kalerkantho

সোমবার । ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭। ১০ আগস্ট ২০২০ । ১৯ জিলহজ ১৪৪১

বিসিএস হুজুগ কি অশনিসংকেত

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিসিএস হুজুগ কি অশনিসংকেত

সম্প্রতি বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ পাওয়ার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেশা বদলের বিষয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এই আলোচনা-সমালোচনার মূল প্রেক্ষাপট হলো বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকদের বিসিএস নিয়ে স্বপ্ন এবং যথেষ্ট মাতামতি রয়েছে। বাস্তবতা এখন এমন একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে স্কুলজীবন থেকেই শিক্ষার্থীরা বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেছে। অভিভাবকরাও তেমন প্রচেষ্টা শুরু করেছেন। ছোটবেলা থেকে মা-বাবা যে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী বানানোর স্বপ্ন দেখতেন, তাঁরাও এখন ছেলে-মেয়েকে চিকিৎসাবিদ্যা-প্রকৌশলবিদ্যা পড়ালেও ভবিষ্যতে বিসিএসের একটি দাপুটে ক্যাডার চেয়ারে দেখতে চান। উল্লেখ্য, বর্তমান বাস্তবতায় দাপুটে ক্যাডার বলতে পুলিশ, প্রশাসন ও পররাষ্ট্রকে বোঝানো হচ্ছে।

আমাদের সামাজিক অবস্থা এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছে যে এখন শুধু সম্মান নয়, প্রতাপ কিংবা দাপটের বিষয়টিও মুখ্য হয়ে উঠেছে আমাদের সামনে। যাঁরা এমবিবিএস কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও তথাকথিত সম্মানী ও দাপুটে ক্যাডারে আসছেন তাঁরা মনে করছেন, এসব ক্যাডারে বিশেষ কিছু সুবিধা রয়েছে। তাই তাঁদের বিশেষায়িত ক্ষেত্র ছেড়ে এমন দাপুটে কিংবা প্রতাপশালী ক্যাডারে আসার ঝোঁক বাড়িয়ে দিয়েছেন। গত ৮ জুলাই কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত সম্পাদকীয় এবং ৭ জুলাই প্রকাশিত মূল প্রতিবেদন সূত্রে পেশা বদলের কারণ অনুসন্ধান তথ্যে জানতে পারলাম যে প্রশাসন, পুলিশ কিংবা পররাষ্ট্র ক্যাডারে চাকরির মূল্য বিশেষ ক্যাডারের চেয়ে অনেক বেশি। এমনকি তাঁদের পদোন্নতির ধারাবাহিকতাও থাকে। চাকরির শুরু থেকে তাঁরা নানা সুবিধা পান। বিশেষায়িত ক্যাডারে সেগুলো যথাযথভাবে পাওয়া যায় না। তা ছাড়া মর্যাদার পাশাপাশি প্রভাব-প্রতিপত্তির বিষয় তো রয়েছেই। বাস্তবতা এমন একটি পর্যায়ে এসেছে যে তাঁদের মেধা বেশি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। সে জন্য তাঁরা কিছুটা বাধ্য হয়েই পেশা বদলের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।

আমরা জানি, আমাদের দেশে যাঁরা সবচেয়ে মেধাবী তাঁরা মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। তাই বিসিএস পরীক্ষায়ও যে তাঁরা ভালো করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন এমবিবিএস কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা শিক্ষার্থী বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে যে চাকরি পাবেন, সেখানে তাঁর সেই বিশেষায়িত বিদ্যার প্রয়োগ ঘটানোর সুযোগ থাকে না বললেই চলে। একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, অর্থনীতিবিদ তৈরির জন্য আমাদের দেশ কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর পেছনে অনেক অর্থ ব্যয় করে থাকে। এরপর তিনি যদি তাঁর জ্ঞান স্বক্ষেত্রে কাজে না লাগান, তাহলে আমাদের জাতির জন্য তা দুর্ভাগ্যজনক। এতে আমাদের দেশ কিংবা সমাজ লাভবান হচ্ছে, নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ করছি যে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্তর অনেকটা বিসিএসমুখী হয়ে উঠছে। কারণ স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনার ভিত্তিতে কোনো শিক্ষার্থী ভালো চাকরির সুযোগ পান না। এ কারণে স্নাতক পর্যায়ের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীরা বিসিএস সিলেবাস আত্মস্থ করার চেষ্টা করে যান। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য হলো একটি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া, সে বিষয়ে জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান উন্নয়ন কিংবা জ্ঞানের সম্প্রসারণ। সুদূর দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে বিসিএস গাইড বই। ক্লাসের বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে লেকচার না শুনে, ক্লাসে মনোযোগ না দিয়ে বিসিএস গাইড পড়েন, সম্মান শ্রেণিতেও পড়েন, মাস্টার্সেও পড়েন, আবার পড়াশোনা শেষ করে পাঁচ বছর সেই একই বইগুলো পড়েন।

শিক্ষার্থীরা পঠিত বিষয়ের অর্জিত জ্ঞান, শিক্ষা বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করতে পারছেন না। তাহলে এই শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? কিছু ব্যতিক্রম থাকবে; কিন্তু গণহারে পেশা বদলের বিষয়টি কোনোভাবেই শুভ লক্ষণ মনে করছি না। লোকপ্রশাসন কিংবা সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রশাসনসংক্রান্ত বিষয়াদি—সরকার, রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে পাঁচ বছর পড়াশোনা করেন। আবার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা পররাষ্ট্রসংক্রান্ত বিষয়—পররাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে পাঁচ বছর পড়াশোনা করেন। তাহলে এ অর্জিত শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? বিসিএস সিলেবাসে যেখানে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, উচ্চতর গণিত, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক, বিজ্ঞান ও কম্পিউটার। মানবিক কিংবা কলা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা যেখানে গণিত, উচ্চতর গণিত, বিজ্ঞান ও কম্পিউটার এসব বিষয়ে কম অবগত। কারণ তাঁরা এসব বিষয় পড়েন না। কিন্তু বিজ্ঞান বিভাগ কিংবা মেডিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক লেভেল থেকে বিজ্ঞান, কম্পিউটার, গণিত পড়ে অভ্যস্ত। তাই তাঁদের বিসিএসে প্রবেশে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। আর অপেক্ষাকৃত মেধাবী হওয়ায় তাঁরা ইচ্ছামতো ক্যাডার চয়েস করতে পারছেন। এতে হোঁচট খাচ্ছেন মানবিক কিংবা কলা ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা।

তাহলে কি ধরে নেব, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও এই বিসিএসগামী জনস্রোতের জন্য দায়ী? বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজগুলোতে যে বিষয়গুলো পড়ানো হয়, তার অনেক বিষয়ের ব্যাবহারিক প্রয়োগ করার মতো কাজের সুযোগ এই দেশে যথেষ্ট পরিমাণে নেই। নিজের পঠিত বিষয়ে ভালো ফল চাকরির নিশ্চয়তা অনেকাংশেই দেয় না। এমনকি ইদানীং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। দেশের বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করে ফিরলেও ভালো কোনো সুযোগ আমাদের দেশ দিতে পারে না। এসব কারণেই শিক্ষার্থীদের মূল প্ল্যাটফর্ম হয়ে গেছে বিসিএস। আর বিসিএস ক্যাডারদের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্যের কারণে ইদানীং অনেক চিকিৎসক-প্রকৌশলী নিজেদের পেশা বদলে ফেলে পররাষ্ট্র, প্রশাসন কিংবা পুলিশে চলে যাচ্ছেন।

এই মুহূর্তে আমাদের দেশের কর্মসংস্থান পরিকল্পনাকে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। প্রভাব-প্রতিপত্তি, মর্যাদা, সম্মান এবং সুযোগ-সুবিধা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আবদ্ধ না রেখে এর যথাযথ প্রয়োগ ঘটালে এমন পেশা বদলের প্রবণতা কিছুটা প্রতিরোধ করা যেতে পারে। বিশেষায়িতদের অন্য পেশায় আসার প্রবণতা রোধ করতে না পারলে এর ভয়াবহ পরিণতি এই জাতির জন্য অপেক্ষা করছে। আমাদের দেশের বিসিএস পরীক্ষা পদ্ধতি আর বিসিএস হুজুগ দেশ ও জাতির জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনছে কি না সেটিও বিবেচনায় আনতে হবে। এখনই এসংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান দিতে না পারলে আগামী দিনের শিক্ষাযাত্রায় অশনিসংকেত বেজে উঠার শঙ্কা রয়েছে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা