পাঁচ কারণে’। আমরা আপাতত এই পাঁচকাহনে যাচ্ছি না স্থানাভাবের কারণে। কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না বাংলাদেশ কিভাবে নিঃস্ব হচ্ছে? সম্ভাব্য ‘সোনার বাংলা’ কোন অবাঞ্ছিত পরিণামের দিকে এগিয়ে চলেছে।

দ্বিতীয় খবরটি আরো গুরুতর : ‘মানবপাচারের অভিযোগে যুবলীগ নেতা গ্রেপ্তার’। কিন্তু এ ঘটনা তো কুয়েতি ঘটনার তুলনায় সিন্ধুতে বিন্দু মাত্র। তাই কি দৈনিকে খবর : ‘এক মাস ধরে কুয়েতের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অপেক্ষা’। পাশাপাশি খবর : ‘দ্বৈত নাগরিকত্বের আড়ালে পাচার’। বস্তুত এসব খবর জলে ভাসমান বরফের দৃশ্যমান অংশ মাত্র।

তাই আমাদের প্রত্যাশা, দেশের স্বার্থে পাচারের এই দুই উৎস বন্ধ করতে অবিলম্বের ব্যাপক লাগাতার অভিযান চালানো দরকার এবং তা দল-নির্বিশেষে, যে কথা প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, ‘অপরাধী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ আমরা দেশের স্বার্থে সেটাই দেখতে চাই।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা