kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

গড় আয়ু বৃদ্ধিতে প্রবীণদের কথা ভাবতে হবে

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গড় আয়ু বৃদ্ধিতে প্রবীণদের কথা ভাবতে হবে

সময়ের নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে মানুষ একসময় বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে। এ সময়টাকেই বার্ধক্যকাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তায় মানুষের কপালে ভাঁজ পড়ে। বিন্দু বিন্দু ফেলে আসা অতীতের সাক্ষী হয় সে। বেঁচে থাকার অবলম্বন খোঁজে সে। জীবনের ফেলে আসা দাপিয়ে চলা দিনগুলো বিবর্ণ হয়। যাদের কাছে মানুষটি একদিন মহামূল্যবান ছিলেন, তাদের কাছেই বোঝা হয়ে দাঁড়ান হয়তো বা। প্রয়োজনের ভালোবাসা অযত্ন আর অবহেলাকে উপলব্ধি করে। চোখের সামনে বেড়ে ওঠা চেনা মানুষগুলো কেমন যেন বদলে যায়। সবার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না তা নয়। তার পরও আজকের আধুনিক ও সভ্যসমাজে অনেকের সঙ্গেই এমনটি ঘটে থাকে। ভাবা যায় মানুষ কতটা স্বার্থপর। আপনজনরা কত স্বার্থপর। একটু আধুনিকতার রং মিশিয়ে আমরা এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের প্রবীণ হিসেবে চিন্তা করছি। তার পরও নিজেদের মনের প্রাচীনতাকে ত্যাগ করতে পারিনি। দু-একটা প্রথা ও বাস্তবতার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।

এমন একটি কল্পনাতীত কথা নৃবিজ্ঞানী কিম হিল আর ম্যাগদালেনা হার্টাডোকে বলেছিলেন, প্যারাগুয়ের পূর্বাঞ্চলের অ্যাচে নামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি।

‘প্রথা অনুসারে বৃদ্ধা মহিলাদের আমি হত্যা করি। তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে এই বড় নদীর তীরে। কিন্তু তাদের সমাহিত করার জন্য আমি সেখানে অপেক্ষা করিনি। নারীরা আমাকে দেখে ভীত হতো।’

আরেকজন নৃবিজ্ঞানী জ্যারেড ডায়মন্ড বলছেন, এ ধরনের অগ্রহণযোগ্য প্রথা শুধু অ্যাচে সম্প্রদায়ের ভেতরেই রয়েছে, বিষয়টি এমন নয়।

পাপুয়া নিউগিনির কুয়ালং সম্প্রদায়ের একজন নারীর স্বামী যখন মৃত্যুবরণ করতেন, তখন ছেলের প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে মাকে গলা টিপে হত্যা করা। কী নির্মম! ভাবা যায়।

হয়তো আমাদের সভ্যসমাজে এর প্রচলন নেই। তবে ভিন্নরূপে এই প্রাচীন ধারণা ও রীতি আমাদের সমাজের মধ্যে এখনো বিদ্যমান। প্রতিদিন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা মানুষগুলোর মনের মৃত্যু ঘটে। মনের মৃত্যু যে দেহের মৃত্যুর চেয়ে অনেক কঠিন, তা হয়তো আমরা এড়িয়ে যাই।

জাপানের মতো উন্নত একটি দেশেও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মনস্তাত্ত্বিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। জাপানের ৩৩ শতাংশ মানুষের বয়স ৬০ বছরের বেশি। এই বয়স্ক আসামিদের জায়গা করে দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে জাপানের কারা কর্তৃপক্ষের। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই আসামিদের একটা বড় অংশই স্বেচ্ছায় কারাবরণ করছে। কারাগারে যাওয়ার জন্য তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ছোটখাটো অপরাধ করছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হতে পারে, এমন একটি উন্নত দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাওয়ার পরও কেন প্রবীণরা এমন আচরণ করছেন। যেটা ইতিবাচক আচরণ হওয়ার কথা সেটা কেন নেতিবাচক আচরণে পরিবর্তিত হচ্ছে। হিরোশিমার একটি বাড়িতে বসবাস করেন ৬৯ বছর বয়সী তোশিও তাকাতা। ইচ্ছা করে আইন ভঙ্গ, বেশ কিছুদিন কারাগারে থাকার পর তিনি এখন মুক্তি পেয়েছেন। সরকারি নানা সুবিধার আওতায় তিনি এলেও বিনা পয়সায় থাকা-খাওয়ার একটা জায়গার কথা তিনি ভাবছিলেন। অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব তাঁর মধ্যে কাজ করেছে তা হলো কারাগারে থাকলে তিনি বিনা খরচে থাকতে পারবেন। কারাগারে থাকা-খাওয়ার খরচ নেই। এ ছাড়া তিনি সরকারের মাধ্যমে যে অবসরভাতা পেতেন তা-ও তাঁর কাছে জীবন ধারণের জন্য পর্যাপ্ত মনে হয়নি। এর সঙ্গে নানা ধরনের বিল দেওয়া থেকে নিস্তার পেতেও তিনি এই কৌশল গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণেই তিনি বারবার অপরাধ করে যাচ্ছেন।

বয়স্কদের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক কানিচি ইয়ামাদা মনে করেন, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দারিদ্র্যের কারণে জেলে যাওয়ার গল্প আসলে একটা অজুহাত। সমস্যার মূল হলো একাকিত্ব। তাঁরা মনে করছেন, জেলে থাকলে একাকিত্ব দূর করা সম্ভব। জাপানের পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন হওয়ায় বয়স্কদের মধ্যে এই অপরাধপ্রবণতা চালু হয়েছে। এটা যে শুধু আর্থিক কারণে হচ্ছে তা নয়, মানসিক কারণেও।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুসংক্রান্ত একটি সমীক্ষা এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশের (এমএসভিএসবি) এই সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭২.৩ হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষের আয়ু ৭০.৮ বছর ও নারীর আয়ু ৭৩.৮ বছর। সমীক্ষায় বলা হয় ২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৭২ বছর। ২০১৬ সালে ৭১.৬ বছর, ২০১৫ সালে ৭০.৯ বছর, ২০১৪ সালে ৭০.৭ বছর, ২০১৩ সালে ৭০.৪ বছর এবং ২০০৮ সালে গড় আয়ু ছিল ৬৬.৮ বছর। ২০১৮ সালে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ১৯ লাখ। ফলে জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। পুরুষের সংখ্যা বেড়েছে ৮ কোটি ২৪ লাখ ও নারীর সংখ্যা বেড়েছে আট কোটি ২২ লাখ। ২০১৭ সালে জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ২৭ লাখ। এর অর্থ প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। অনেক দেশে সরকার পরিবর্তনে ও বিভিন্ন ইস্যুতে নবীন ও প্রবীণরা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা পোষণ করছেন। রাজনীতিতে তরুণ ও প্রবীণ উভয়ের প্রভাব বাড়ছে। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও সেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হবে এটাই স্বাভাবিক। প্রথমত প্রবীণরা যে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন নেতিবাচক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানবিক সংকটে পড়ছে সে বিষয়টিতে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবীণদের ও নবীনদের স্বার্থের বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এর সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো একটি সাসটেইনেবল সুরক্ষাবলয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রবীণরা আমাদের দেশ ও সমাজকে অনেক কিছু দিয়েছেন, তার প্রতিদান তাঁদের দিতে হবে, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। এটি যাতে অবহেলা, একাকিত্ব ও হতাশা না হয়। প্রবীণদের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে তাঁদের কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য এনে সেটিকে সচল রাখতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় প্রবীণ কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠনের মাধ্যমে প্রবীণদের অধিকারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রবীণদের সুরক্ষায় আইন তৈরি করে তার বাস্তবায়ন ঘটানো। নবীন ও প্রবীণদের আমরা ভিন্ন শক্তি ও প্রতিযোগী হিসেবে দেখতে চাই না, বরং তাঁদের সমন্বিত শক্তিকে ব্যবহার করে দেশকে এগিয়ে নিতে চাই।

লেখক : অধ্যাপক ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা