kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

জলবায়ু সংকট সমাধানের নতুন সম্ভাবনা

অনলাইন থেকে

৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বৈশ্বিক মহামারির খবরাখবরের দিকে নজর রাখার মানে যেন জলবায়ু সংকটের দিকেই নজর রাখা। ভাইরাস কিংবা গ্রিনহাউস গ্যাস কোনোটাই সীমানা মানে না। ওই দুটিই সংকটকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আর এরা উভয়ই সর্বাধিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। সংকট উত্তরণে দরকার সরকারের বিপুল উদ্যোগ। উভয় দুর্যোগ সামাল দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার, চীন-আমেরিকার রশি টানাটানির কারণে তা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

সংকট দুটির মধ্যে মিল তো আছেই, এদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়াও আছে। অর্থনীতির চাকা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিপুল হারে কমেছে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আশা করছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের হার আট শতাংশ কম হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই হতে যাচ্ছে বার্ষিক সর্বনিম্ন হার।

তার পরও সত্যিটা হলো পরিবেশকে কার্বনমুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে। সেসব কাজ সমাধা হলে তবেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুসারে উষ্ণায়নের হার দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব।

বৈশ্বিক মহামারির কারণে স্বল্প খরচে কার্বনমুক্ত অর্থনীতি গড়ে তোলার এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ও একই সঙ্গে অনন্য এক সুযোগ আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির দাম মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় এ খাতে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণের ওপর নির্ধারণ করা যেতে পারে কর। এতে আগামী দশকজুড়ে যে আয় হবে, তা দিয়ে অর্থনীতি পুনর্গঠন করা সম্ভব। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি এরই মধ্যে নিদারুণ ক্লেশে পড়ে গেছে। কোমায় চলে যাওয়া সেই অর্থনীতিকে জলবায়ুবান্ধব করে তোলার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যেতে পারে অগ্রগতি।

প্রথমে আসা যাক কার্বনের ওপর কর নির্ধারণ প্রসঙ্গে। কার্বন নিঃসরণের ওপর কর নির্ধারণের জন্য সময়টা অত্যন্ত অনুকূল। এতে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যেতে পারে। কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মানুষ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকতে পারে। অতীতের তুলনায় এখন নবায়নযোগ্য শক্তি অনেক সুলভ। তাই স্বল্প চেষ্টায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পথে উত্তরণ ঘটতে পারে। কার্বনের ওপর কর নির্ধারণের মাধ্যমে এত অল্প সময়ে এত বড় ধরনের অর্জনের সম্ভাবনা এর আগে কখনোই দেখা দেয়নি।

কার্বন কর অর্থনীতিবিদদের কাছে যতটা জনপ্রিয়, রাজনীতিকদের কাছে ততটা নয়। কিন্তু রাজনীতিকদের কাছেও কার্বন কর জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সময় যে আসন্ন সেটার পূর্বাভাস মিলেছে বৈশ্বিক মহামারির আগেই। কার্বন করের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে ইউরোপ। চীন নিজেদের মতো করে বিষয়টি নিয়ে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আসন্ন নির্বাচনের প্রচারে কার্বন করের বিষয়টি তুলবেন। কার্বন কর কার্যকর করা হলে প্রথম দিকে এ খাত থেকে মোট জিডিপির এক শতাংশের বেশি আয় হতে পারে এবং পরবর্তী দশকগুলোয় আয়ের হার কমবে। ওই আয় জনকল্যাণে ব্যয় করা যেতে পারে অথবা সরকারের ঋণের ভার কমানোর কাজে লাগানো যেতে পারে।

কার্বন নিঃসরণের ওপর কর বসানোর মতো আরো অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এর মানে এই নয় যে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যে বিদ্যুত্চালিত গাড়ির জন্য অসংখ্য চার্জিং পয়েন্ট বসানো হবে, সুলভ মূল্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা জোরদার করার জন্য আরো বেশি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে, সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার বা সংযোজন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটানো হবে। চাইলেই সহসা বিশাল বিমানগুলোকে বিদ্যুত্চালিত করা সম্ভব নয়। কিছু কিছু খামারের ক্ষেত্রেও সেটা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে দরকার ভর্তুকি আর সরাসরি সরকারি বিনিয়োগ এবং এগুলোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ভোক্তা ও প্রতিষ্ঠান উভয়পক্ষের জন্য এমন সব প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যার ফলে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে উৎসাহ সৃষ্টি হবে।

মহামারিজনিত বিপর্যয় থেকে উত্তরণে কিছু সরকার অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এয়ার ফ্রান্সকে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ যেসব রুটে পরমাণু বিদ্যুত্চালিত দ্রুতগতির ট্রেন চালু আছে, সেসব রুটে যেন বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। নয় তো তাদের কর সুবিধা খোয়াতে হবে। সরকারের অর্থনৈতিক সহায়তা যেন কোনোভাবেই জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে না যায়, তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

কভিড-১৯ যে সহজাতভাবে জলবায়ুবান্ধব তা নয়। তবে সেটাকে জলবায়ুবান্ধব করে তুলতে হবে আমাদেরই। সেই লক্ষ্য দৃশ্যমান করে তুলতে হবে ২০২১ সালের মধ্যেই। কভিড-১৯ প্রমাণ করে দিয়েছে, অগ্রগতির যে ভিত্তি আমরা দাঁড় করাই, সেগুলো অনিশ্চিত। দুর্যোগ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, অবহেলাও করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। জীবন ওলটপালট করে দেওয়া তেমনই দুর্যোগ যেকোনো সময় আমাদের ওপর খড়্গহস্ত হয়ে উঠতে পারে।

 

সূত্র : ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : শামসুন নাহার

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা