kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ও জনসম্পদ ভাবনা

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

১১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ও জনসম্পদ ভাবনা

আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৮৭ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটি হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘের উদ্যোগ সামনে আসে। সমগ্র বিশ্বকে একটি কাম্য জনসংখ্যায় পৌঁছানো এবং জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করার লক্ষ্যে ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই থেকে দিবসটি উদ্যাপিত হয়। কাম্য জনসংখ্যা একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ২০১২ প্রণীত হলেও কাম্য জনসংখ্যা পরিকল্পনা সামনে আসেনি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০১৯ সালের তথ্য মতে, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৮১ লাখ। মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.১ শতাংশ। ৫০ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ১০ কোটি ৪৭ লাখ।

২০১৯ সালের ১৭ জুন প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা ৭৭০ কোটি। আগামী ৩০ বছরে আরো ২০০ কোটি যোগ হয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে মোট জনসংখ্যা হবে ৯৭০ কোটি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের অন্য পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৮০৪ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ১০০ কোটি, ১৯২৭ সালে ২০০ কোটি, ১৯৫৯ সালে ৩০০ কোটি, ১৯৭৪ সালে ৪০০ কোটি, ১৯৮৭ সালে ৫০০ কোটি এবং ১৯৯৯ সালে ৬০০ কোটি। ২০১১ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০০ কোটিতে পৌঁছেছে। এই হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় এক হাজার কোটি এবং চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ ২১০০ সালে গিয়ে দাঁড়াবে এক হাজার ১০০ কোটিতে।

কেউ কেউ মতামত দেন, পৃথিবীর যা সম্পদ রয়েছে তা সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩০০ কোটি লোকের জন্য যথাযথ। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভাব একসময় পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিল। আবার জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে কৃষি বিপ্লব। বর্তমানে প্রযুক্তির বিকাশ ও উত্পাদন বৃদ্ধির কারণে সব মানুষের খাদ্যের সংস্থান তেমন সমস্যা নয়। সমস্যা বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ও পুঁজিবাদী অর্থনীতির একচেটিয়া আধিপত্য। এর ফলে অনেক সময়ই প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য মজুদের অভাবে নষ্ট হয়। হতাশার কথা হলো, খাদ্যাভাবে পতিত মানুষের কাছে যথাযথভাবে উদ্বৃত্ত খাদ্যও পৌঁছে না। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জাতিগত দ্বন্দ্ব, বিবাদ, জোরপূর্বক অভিবাসন ও প্রভাব বিস্তারের ফলে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রকৃতির ওপরও নির্যাতন বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা দুর্যোগও নতুন নতুন চিন্তার সৃষ্টি করেছে। সে কারণেও ধীরে ধীরে জনসংখ্যা কমিয়ে আনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিরাট অংশ তরুণ-কর্মক্ষম বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পর্যায়ের। এখানে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের বয়স ২৪-এর নিচে। এই যুব জনসংখ্যার হার অর্থনীতির জন্য বিশাল সুযোগ। কিন্তু বাংলাদেশের নির্ভরশীল জনসংখ্যাও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ। তাই নির্ভরশীল জনসংখ্যার হার কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু যুব জনসংখ্যা থেকে জনমিতিক লাভ (পপুলেশন ডিভিডেন্ড) পেতে হলেও জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা প্রয়োজন। সে বিষয়েও উদ্যোগ থাকতে হবে। সহজভাবে বললে, দক্ষ জনসম্পদই হচ্ছে রাষ্ট্রের মূল শক্তি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কারিগরি ভিত্তিতে বিশ্ব দ্রুত এগিয়ে চলছে। বিশ্বে খুব শিগগির চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ঘটবে। এ জন্য এই বিপ্লবের সঙ্গে মানিয়ে চলতে আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন করা দরকার। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে সরকার কাজ শুরু করেছে।’

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগত আলোড়ন মানুষের চিন্তার জগৎ, পণ্য উত্পাদন, সেবা প্রদান, এমনকি সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও অন্যান্য প্রযুক্তি জীবনমান নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তার করবে। এই শিল্প বিপ্লব বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পরিবেশ ও দক্ষতাকে আগে থেকে অনুমান করা অনেক কঠিন। তার পরও যথাসম্ভব এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। এটিও ঠিক, যে বিশ্বে রোবট বা প্রযুক্তি প্রতিনিয়তই আপডেট হচ্ছে, সে বিশ্বে আগামী দক্ষতার মানদণ্ড নির্ণয় করা অনেক কঠিন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন আলোচনায় আগামী দিনের জন্য প্রয়োজনীয় যেসব দক্ষতার কথা সামনে আসছে, সেগুলোর মধ্যে জটিল সমস্যার সমাধান, সৃজনশীলতা, জনব্যবস্থাপনা, অন্যদের সঙ্গে কাজের সমন্বয়, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, বৈচারিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দর-কষাকষি এবং চিন্তায় স্বচ্ছতার বিষয়গুলো অন্যতম।

সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে না পারলে একুশ শতাব্দীতে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ সবচেয়ে সংকটজনক অবস্থার জন্ম দেবে। দক্ষতার অভাবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে অনেক দেশের অদক্ষ জনগণ আস্তাকুঁড়ে পতিত হবে। বাংলাদেশের দ্রুত জনমিতির পরিবর্তনও প্রভাব বিস্তার করবে। তবে আশার কথা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে করোনা বিপর্যয়েও প্রযুক্তির সাহায্যে বাংলাদেশে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ই-গভর্ন্যান্স। বাংলাদেশের কৃষির আধুনিকীকরণ নিয়ে হরেক রকম বিরূপ মন্তব্য থাকলেও অনেক উন্নত রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশে খাদ্যপণ্য সংকট দেখা দেয়নি। তাই ধার করা কোনো প্যাকেজ বা পরিকল্পনা গ্রহণের আগে আমাদের লক্ষ্য নির্ধারণ ও সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সুপরিকল্পিত ও পূর্ণাঙ্গ পথকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। সেটি জনসংখ্যা কমানো হোক, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য হোক বা জনগণকে দক্ষ করাতে হোক।

আমাদের মনে রাখতে হবে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রস্তুতির জন্য দক্ষ জনশক্তি বা জনসংখ্যা কমানো অথবা রাষ্ট্রের জনগণকে দক্ষ করার মূূূল মাধ্যম হলো শিক্ষা। তাই শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষাক্রম নিয়ে নতুন করে ভাবনা জরুরি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্বও এ ক্ষেত্রে অত্যধিক। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ বা সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষাভাবনা ও বিনিয়োগ আরো বেশি করতে হবে। তবে অধিক সফলতার জন্য সব পরিকল্পনায়ই বাস্তবায়নসংশ্লিষ্ট এবং সুবিধাভোগীদের প্রতিনিধি পরিকল্পনা প্রণয়নেই সম্পৃক্ত রাখা প্রয়োজন।

 

 লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা