kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

করোনাকালে জীবন ও জীবিকা

শেখর ভট্টাচার্য

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনাকালে জীবন ও জীবিকা

ইউরোপ-আমেরিকার উন্নয়নের রূপকথা সারা পৃথিবীতে উপকথার মতো ছড়িয়ে আছে। উন্নয়নশীল-উন্নয়নকামী দেশের মানুষ তাই ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনের সুরক্ষাব্যবস্থাকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। চীনের উহান প্রদেশ থেকে করোনা যখন ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে সর্বগ্রাসী থাবা বসাতে শুরু করল, সার্বিক উন্নয়নের মডেল হিসেবে খ্যাত এই দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে দেখল পৃথিবীর মানুষ। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়াকে একটি দেশের উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিচায়ক বলে গণ্য করা হয়। গড় আয়ুর উন্নত পরিসংখ্যান নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশের শাসকরা গর্ব অনুভব করেন এবং তা প্রকাশও করে থাকেন সব সময়। করোনা তার বিষাক্ত নীল ছোবলে ইউরোপ-আমেরিকার মানুষকে অদৃষ্টের কাছে তুলে দিয়েছিল প্রায়—এ রকম কথাও আমরা শুনেছি। আক্রান্তদের মধ্য থেকে ডাক্তাররা দৈবচয়নের ভিত্তিতে কম বয়সীদের বাঁচানোর চেষ্টা করে গেছেন আর নিরুপায় হয়ে বেশি বয়সীদের জীবনকে ছেড়ে দিয়েছেন মৃত্যুর দিকে। শুরুতে ভেন্টিলেটর, মাস্ক, রোগীদের সেবাদানের জন্য পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকের অভাব ছিল, স্বাস্থ্য বিভাগকে আমরা সার্বিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতেও দেখেছি।

আক্রান্ত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঘুরে দাঁড়াতেও দেখেছি আমরা। এতে তারা খুব একটা বেশি সময় নেয়নি। ঘুরে দাঁড়ানো মানে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের সম্পূর্ণ নিবেদন দিয়ে কাজ করার মাধ্যমে লাগাম টেনে ধরা। মন্ত্র ছিল—ট্রেস, ট্রেক, ট্রিটমেন্ট। পরীক্ষা করো, তার পেছনে লেগে থাকো, চিকিৎসা দাও। এই কৌশল ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে। এ রকম অপ্রস্তুত অবস্থায় আমেরিকাকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে। জীবনহানি ঘটেছে এখন পর্যন্ত এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষের। আক্রান্তের দিক থেকেও আমেরিকা সর্বোচ্চ, ৩০ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এ পর্যন্ত। আরো মূল্য দিতে হবে, শুধু আমেরিকাকে নয়, পৃথিবীর সব দেশ, সব অঞ্চলের মানুষকেই।

করোনা শিরোনামের গল্পের উপসংহারে হয়তো পৌঁছানো যাবে না শিগগিরই; কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এ বিশ্বাস এত দিনে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকদের হয়েছে। করোনা মানুষের জীবনকে চমকে দিয়েছে, থমকেও দিয়েছে কিছুটা। সারা পৃথিবীর নীতিনির্ধারকরা ব্যস্ত এখন ভারসাম্য রক্ষার খেলার কৌশল নির্ধারণে। কী রকম ভারসাম্য? ভারসাম্য নামের খেলার অংশীজন কারা, বিষয় কী? অংশীজন মানুষ, নীতিনির্ধারক ও করোনাযুদ্ধের সামনের ও পেছনের সারির যোদ্ধারা। আর বিষয়? বিষয় হলো জীবন ও জীবিকা। বিষয়টি ক্রান্তিকালের সব থেকে জটিল ও সংবেদনশীল। মিলিয়ন ডলারের প্রশ্নের উদ্রেক করেছে বিষয়টি পৃথিবীজুড়ে। মিলিয়ন যদিও এখন খুব ছোট অঙ্ক রাষ্ট্র কিংবা কালো-সাদা টাকা আয় করা মানুষের জন্য। তার পরও আমরা রক্ষণশীল মানুষের মতো বিষয়টির জটিলতা ও গভীরতা বোঝাতে মিলিয়ন ডলারের ওজনের সমতুল্যই বলব।

আমাদের সৌভাগ্য, বাংলাদেশ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার শুরু থেকে নীতিনির্ধারকরা চরম পন্থা অবলম্বন করেননি। আমাদের মানুষের সামনে ধাঁধা ছুড়ে দেওয়া হয়নি, বলা হয়নি বেছে নাও জীবন নয়তো জীবিকা। আমাদের দেশ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই জীবন ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষার জন্য তৎপর ছিল সরকার। অর্থনীতি সচল রাখার জন্য মানুষকে লাগামহীনভাবে ছুটে চলার পরোক্ষ উৎসাহ এসেছে নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে অনেকটা। আশ্চর্য হতে হয়, বাংলাদেশে যেখানে নিম্ন আয়ের অতি সাধারণ মানুষ নিজেকে রক্ষার জন্য মুখে অন্তত মাস্ক লাগিয়ে রিকশা চালাচ্ছে, ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করছে—সেখানে ইতালির রোমে উচ্চ আয়ের, উচ্চ মানের জীবনধারণকারী মানুষ মাস্কবিহীন বদনে রাজপথে নিশ্চিতে ঘোরাফেরা করছে।

অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখার ‘রাজনৈতিক চেষ্টা’র ফলাফল কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি হাতেনাতে। পরিকল্পনাহীন ভারসাম্য বিনাশকারী এ রকম পদক্ষেপের ফলাফল এখন দৃশ্যমান। আমেরিকায় দ্বিতীয় দফায় বিভিন্ন রাজ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এ মুহূর্তে আমেরিকায় অন্তত এক ডজন রাজ্যে সব কিছু খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা থমকে দাঁড়িয়েছে। রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়ার যে সিদ্ধান্ত ছিল, সে সিদ্ধান্তসহ ধাপে ধাপে অনেক কিছু খুলে দেওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল, সব কিছু এখন থমকে দাঁড়িয়েছে। এটি খুব পরিষ্কার, চরম পন্থা অবলম্বন করে করোনাযুদ্ধে বিজয়ী হওয়া খুব কঠিন। শুধু জীবন নিয়ে ভেবে জীবন রক্ষা করা যাবে না অথবা শুধু জীবিকা নিয়ে ভেবেও জীবন ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না। ভাবতে হবে সমন্বয় করে, ভাবতে হবে যুগপত্ভাবে। কারণ জীবন ও জীবিকা একটি আরেকটির ছায়া, বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবে না কোনোভাবেই।

বিশ্বের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি চীনসহ ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো এখনো মাতোয়ারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের নেশায়। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলো নিজেরাও লাগামহীন ইকোনমিক সুপারপাওয়ার হওয়ার প্রতিযোগিতায়। শুধু সুপারপাওয়ার হলেই চলবে না, হতে হবে সুপারপাওয়ার নাম্বার ওয়ান। পৃথিবীর সব দেশ সমীহ করবে, ভয় করবে—এতে নিয়ন্ত্রণ হবে জোরালো। এই আত্মঘাতী প্রতিযোগিতার নেশায় সুপারপাওয়ার হওয়ার দৌড়ে যারা মত্ত ছিল তারা ভুলেই গিয়েছিল, পৃথিবীটা শুধু মানুষের অধিকারযোগ্য নয়। উন্নয়নের মেগা মডেল কিংবা ডাইনোসর মডেল নিয়ে মানুষ যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন তাদের বিবেচনায়ই ছিল না প্রকৃতি ও পরিবেশ।

মানুষ আর মানুষের নীতিনির্ধারকদের সময় এসেছে প্রকৃতিকে কেন্দ্রে রেখে, প্রকৃতিকে বিবেচনার শীর্ষে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা করার। উন্নয়ন যদি প্রকৃতিবান্ধব না হয়, সবুজ অর্থনীতির যদি বিকাশ না ঘটে, তাহলে জীবন ও জীবিকা কখনোই স্থিতিশীল এবং উন্নয়নকে টেকসই করা যাবে না। জীবন ও জীবিকার ভারসাম্য রক্ষার জন্য আমাদের অবশ্যই পাশের দেশ শ্রীলঙ্কা এবং এশিয়ার আরেকটি সফল দেশ ভিয়েতনামের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে। নিজেদের অহংবোধকে মনে হয় কিছুটা হলেও পরিত্যাগ করতে হবে। অর্থনীতিকে যদি গতিশীল রাখতে হয়, তাহলে শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গনিরোধের সুস্পষ্ট কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন। সর্বোপরি জীবন ও জীবিকাকে সচল রাখতে হলে জীবনকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি জীবিকাকেও সুরক্ষা দিতে হবে। আমরা যদি তা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের ভবিষ্যেক আমরা অদৃষ্টের হাতে সঁপে দেব। সমুদ্রে জীবনতরি ভাসিয়ে কোথায় নোঙর ফেলব, তা হয়তো আমরা ঠিক করতে পারব না, ঠিক করবে অদৃষ্ট।

আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে কাজ করে যাবে। আমরা লড়াই করে যাব আমাদের মানুষের জন্য। প্রত্যাশায় থাকব, কুয়াশাচ্ছন্ন রাত কেটে যাবে, সোনালি ভোর হবে, যে ভোরে আমরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসব। জীবন ও জীবিকার একটি সুসমন্বয় আমাদের এই ক্রান্তিকাল পেরিয়ে যেতে সহায়তা করবে।

লেখক : উন্নয়ন গবেষক ও কলামিস্ট

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা