kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

ফিলিস্তিন, সম্প্রসারণ ও মিথ্যা কাহিনি

রিমা নাজ্জার

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমার বরাবরই মনে হয়, মূলধারার গণমাধ্যমে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের খবরগুলোকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো না কোনোভাবে বিষয়টি ইহুদিবিদ্বেষ ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসে এবং মূল বিষয় থেকে আমরা দূরে সরে যাই। তবে এই যুক্তিহীন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আমরা ঠিক কতটা জানি? এ নিয়ে নেটফ্লিক্স বা আমাজন নাটক তৈরি করতে পারে। ফক্স নিউজ গত বছর যেমন করেছিল ‘দ্য লাউডেস্ট ভয়েস’ নামে।

এ ধরনের নাটক মানুষের দেখার সম্ভাবনা খুব কম। শুরু করলে এ কথা কানে আসতে সময় লাগবে না, ‘বিষয়টি খুবই জটিল’। বিষয়টি কতটা জটিল, তা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দিয়ে তাদের জমি দখল করা কি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অধিকার, নাকি সম্প্রসারণ নেহাতই একটি ‘নিরাপত্তা ইস্যু’? ইহুদি কলোনি এফরাতে ১০ হাজারের বেশি ইসরায়েলি বাস করে। দেশটির সরকারের মতো তাদেরও ধারণা, ফিলিস্তিনিদের এই জমি দখলের অধিকার তাদের ঈশ্বরই দিয়েছেন। প্রয়োজনে ফিলিস্তিনিদের খেদিয়ে এই জমির ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কয়েক দিন আগে এনপিআর চ্যানেলের খবরে বলা হচ্ছিল, দশকের পর দশক ধরে চলা ব্যর্থ আলোচনার পর মেয়র এখন এফরাত বসতিকে বৈধতা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন।

ওই প্রতিবেদনেই ইসরায়েলপন্থী কর্মী এবং জেরুজালেমের ভূগোল ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ড্যানি সেইডম্যান পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের এই সম্প্রসারণকে ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের অবৈধ সম্প্রসারণের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ‘সম্প্রসারণের পর হয়তো সেখানে কিছু ফিলিস্তিনি থাকবে। তাদের আমরা রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত করব। যেমন আমরা অতীতে পূর্ব জেরুজালেমে  করেছি।’

আমি এই চ্যানেলটিকে জানাতে চাই, ইসরায়েল সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রহীন মানুষে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে। ওই বছর ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৭৮ শতাংশ ফিলিস্তিনি এখন রাষ্ট্রহীন। অন্টারিওর ইউনিভার্সিটি অব গুয়েলফ-হামবারের মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক গ্রেগ শুপাকের লেখা ‘দ্য রং স্টোরিজ’ বইয়ে দেখানো হয়েছে কী করে ইংরেজিভাষী মূলধারার গণমাধ্যম ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনিদের সম্পর্কে ভুল তথ্য মানুষের সামনে পরিবেশন করছে। এই বইয়ে তিনি লেখেন, যুক্তরাজ্যের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদ ব্যবস্থায় ইসরায়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। সেই নিরিখেই ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সম্পর্ক গণমাধ্যমে উপস্থাপন করে তারা। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অর্থায়ন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ। মিলিয়নেয়ার ও বিলিয়নেয়ার গণমাধ্যমের মালিকরা এবং এসব জায়গায় যারা বিজ্ঞাপন দেয় তারা সবাই শাসক শ্রেণির অংশ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও এ কথাই সত্য। সাংবাদিক ও প্রদায়করাও সচেতনভাবে বা অজ্ঞাতেই বর্তমানে চলমান এই ব্যবস্থাকে বয়ে চলেছেন। ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের সংঘাতসংক্রান্ত কোনো খবর নিয়ে যখন এই সাংবাদিকরা কাজ করেন তখন তাঁরা ধরেই নেন, ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী হওয়া বা রাষ্ট্রহীন হওয়া বড় কোনো অন্যায় নয়। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যে দায়িত্ব পালন করছে তা অপরিহার্য এবং জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সর্বশেষ চুক্তিটি ফিলিস্তিনি নেতাদের দৃষ্টিতে ‘মঙ্গলজনক নয়’ এবং ‘অন্যায়’। ফিলিস্তিনের দীর্ঘকালীন নেতা হানান আশরাউয়ি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ন্যায়পরায়ণ মধ্যস্থতাকারী নয়। ইসরায়েল কতটা জায়গা দখল করছে প্রশ্ন সেটা নয়। মূল সংকট সম্প্রসারণটাই। আপনি কখনো সামান্য গর্ভবতী হতে পারবেন না। আপনি কখনো ছোট চোর বা বড় চোর হতে পারেন না। চোর চোরই। বিষয়টা অবৈধ।’

সম্প্রসারণের বিষয়টি অবশ্য ইসরায়েল নামের রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আলোচিত হচ্ছে। তারা ক্রমেই ফিলিস্তিনিদের জমি দখল বাড়িয়ে চলেছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ বাড়ছে, তাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার হার বাড়ছে। একটি বৃহত্তর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে জাতিগত নিধনের শিকার হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা।

সম্প্রতি অনলাইনে কানাডার এক তরুণ সাংবাদিক ডেভিড মাত্রাচ্চির নিবন্ধ পড়লাম, যার শিরোনাম ‘কানাডার গণমাধ্যমের বিধ্বংসী ইসরায়েলপন্থী পক্ষপাতের উন্মোচন’। তিনি লেখা শেষ করেছেন অনেকটা এভাবে, ‘ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও নির্যাতনের ওপর ভিত্তি করেই ইসরায়েল নামে বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যে রাষ্ট্রব্যবস্থা বর্ণবাদী। বহু ক্ষেত্রেই দেশটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করেছে। পশ্চিম তীরের বেশির ভাগ এলাকা এখন তাদের দখলে। এর মধ্য দিয়ে কার্যকরভাবে তারা ফিলিস্তিনের ধ্বংস সম্পন্ন করেছে। (কানাডার) গণমাধ্যম যেভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করে চলেছে, তা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদকে সমর্থন করার সমার্থক। এর দুটি অর্থ আছে, সাংবাদিকরা নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছেন না। একই সঙ্গে তাঁদের সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও তাঁদের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

লেখক : পশ্চিম তীরের আল কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা