kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

খ্রিস্টান ভোট ট্রাম্পের বাক্সে পড়বে তো?

অনলাইন থেকে

১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরেঠারে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে বাইবেলই তাঁর প্রিয় বই। সেই প্রিয় বইয়ের ব্যাপারে আরো কিছু বলার জন্য যখন পীড়াপীড়ি করা হয়, তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টে ফেলেন এবং বাইবেলের কোনো নির্দিষ্ট অধ্যায় কিংবা স্তবকের কথা উল্লেখ করতে অস্বীকৃতি জানান। তার পরও যারা ধর্মে ট্রাম্পের মতিগতির হালচাল জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য রয়েছে ট্রাম্পের নিয়মিত টুইট। কৌতূহলীরা নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত সেসব টুইট থেকে নিজেদের আগ্রহের খোরাক মেটাতে পারবেন।

গেল সপ্তাহেই ট্রাম্প এক ক্যাথলিক লেখকের বক্তব্য নিয়ে টুইট করেছেন। ড. টেইলর মার্শাল নামের সেই ব্যক্তির লেখা বই বিক্রির শীর্ষে রয়েছে। রাত্রিকালীন এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এই লেখক দাবি করেছেন, (বর্ণবাদবিরোধী) বিক্ষোভকারীদের কারণে আমেরিকান খ্রিস্টধর্ম হুমকির মুখে পড়েছে। এই ক্যাথলিক লেখক ট্রাম্পের আরেক প্রিয়পাত্র আর্চবিশপ কার্লো মারিয়া ভিগানোর দলে তথা রক্ষণশীল ধর্মানুসারীদের অন্যতম প্রধান দলে ভিড়ে গেছেন। আর্চবিশপ ভিগানো পোপের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি তথা রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন। গত মাসে তিনি ট্রাম্পের উদ্দেশে এক খোলা চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে তিনি দাবি করেন, মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশ হেফাজতে আফ্রিকান আমেরিকান নাগরিক জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনায় গতি পাওয়া ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার শীর্ষক আন্দোলন উসকে দিয়েছে দেশের গোপন ষড়যন্ত্রকারীরা। পশ্চিমা খ্রিস্টান সভ্যতার ওপর হামলার অংশ হিসেবে এ আন্দোলন করা হচ্ছে, এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি। পাশাপাশি তিনি ‘অন্ধকারের সন্তানদের’ বিরোধিতা করার জন্য ট্রাম্পের প্রশংসা করেন। আর্চবিশপ ভিগানোর মতে, ‘অন্ধকারের সন্তানরা’ সামাজিক কাঠামো হুমকির মুখে ফেলছে। আর্চবিশপের প্রশংসাবাক্যের জবাবে ট্রাম্প টুইট করে বলেন, আর্চবিশপের চিঠির কারণে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন এবং তিনি আশা করছেন, ধার্মিক-অধার্মিক-নির্বিশেষে সবাই ওই চিঠি পড়বে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এমন চমৎকারভাবে ধর্মীয় ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফেলেন এবং দলত্যাগী আর্চবিশপদের পুনরাগমন যদি ঘটে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ট্রাম্পের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে ম্যানিশীয় (একধরনের ধর্মীয় মতবাদ)। তাঁর কাজই হলো রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে বিভাজনের বীজ বোনা এবং অনৈক্য সৃষ্টি করা। রহস্য উন্মোচনেও তাঁর ব্যাপক আগ্রহ আছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে উদ্বোধনী ভাষণে ‘আমেরিকান হত্যাকাণ্ড’ শব্দযুগল ব্যবহার করে সেই আগ্রহের প্রকাশ তিনি বেশ ভালোভাবেই ঘটিয়েছেন বটে। তবে বাইবেলের ব্যাপারে যে আগ্রহ তিনি দেখিয়েছেন, সেই আগ্রহ যেন তাঁর ভোটসংখ্যাকে হার মানিয়েছে। জরিপে তাঁর অবস্থান যেভাবে নিচের দিকে নামছে, তাতে তাঁর উপদেষ্টারা হিসাব করে দেখেছেন, দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে চাইলে তাঁকে অবশ্যই নিদেনপক্ষে সেই সব শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের সমর্থন অর্জন করতে হবে, যাদের সমর্থন পেয়ে চার বছর আগে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন। এটা জেনেশুনেই ট্রাম্প নির্বাচন সামনে রেখে ধর্মানুরাগীদের দিকে ঝুঁকেছেন।

ওই পন্থা ২০১৬ সালে কাজে দিয়েছিল। সে সময় শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যালদের ৮১ শতাংশ তাঁকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু এবার বোধ হয় ধর্মের সেই ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত জরিপ প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্পের প্রতি শুধু যে ইভানজেলিক্যালদের সমর্থন কমেছে তা-ই নয়, ক্যাথিলক আর অন্য সব খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সমর্থনও কমেছে। গত মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে সেন্ট জনস চার্চের সামনে প্রেসিডেন্টের নির্লজ্জ বাইবেলীয় আস্ফাালনও ভোটারদের সমর্থনের সেই ধস ঠেকাতে পারেনি।

মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়েছেন ক্যাথলিক জো বাইডেন। তিনি যদি নির্বাচিত হন, তবে তিনি হবেন জন এফ কেনেডির পর দ্বিতীয় ক্যাথলিক নেতা, যিনি হোয়াইট হাউসে অধিষ্ঠিত হবেন। ইভানজেলিক্যালদের মধ্যে বাইডেনের জনপ্রিয়তা হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। এ ছাড়া বাইডেনের ধর্মভীরুতায় মানুষের বিশ্বাসও আছে, যেটার বিচারে ট্রাম্পের ভুয়া বাগাড়ম্বর একেবারেই খাপ খায় না। আর করোনাভাইরাস মহামারি ও জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু-পরবর্তী পরিস্থিতি মিলে আমেরিকান রাজনীতির মোড় যে ঘুরে গেছে, সেই আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্ণবৈষম্য নিরসন আর ন্যায়বিচার ইস্যুতে জনমত উদারপন্থার দিকেই ঝুঁকছে। বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারে প্রায়ই খ্রিস্টানদের ক্ষমাশীলতা আর দয়াশীলতার কথা বলা হয়। এতে হয়তো কাজ হয়েছে। এভাবে তো আগে বলা হয়নি।

এখন থেকে শুরু করে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ট্রাম্প শিবির গর্ভপাত ইস্যুতে বিরোধী শিবিরকে ধরাশায়ী করার চেষ্টা চালাবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক যুদ্ধে খ্রিস্টান ধর্মকে যদি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে সেটার ফল বোধ হয় বর্তমান প্রেসিডেন্টের জন্য ধ্বংসাত্মক হতে চলেছে। আর্চবিশপ ভিগানো হয়তো ট্রাম্পের পক্ষ নিয়েছেন, বাকিরা কিন্তু বিশ্বাস হারিয়েছে।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : শামসুন নাহার

মন্তব্য