kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

দিল্লির চিঠি

ভারতকে বাংলাদেশের কাছ থেকেও শিখতে হবে

জয়ন্ত ঘোষাল

১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতকে বাংলাদেশের কাছ থেকেও শিখতে হবে

আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু রাজধানীতে একটানা ৩৩ বছর আছি একজন সংবাদকর্মী হিসেবে। অনেকেই আমাকে বলেন, নন-রেসিডেন্ট বাঙালি। তবে ভারতের বহু বাঙালির মতো আমিও বাংলাদেশকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি।

একজন মানুষকে ভালোবাসার এক অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সে মানুষটাকে জানা, জানার জন্য অনেক বেশি সময় দেওয়া। তার সাফল্যে খুশি হওয়া, তার অসফলতা-ব্যর্থতা-দুঃখে সমব্যথী হওয়া। একটা ভিন্ন দেশকে ভালোবাসাও ঠিক সে রকমই। সেই কোন ছোটবেলা থেকে এই দেশটাকে জানার চেষ্টা করতে করতে আজ এই ৬০ বছরে পৌঁছানোর লগ্নে উপলব্ধি করি, এই দেশের আয়তন এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। দেশটিতে মোট ৭০০টি নদী আছে, দ্বীপ আছে ২৯টি। ভাবা যায়! আমি সৌদি আরবের মতো দেশেও গেছি, যেখানে একটিও নদী নেই। কিন্তু বাংলাদেশ নামের দেশটি ১৯৭১ সালে কিভাবে জন্ম নেয় আর সেদিন থেকে আজ কী কী ভাবে নানা সমস্যায় জর্জরিত, কিভাবে কত রকম ষড়যন্ত্রের শিকার তা তো দেখছি আর দেখছি। দেখেই চলেছি।

করোনা আজ গোটা দুনিয়াকে এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। আমরা ভারতবাসীও এক চূড়ান্ত হতাশার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছি। এ রাতের তপস্যা নিশ্চয়ই দিন নিয়ে আসবে—এ আশায় বসে আছি। আবার সকালে উঠেই মোবাইলের অ্যাপস্টোর থেকে ডাউনলোড করে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো যখন পড়ি তখন দেখি প্রতিদিন এ দেশের মতো ঢাকায়ও কত মানুষ মারা যাচ্ছে এই অজানা ভাইরাসের আক্রমণে। বুঝতে পারি, শেখ হাসিনার সামনে এই চূড়ান্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এক মস্তবড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি আছে, জঙ্গি নাশকতার চেষ্টা আছে। করোনা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর আঘাত হানছে। তবু এসবের মধ্যেও যখন এক ভারতীয় ইংরেজি সংবাদপত্রে পড়লাম, বাংলাদেশ এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এখনো ভারতের চেয়ে ভালো করছে, তখন মনে হয় সব সময় নিরাশার চর্চা না করে এই সাফল্যের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে অভিনন্দন জানাই। এটা ঠিক, করোনার জন্য এই ব্যবসা বাংলাদেশে শতকরা ১৮ ভাগ কমে গেছে। তবু এবারের আর্থিক বছরেও এ রপ্তানি ভারতের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। ভারতের তৈরি পোশাক রপ্তানি এত খারাপ কেন? ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশনসের সায়ন রায় তাঁর একটি গবেষণাপত্রে বিশ্লেষণ করেছেন, বাংলাদেশের কোন কৌশল ভারতকে এই রপ্তানিতে এবারও পরাস্ত করল। বাংলাদেশ নাকি অনেক বেশি উৎপাদন করছে। দাম সস্তা রাখছে। আর টি-শার্ট ও সাধারণ জামা-কাপড়, যা নিত্যপ্রয়োজনীয়, তাতে জোর দিচ্ছে। বিশিষ্ট ভারতীয় সাংবাদিক টি এন নাইন্যান তাঁর ‘‘THE TURN OF THE TORTOISE’’ গ্রন্থে বলেছেন, ভারতে মাত্র তিন থেকে চারজন বড় বস্ত্র ব্যবসায়ী। তাঁরা গুণগত মানে জোর দেন বটে, কিন্তু এ দেশে আইন খুব অনড়। ডেলিভারি দিতে ন্যূনতম ৬৩ দিন লাগে। সেখানে ঢাকা ৫০ দিনের কমে মাল পাঠায়। বন্দরে কনসাইনমেন্ট আসতে ভারতে ১০ দিন লেগে যায়, ঢাকায় এক দিন। আর্থিক সমীক্ষা থেকে আরো জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মেয়েরা এই কাজে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ঘরে ঘরে বস্ত্র ব্যবসা। ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে বাংলাদেশের কাপড় যায়। ভারতকে বাংলাদেশের কাছ থেকে শিখতে হবে।

আরেকটি সুসংবাদ পড়লাম। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে পেট্রাপোলে বাণিজ্যের জট ছাড়ানো সম্ভব হয়েছে। বেনাপোল থেকে পেট্রাপোলে পাঁচটি ট্রাক এসেছে। বেনাপোল হয়ে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি গত এক সপ্তাহ বন্ধ ছিল। কারণ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, ভারতে তাদের ইমপোর্ট পারমিট চাই। বাংলাদেশের বক্তব্য একতরফা রপ্তানি হতে দেব না। আসলে করোনা আতঙ্কই এই সমস্যার কারণ ছিল। শেখ হাসিনার সরকার এ ব্যাপারে দিল্লিকে চিঠি দেয় এবং ৩ জুলাই থেকে উভমুখী আমদানি-রপ্তানি চালু করার দাবি জানায়। নরেন্দ্র মোদির হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত এই জট ছাড়ানো সম্ভব হয়েছে। এটা তো আনন্দ সংবাদ।

আসলে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ এক দেশ। তবে সামাজিক ও আর্থিক অসাম্যের জন্য জনসমৃদ্ধি যতটা হওয়ার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ—এই শব্দে বাংলা বর্ণমালার চারটি ‘জ’ আছে। প্রথম জ=জমি, দ্বিতীয় জ=জলা, তৃতীয় জ=জঙ্গল বা বন এবং চতুর্থ জ=জনমানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাত তাঁর বাংলাদেশে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গ্রন্থে এই চার জ-এর কথা উল্লেখ করে বলেছেন, বাস্তবতা হলো আমাদের দেশে জমি-জলা-জঙ্গলের সঙ্গে জনমানুষের সম্পর্কের সমীকরণে একটা বড়মাপের বিচ্যুতি আছে। এ সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়।

১৯৪৭ সালের পর ২৩ বছর পাকিস্তানের অপশাসনের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল বাঙালিকে। আবার ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যে স্বাধীনতা এলো তার পরও অর্ধশতক অতিবাহিত। আজ পাকিস্তান, এমনকি চীনও বাংলাদেশের এই বড়  ‘strategic position’’-এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ঢাকা ও শেখ হাসিনাকে বিশেষ মর্যাদা দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা এ ব্যাপারে সচেতন। তিনি তলাবিহীন ঝুড়িকে শক্তপোক্ত ভিত দেওয়ার চেষ্টা করবেন, এ তো স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে তিনি এখনো রাজি নন।

পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্ব পেল চীনা প্রতিষ্ঠান। এর আগে পাম সেতু নির্মাণেও চীনা ইঞ্জিনিয়াররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পায়রা বন্দরের জন্য এক হাজার ৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক প্রথম টার্মিনাল নির্মাণে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। টার্মিনালটি নির্মিত হবে বঙ্গোপসাগরের রাবনাবাদ নদের মোহনাঘেঁষা কলাপাড়ার লালুয়া ইউনিয়নের চান্দুপাড়া গ্রামের মূল বন্দর এলাকায়। ভারত-ভুটান-নেপাল-চীনের বর্তমান ভূমিকা উপলব্ধি করে এখন বাংলাদেশ নিয়ে বেশি সতর্কতা। তাই রান্নার গ্যাস সরবরাহের ব্যাপারে ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে একটা বড় চুক্তি করল। আবার পায়রা বন্দরের টার্মিনাল তৈরির কাজেও ভারত পরবর্তী পর্যায়ে যোগ দিচ্ছে।

ভারত-চীন সংঘাতের আবহে রোহিঙ্গা সমস্যাও এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে এত দিন আলোচনায় চীন ভোটও দিয়েছে। একটা প্যাসেজ তৈরি করে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর ব্যাপারে বাংলাদেশের পুরনো প্রস্তাব নিয়ে এবার কি এই সংঘাতের আবহে সক্রিয় হতে পারে। শেখ হাসিনার সরকার এ ব্যাপারে যে কূটনৈতিক চাপ ভারতের ওপর দিয়েছে, তা নিয়ে ভারত চিন্তাভাবনা শুরু করেছে।

বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার অনেক আগে ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর চীনের স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। চীন থেকে পালিয়ে চিয়াং কাইশেকের দল ফরমোজায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। প্রতিবছর ২ অক্টোবর চীনে শান্তি সম্মেলন হতো। তৃতীয় স্বাধীনতা দিবসে অর্থাৎ ১৯৫১ সালে বঙ্গবন্ধু চীন সফরে যান পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে। সেবার কলকাতা থেকে ভারতের প্রতিনিধি ছিলেন মনোজ বসু। তিনি সে সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা দেন আর শেখ মুজিবকে দেখে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরেন। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে আরো আছে যে সেদিনের শোভাযাত্রায় ছিল পাঁচ লাখ মানুষ; কিন্তু শান্ত ও সুশৃঙ্খল। তিনি মুগ্ধ হন আর লেখেন, বিপ্লবী সরকার জাতটার মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে নতুন চিন্তাধারা দিয়ে।

সেদিনের পাকিস্তানও নেই। নেই চীনও। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কও কি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে? সময় ও রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল—এই সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধুচন্দ্রিমা। ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি সম্পর্কে লেখক মওদুদ আহমদ তাঁর ‘বাংলাদেশ : এরা অব শেখ মুজিবুর রহমান’ ও সাংবাদিক এনায়েতউল্লাহ খান তাঁর সাপ্তাহিক হলিডে কাগজে কঠোর নেতিবাচক মনোভাব নেন। গণতন্ত্রে নানা মত থাকবেই। পরমতসহিষ্ণুতা দরকার। আমেরিকায় আজও হেনরি কিসিঞ্জার জীবিত। তিনি নিজেই সক্রিয় চীনাপন্থী মার্কিন কূটনীতিক বলে পরিচিত ছিলেন।

কিন্তু ভারত সরকারকে আজ বুঝতে হবে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পর্ককে টেকেন ফর গ্রান্টেড করা চলে না। চীন চীনের কাজ করছে। পাকিস্তান পাকিস্তানের কাজ করছে। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ভারতকে আরো সময় দিতে হবে। এ সম্পর্ক শুধু প্রেম-ভালোবাসা, ইলিশ আর রবীন্দ্রনাথের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এমন নয়। আমি কলকাতার বাঙালি। বাংলাদেশকে ভালোবাসি। কিন্তু সম্পর্কটা কলকাতা-ঢাকা নয়, দিল্লি-ঢাকা করতে হবে আরো বেশি বেশি করে। পেশাদারি বাস্তব চাহিদা পূরণের উভমুখী ভিত্তিপ্রস্তরের ওপর।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য