kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

কালান্তরের কড়চা

বাংলাদেশে এই রাজনীতির স্কুলের আবশ্যকতা কেন?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলাদেশে এই রাজনীতির স্কুলের আবশ্যকতা কেন?

আমার এই লেখাটি যেদিন কালান্তরের কড়চার পাঠকরা পাঠ করবেন, ঠিক সেদিন (মঙ্গলবার ১৪ জুলাই) লন্ডনের রেডিও ফোর থেকে একটি কথিকা প্রচারিত হবে। কথিকাটির শিরোনাম ‘দ্য পলিটিক্যাল স্কুল’। আলোচনাটি করবেন বিখ্যাত লেখিকা টিমানড্র্রা হার্কনেস। এই আলোচনা হতে যাচ্ছে খুবই বিতর্কমূলক। রেডিও ফোরে আলোচনাটি প্রচারিত হওয়ার আগেই টিমানড্রা হার্কনেসের বক্তব্য বিষয়টি মিডিয়ায় চলে এসেছে। কারণ এই পলিটিক্যাল স্কুল খোলার বিষয়টি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের উপদেষ্টা ডমিনিক কামিংসের খুবই পছন্দের। তিনি মনে করেন, ব্রিটেনের পলিটিক্যাল সিস্টেম বা রাজনৈতিক পদ্ধতি খুবই সেকেলে ও পুরনো হয়ে গেছে। এই পদ্ধতির র‌্যাডিক্যাল ওভারহল (বৈপ্লবিক পরিবর্তন) আশু দরকার।

ব্রিটেনের যে ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় পদ্ধতি এ পর্যন্ত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ অনুসরণ ও গ্রহণ করেছে, বাংলাদেশে যে গণতন্ত্রের (সংসদীয় গণতন্ত্র) নামে আমাদের সুধীসমাজ পাগল, সেই সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে গত শতকের মধ্যভাগে ফ্রান্সে জোরালো প্রশ্ন ওঠে। সংসদ ফ্রান্সে কার্যকারিতা হারিয়েছিল। অসংখ্য রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছিল ফ্রান্সে। সংসদে প্রতিটি দলের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁদের কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। ফলে ফ্রান্সে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। এই কোয়ালিশনের কোনো স্থিতিশীলতা ছিল না। তিন দিনে তিনটি কোয়ালিশন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ ও পতন বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

ফ্রান্সে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এমনভাবে নষ্ট হয়েছিল যে সে দেশে পুস্তক প্রকাশকরাও তখন আলাদা রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। সারা দেশে তখন অরাজক অবস্থা। এ অবস্থা দেখে ফ্রান্সের ‘লিবারেটর’ হিসেবে খ্যাত জেনারেল দ্যগলে তাঁর অবসরজীবন ত্যাগ করে রাজনৈতিকজীবনে ফিরে আসেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নািস জার্মানির দখল থেকে ফ্রান্সকে মুক্ত করার জন্য গেরিলা বাহিনী গঠন করে তিনি যুদ্ধ করেন। ফ্রান্সের মানুষের কাছে দ্যগলে সে জন্য একজন জাতীয় বীর। দল-মত-নির্বিশেষে সবার কাছেই তিনি অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তখনকার পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার এবং তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। তাঁর দাবি মানা হয়। তিনি ক্ষমতায় বসে ফ্রান্সে প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি প্রবর্তন করেন এবং গণভোটে নির্বাচিত হয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর প্রবর্তিত প্রেসিডেনশিয়াল গণতন্ত্র এখনো ফ্রান্সে বহাল রয়েছে এবং ফ্রান্সে দীর্ঘকাল ধরে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব বজায় আছে।

ব্রিটেন ও জাপানে সংসদীয় গণতন্ত্র স্থায়ী হওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, এই দুটি দেশেই ক্ষমতাহীন রাজতন্ত্র কায়েম রয়েছে। দুটি দেশেই একজন রাজা ও রানি রয়েছেন গণতান্ত্রিক রাজনীতির মাথায় ছাতার মতো। তাঁরা কখনো স্বৈরাচারী না হয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিপদে-সংকটে ছাতার কাজ করেন। তাঁরা দেশ দুটির সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক সংহতির প্রতীক।

এই ব্রিটেনেই ব্রেক্সিট নিয়ে বিতর্কে টোরি ও লেবার দুই দলই বিভক্ত। কয়েক দফা প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছে। বরিস জনসন পার্লামেন্টের ক্ষমতার অবমাননা করেন এবং এর আগে তাঁর মন্ত্রিপরিষদের আস্থা হারানোর পরও ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন। নতুন নির্বাচন দিয়ে তিনি ক্ষমতায় থাকার পরও ব্রিটিশ রাজনীতি অনিশ্চয়তার মুখে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ব্রিটেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের বেশির ভাগ উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করে। তাদের মধ্যে ভারত ছাড়া বেশির ভাগ দেশের শাসকরাই অল্প দিনের মধ্যে বুঝতে পারেন, স্বাধীনতা লাভের পরপরই দেশে যে অরাজক অবস্থা থাকে, তাকে দূর করা এবং জাতীয় সংহতি দৃঢ় করার জন্য সংসদীয় গণতন্ত্র কার্যকর পদ্ধতি নয়। তাঁরা দ্রুত প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতিতে চলে যান। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতির সুযোগ নিয়ে স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হন। ফ্রান্সের দ্যগলের প্রেসিডেনশিয়াল গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করেননি। তাঁদের অনেকেরই পতন হয়েছে শোচনীয়ভাবে।

তবে বেশির ভাগ আফ্রো-এশিয়ান নেতা, যেমন—সুকর্ণ, নাসের, এনক্রুমা, মুগাবে প্রমুখ দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর সেই স্বাধীনতা দেশি শত্রুদের কাছ থেকে মুক্ত রাখার জন্য জাতির অভিভাবকত্ব গ্রহণের স্বার্থে দ্রুত পার্লামেন্টারি পদ্ধতি ছেড়ে দিয়ে প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তি তাঁদের ডিক্টেটর আখ্যা দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালিয়েছে। বলেছে, তাঁদের শাসন কর্তৃত্ববাদী। এই অপবাদ দিয়ে তাঁদের অনেককে হয় হত্যা, না হয় ক্ষমতাচ্যুত করেছে। তারপর যে তাঁবেদার শাসকদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছে, তাঁরাই ছিলেন প্রকৃত স্বৈরাচারী, যেমন—বাতিস্তা, মার্কোস, রেজা শাহ, আইয়ুব খান, জিয়াউর রহমান প্রমুখ। তাঁরা দেশের মানুষের ওপর অত্যাচার করেছেন। আবার দেশের স্বার্থ ও স্বাধীনতা বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে বিক্রি করেছেন।

পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি বা সংসদীয় গণতন্ত্রেও কোনো কোনো প্রধানমন্ত্রী কৌশলে অথবা ব্যক্তিত্বের জোরে সর্বময় ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়েছেন। যেমন—মার্গারেট থ্যাচার ও ইন্দিয়া গান্ধী। নামে সংসদীয় গণতন্ত্র, কাজে তাঁরা একনায়কসুলভ আচরণ করতেন। এ জন্য এই দুজনের গভর্নমেন্টকেই বলা হতো ইলেকটিভ ডিক্টেটরশিপ। ইন্দিরা গান্ধী, মার্গারেট থ্যাচার, এনক্রুমা, নাসের, মুগাবে প্রমুখ ছিলেন কর্তৃত্ববাদী। কিন্তু এই কর্তৃত্ববাদ তাঁদের নিজ নিজ দেশের জন্য মঙ্গলজনক ছিল। যেমন বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সংসদীয় শাসন। তিনি গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী হয়েও কিছুটা কর্তৃত্ববাদী না হলে দেশের স্বাধীনতার শত্রু ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে হটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গঠিত বাংলাদেশকে ধরে রাখতে পারতেন না।

আমি সংসদীয় গণতন্ত্র পছন্দ করি। কিন্তু যে দেশে জনসমাজ যথেষ্ট শিক্ষিত নয় এবং নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় মৌল আদর্শ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নয়, সে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র নিজেকেই রক্ষা করতে পারে না। প্রমাণ বাংলাদেশ, প্রমাণ পাকিস্তান। এ ক্ষেত্রে মার্গারেট থ্যাচার বা নেহরু ও ইন্দিরার মতো কর্তৃত্ববাদী নেতা থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্র রক্ষা পেতে পারে।

বর্তমান ওয়েস্টমিনস্টার ধরনের সংসদীয় গণতন্ত্রের বয়স প্রায় হাজার বছর। আমি ম্যাগনাকার্টার সময় থেকে এই বয়সটা ধরেছি। হাজার বছরে এই গণতন্ত্রের অনেক রীতিনীতি পাল্টে গেছে, অকার্যকর হয়ে গেছে। ব্রিটেনে তাই টোরি পার্টির মতো রক্ষণশীল দলের এক উপদেষ্টাও বর্তমান সংসদীয় গণতন্ত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেছেন। ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশেও রাজনৈতিক পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তন ও সংস্কারের সঙ্গে রাজনীতিকদের পরিচিত ও অভ্যস্ত করার জন্য রাজনৈতিক স্কুল খোলার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

ব্রিটেনে এই রাজনৈতিক স্কুল খোলার আলোচনার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। আমাদের একটি সুধীসমাজ

(civil society) আছে, যারা গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করে। কিন্তু আমাদের দেশকে কিভাবে গণতন্ত্রের জন্য উপযোগী করে তোলা যায় অথবা গণতন্ত্রকে কী করে আমাদের দেশের উপযোগী করে তোলা যায় সে সম্পর্কে তাদের কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। অথচ রাজনীতি সম্পর্কে আলোচনা ও পর্যালোচনার নামে গোলটেবিল বৈঠক করার জন্য বিদেশ থেকে বহু টাকা আনে।

আমাদের দেশে রাজনৈতিক শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষণার জন্য নয়, শুধু রাজনীতি যাঁরা করতে চান, তাঁদের রাজনীতি শেখানোর জন্য রাজনৈতিক স্কুল প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। সে স্কুলে আমাদের বর্তমান মন্ত্রী-এমপিদের বেশির ভাগ ভর্তি হলে ভালো করবেন। তাহলে রাজনীতিতে তাঁদের শিক্ষা বাড়বে, এমপি-মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা বাড়বে। সংসদে ঢুকে বর্তমান এমপি ও মন্ত্রীদের বেশির ভাগের কথাবার্তা শুনে, আচরণ দেখে কাউকে হতাশ হয়ে ফিরতে হবে না।

পার্লামেন্টে যোগ্য পার্লামেন্টারিয়ান না থাকলে সে পার্লামেন্ট জীবন্ত পার্লামেন্ট হয় না। সুষ্ঠুভাবে আইন প্রণয়ন ও সুষ্ঠু আইনের শাসন দেশে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। শেখ হাসিনা যতই বিজ্ঞ রাজনীতিক হোন, একা কী করবেন? দেশ ভরে গেছে অযোগ্য ও অর্ধশিক্ষিত মানুষে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষাদান করে না, শিক্ষিত লোক তৈরি করে না, শিক্ষা বিক্রি করে। শেখ হাসিনাকে তাঁর এমপি-মন্ত্রী বাছাই করতে হয় এই তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মধ্য থেকে। আমি তাঁদের সবাইকেই অযোগ্য বলছি না। গড়পড়তা কথা বলছি। দেশে তাই যোগ্য মন্ত্রীর অভাব। তাঁরা করোনা মহামারি আসার সংকেত পেলেও ব্যবস্থা গ্রহণে যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারেন না।

সেদিন আমার বয়সী এক বন্ধুর সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ হচ্ছিল। তিনি বললেন, এখন আর সংসদে দর্শক গ্যালারিতে গিয়ে বসি না। প্রধানমন্ত্রী আমার গণনার বাইরে। তারপর আর কোনো পার্লামেন্টারিয়ান দেখি না, যাঁর আলোচনা বা পারফরম্যান্স দেখে তৃপ্ত হব। আগে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পর সবেধন নীলমণি তোফায়েল আহমেদ ছিলেন। কথাবার্তা শুনলে মনে হতো, হ্যাঁ, পার্লামেন্টারিয়ান বটে। এখন তিনিও নিশ্চুপ বলা চলে। মনে হয়, এই সংসদের মান অনেক নিচে নেমে গেছে।

ব্রিটেনে রাজনীতির স্কুল খোলার প্রস্তাব শুনে মনে উৎসাহ জেগেছে, বাংলাদেশেও এই স্কুল খোলা দরকার। বর্তমানের মন্ত্রী-এমপিরাও তাতে ভর্তি হতে পারবেন। ভর্তি হলে আমাদের সংসদের মান আবার উঁচু হবে। এ সম্পর্কে আমাদের সুধীসমাজ কী বলে, অথবা কী ভাবে? ড. কামাল হোসেন ও তাঁর স্বগোত্রীয় সুধী যাঁরা আছেন এই রাজনীতির স্কুলে মাস্টারি করে ছাত্রদের গণতন্ত্রের সবকও দিতে পারবেন। সংবাদপত্রে আর গলাবাজি করতে হবে না।

দেশে রাজনীতির স্কুল খোলার বিষয়টি সরকারই ভালোভাবে ভেবে দেখুক। এই স্কুল খোলা হলে ভবিষ্যতে হয়তো কোনো প্রধানমন্ত্রীকে যোগ্য মন্ত্রী বাছাইয়ের জন্য সমস্যায় পড়তে হবে না।

 

লন্ডন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা