kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

এ লজ্জা আমাদের সবার

এ কে এম আতিকুর রহমান

১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এ লজ্জা আমাদের সবার

কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন পত্রিকায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একজন সদস্যকে নিয়ে লেখা হচ্ছে। আমরা, গোবেচারা পাঠকরা, করোনার এই ভয়াবহতার মধ্যে থেকেও ওই সম্মানিত সদস্যের কীর্তিকাহিনি অত্যন্ত আগ্রহসহকারেই পড়ে যাচ্ছি। মানবপাচার আর অর্থপাচার—এ দুটি প্রক্রিয়ার পদচারণ বাংলাদেশের সর্বত্রই ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে বলে মনে হয়। কারণ এসব কর্মকাণ্ডের নায়করা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী এবং ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত চতুর। জল, স্থল, অন্তরীক্ষ—সব স্থানেই জাল পাতা থাকে। এদের বধিবে এমন সাহস আর বুকের পাটার মানুষ কি কোনোকালেও এ দেশের মাটিতে জন্ম নেবে না?

মানবপাচার বা অর্থপাচার বাংলাদেশের অনেকেই করছে, কেউ ধরা পড়ছে বা কাউকে ধরা হচ্ছে, আবার অনেকেই ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে বা যেতে পারছে। কিন্তু কুয়েতে গিয়েই আলোচ্য সংসদ সদস্যের হয়েছে ‘বিধি বাম’। বাংলাদেশে কিছু না ঘটার ব্যবস্থা করতে পারলেও বিদেশে অর্থাৎ কুয়েতে তিনি সেটি করতে করতে আর পেরে উঠতে সক্ষম হননি। যে লোকগুলোকে তিনি সে দেশে পাঠিয়েছিলেন তাঁরাই শেষ পর্যন্ত এমন ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করবেন, এমনটি তিনি ভাবতেও পারেননি। আমরাও কি ভেবেছি? যাঁদের বিদেশে চাকরি দিয়ে নিয়ে গেলেন তাঁরাই তাঁর আসল রূপটি এমন নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিলেন? ক্ষমতা আর অর্থের জোর তাঁকে শেষরক্ষা করতে ব্যর্থ হবে, এ যে স্বপ্নেরও অতীত ছিল।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে এরই মধ্যে প্রকাশিত খবরাখবর থেকে জানা যায়, আলোচিত সংসদ সদস্য ১৯৮৯ সালে চাকরি নিয়ে কুয়েতে যান। ইরাক ১৯৯০ সালের আগস্টে কুয়েত দখল করে নিলে অন্য বাংলাদেশিদের মতো তিনিও দেশে ফিরে আসেন। তবে সাত মাসের মাথায় কুয়েত মুক্ত হলে তিনিও কুয়েতে ফিরে যান। এরপর ধীরে ধীরে তিনি মানবপাচারের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে থাকেন। আর হাতে প্রচুর অর্থ সমাগমের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতির মাঠে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেন। তারই কৌশল হিসেবে নিজ এলাকায় প্রচুর দান-খয়রাত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সাহায্য করতে থাকেন, যাতে মানুষের মুখে মুখে তাঁর নামটি উচ্চারিত হয়। আর যায় কোথায়—এত দিনের লালিত স্বপ্নের সেই সুযোগটি এসে গেল, ২০১৮ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে গেলেন। এমনকি তাঁর স্ত্রীকেও সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য বানিয়ে নিলেন। তিনি জানতেন, অর্থের খেলায় এ দেশে অনেক কিছুই সম্ভব। সেই খেলায় বিজয়ী হয়ে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

কোনো জামিনের ব্যবস্থা না হওয়ায় বর্তমানে ওই সংসদ সদস্য কুয়েতের জেলে আটক রয়েছেন। পরবর্তী শুনানির দিনও ধার্য করা হয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমি ওই সংসদ সদস্যকে নিয়ে কুয়েতের সংসদে যেসব বক্তব্য উপস্থাপিত হচ্ছিল তা শুনেছি। অত্যন্ত পীড়াদায়ক সেসব কথাবার্তা, যদিও বাংলাদেশের প্রতি সম্মান রেখেই তাঁরা বক্তব্য দিচ্ছিলেন। লজ্জায় মাথা নুয়ে আসছিল। এ লজ্জা নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত জল যে মহাসাগরেরও নেই। আমাদের অহংকার আর গর্ব—সবই আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ বাংলাদেশকে সম্মান করে আসছে। আজকে আমাদের একজন সম্মানিত সংসদ সদস্য এমনভাবে বাংলাদেশের সম্মানে কলঙ্ক লেপন করলেন যে সে দায়ভার তাঁর কাঁধে চড়িয়ে দিলেই কি আমরা সেই লজ্জা ঢাকতে পারব? জাতির কাছে এর উত্তর কে দেবে জানি না। আর কুয়েতে যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা কর্মরত রয়েছেন তাঁরা তাঁদের সহকর্মী বন্ধু অন্যান্য দেশের মানুষের কাছে মুখ দেখাতে লজ্জাবোধ করবেন না? যাই হোক, আগামী দিনে কুয়েতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে এ বিষয়টি যাতে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলতে না পারে সে জন্য এখনই আমাদের সতর্ক হতে হবে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, একজন বাংলাদেশের নাগরিক, তা-ও আবার সাধারণ নাগরিক নন, একজন সম্মানীয় সংসদ সদস্যকে কুয়েতের প্রশাসন আটক করল অথচ বাংলাদেশ সরকারকে বিন্দুমাত্র জানাল না। আমরা দেখে এসেছি যে বিদেশে যখনই বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে পুলিশ আটক করে সঙ্গে সঙ্গেই তা আমাদের দূতাবাসকে অবহিত করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কেন যে এমনটি হয়নি তা বোধগম্য নয়। আমি জানি না, আমাদের সরকার অর্থাৎ কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে কি না বা ঢাকায় কুয়েতের দূতাবাসের সঙ্গে এসংক্রান্ত কোনো যোগাযোগ করা হয়েছে কি না। উল্লেখ্য, ঘটনাটি অকস্মাৎ ঘটেনি, অনেক দিন থেকেই কিছু একটা খবর বাতাসে ভাসছিল। এই জানা-না জানার বিষয়টি আমাদের অবাক করে বৈকি।

বাংলাদেশ ও কুয়েতের গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ফেব্রুয়ারিতেই ওই সংসদ সদস্যের মানব ও অর্থপাচারের কাহিনি আমাদের সরকারের নজরে আসে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর এ বিষয়ে তদন্তে নামে। কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর সংসদ সদস্য স্ত্রী, কন্যা ও শ্যালিকার বাংলাদেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাঁদেরও তদন্তের আওতায় আনা হবে বলে আশা করি। উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি কুয়েতের একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যে মানবপাচারকাজে একজন সংসদ সদস্যসহ তিন বাংলাদেশির সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে এবং তাঁরা প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে কুয়েত নিয়েছেন, যা থেকে কমপক্ষে এক হাজার ৩৯২ কোটি টাকা পকেটে ভরেছেন। যেহেতু বিষয়টিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে, তাই ওই সংসদ সদস্য ছাড়া সংশ্লিষ্ট বাকি দুজনকেও খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয়। জানি না, ওই দুজন এর মধ্যেই দেশ থেকে পালিয়েছেন কি না। এ ছাড়া বাংলাদেশজুড়ে তাঁদের যে ‘অপারেশন নেটওয়ার্ক’ রয়েছে, সে বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে। প্রসঙ্গত না বললেই নয়, কুয়েতের যেসব নাগরিক এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাঁদের বিচার না হয় কুয়েত সরকার করবে, কিন্তু আমাদের দেশে তাঁর সহযোগীদের বিচারের ভার তো আমাদের ওপরই বর্তায়, তাই না?

এ মুহূর্তে কুয়েতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর তৎপরতা সম্পর্কে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানতে পারলেও কুয়েতে আমাদের দূতাবাস এ বিষয়ে এখনো অনেকটাই অস্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে বলে মনে হয়। অন্যদিকে কুয়েত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ হয়েছে কি না বা বিষয়টিতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কাঠামোতে কী করণীয় সেসবের কোনো অগ্রগতিই আমাদের জানা নেই। সর্বোপরি আলোচিত সংসদ সদস্য যে পরিবারের সদস্য অর্থাৎ জাতীয় সংসদেরই বা কতখানি উদ্বেগ রয়েছে এবং কী পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা-ভাবনা তাঁরা করছে তা হয়তো শিগগিরই জাতি জানতে পারবে। আমাদের বিশ্বাস, সংসদের পবিত্রতা অবশ্যই অমলিন থাকবে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা