kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

সাদাকালো

জয়ী হোক শুদ্ধ গণতন্ত্রীরাজ

আহমদ রফিক

৯ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জয়ী হোক শুদ্ধ গণতন্ত্রীরাজ

বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ইউরো-আমেরিকার একটি অবসেশনই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের স্তালিন আমলের শাসনকে ‘পুলিশি রাজ’ বলে সমালোচনা করা। এ নিয়ে অবশ্য দুই পক্ষে তর্কবিতর্ক কম ছিল না, আমরা সেসব বিতর্কে যাচ্ছি না; বরং বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় ‘পুলিশি রাজ’ নিয়ে প্রশ্ন উঠার জবাবে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, কৃষ্ণাঙ্গদের বা অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি পুলিশের আচরণ বিচারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি চরম ‘পুলিশি রাজ’। এ ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সঙ্গেও তুলনা চলে না যুক্তরাষ্ট্রের, বিশেষ করে তাদের শ্বেতাঙ্গ পুলিশ বাহিনীর। এরা সবার সেরা।

লেখক-কলামিস্ট হাসান ফেরদৌস প্রথম আলোতে একটি ছোট উপসম্পাদকীয়ের চমৎকার শিরোনাম দিয়েছেন : ‘পুলিশের কাজ কী’? তিনি তাতে যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত পুলিশি নিগ্রহ ও প্রাসঙ্গিক যুক্তিতথ্যের কথা লিখেছেন। কিন্তু তাঁর ওই শিরোনামীয় প্রশ্নের জবাবে আমি বলব, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই পুলিশের কাজ জনগণের সংগত দাবিদাওয়ার প্রতিবাদী মিছিলে বেধড়ক লাঠিপেটা করা, কখনো মিছিলে বা সমাবেশে গুলি চালিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সন্তষ্টি অর্জন, যদিও আইনি ভাষ্যে তাদের কর্তব্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রাচীন ভাষায় ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’। কিন্তু প্রায়ই এর বিপরীত কাজটিই তারা করে থাকে।

আর যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের প্রধান কাজ—নির্ধারিত কাজ ছাড়াও যত্রতত্র কৃষ্ণাঙ্গদের অকারণে ঠেঙ্গানো, হাঁটু দিয়ে গলা চেপে শ্বাস রোধ করে বা পাখির মতো গুলিতে তাদের হত্যা করা। কারণ তারা মনে করে, এটাই তাদের মূল কাজ এবং তাতে তাদের কোনো শাস্তি হবে না; বরং শাসকপক্ষে প্রশংসাই জুটবে।

গণতান্ত্রিক নামে কথিত এবং তেমন ধারায় রচিত সংবিধানের দেশগুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পুলিশি শাসনব্যবস্থাকে ‘পুলিশি রাজ’ ছাড়া আর কী নামে চিহ্নিত করা যেতে পারে। শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পুলিশি রাজের যোগ্য নায়ক। এটা তাঁর অভ্যন্তরীণ নীতির অন্তর্গত। আর তাঁর বিদেশনীতি তো চমৎকার একজন নািস যুদ্ধবাদীর, আগ্রাসনেই যাঁর আনন্দ।

দুই.

সময়টা এখন কিছু পরিমাণে হলেও রাজনৈতিক রক্ষণশীলতার পক্ষে। তা না হলে ট্রাম্পের মতো একজন বর্ণবাদী, যুদ্ধবাজ ও নৈরাজ্যিক চরিত্রের বৃহৎ ব্যবসায়ী কিভাবে হোয়াইট হাউসের সিংহাসনে বসতে পারেন, তা-ও আবার যুক্তরাষ্ট্রের জটিল চরিত্রের নির্বাচনে জয়ী হয়ে? এবং সম্ভাবনা দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ের।

অন্যদিকে সম্প্রীতির যৌথ ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে আসা ব্রিটিশ শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে ট্রাম্পের মতোই শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদকে উসকে দেওয়া রক্ষণশীল রাজনীতির ধারক বরিস জনসনই বা কিভাবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। চমকপ্রদ ঘটনা হলো বিদেশনীতি থেকে বহু কিছুতে ট্রাম্প-জনসনের সহমত পোষণ ও ব্যক্তিগত সহমর্মিতা।

এই অনুকূল আবহে হঠাৎ করে বিপরীত ঝোড়ো হাওয়ার ক্ষুব্ধ আবির্ভাব। প্রবল জনবিক্ষোভ সহিংস চরিত্রের। ঘটনা অবশ্য তাদেরই অর্থাৎ পুলিশি রাজেরই সৃষ্টি। এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার নির্যাতনে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের মর্মান্তিক মৃত্যু মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস শহরে। মৃত্যু নয়, হত্যাকাণ্ড।

পুলিশ প্রবরের মস্ত হাঁটুর চাপে শ্বাসরুদ্ধ ফ্লয়েড কোনো রকমে বলতে পেরেছিলেন, ‘আই ক্যান্ট ব্রিথ’। তবু কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার নেশায় উন্মাদ পুলিশ প্রবর ফ্লয়েডের গলায় হাঁটুরা চাপ আরো বাড়িয়েছিল, উদ্দেশ্য হত্যা, সব রকম নিয়ম-নীতি বিসর্জন দিয়ে, মানবিকতা তো দূর-অস্ত্।

এ হত্যাকাণ্ড অভাবিতভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদের বিস্ফোরণ ঘটায়, বর্ণ-নির্বিশেষে পুলিশি নিগ্রহের বিরুদ্ধে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলে। শহর থেকে শহরে, এক অঙ্গরাজ্য থেকে অন্য অঙ্গরাজ্যে, সারা যুক্তরাষ্ট্রে। এক লেখকের ভাষায়, মিছিলের স্লোগান হয়ে ওঠে শহীদী মর্যাদার জর্জ ফ্লয়েডের শেষ কথাগুলো। ‘আই ক্যান্ট ব্রিথ’ অবশ্য প্রতীকী তাৎপর্যে।

ট্রাম্প-জনসনদের সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থায় বাতাস এমনই অস্বচ্ছ ও ভারী হয়ে উঠেছে যে এখানে শুদ্ধ নির্মল বাতাস পাওয়া কঠিন, গণতন্ত্র শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায়। বিক্ষোভ-ভাঙচুর আটলান্টিক পার হয়ে ইউরোপে, বিশেষত ব্রিটেনে।

তিন.

আমাদের প্রশ্ন : প্রতিবাদ প্রকৃতপক্ষে কিসের বিরুদ্ধে? কৃষ্ণাঙ্গ যুবক হত্যা তথা বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, না পুলিশি রাজের নিগ্রহের বিরুদ্ধে (তা খতমের উদ্দেশে), নাকি বর্ণ-নির্বিশেষ গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নীতিগত দাবির পক্ষে? যেহেতু বিক্ষোভ-প্রতিবাদ একটি বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় এবং কোনো সুসংগঠিত নেতৃত্বে বা আদর্শের সংহতিতে নয়, তাই স্লোগানে, মতামতে ও তৎপরতায় ভিন্নতা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। এটাই বড় দুর্বলতা।

আমার তো মনে হয় সহজে সর্বজনগ্রাহ্য স্লোগান হতে পারত : ‘পুলিশি রাজ খতম করো/সুষ্ঠু গণতন্ত্র কায়েম করো।’ এটা বর্ণ-শ্রেণি-নির্বিশেষে সর্বজনীন চরিত্রের স্লোগান। সমাজব্যবস্থা বদলের প্রাথমিক পর্যায়, নিগ্রহ নির্যাতন থেকে মুক্তির পদক্ষেপ। ঘটনা উপলক্ষ মাত্র।

যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটরা অভাবিত এই বিক্ষোভ প্রতিবাদের সুযোগ নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপক সভাগুলোতে সংস্কারের লক্ষ্যে যেভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে, তা হওয়া উচিত গুণগতভাবে পরিবর্তনের পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ; শুধু তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ বা প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে নয়। দেশব্যাপী এ বিক্ষোভ রক্ষণশীল, বর্ণবাদী রিপাবলিকান রাজনীতিকে কোণঠাসা করার পক্ষে  কম শক্তিমান নয়, যদি একে যথার্থভাবে ব্যবহার করা যায়।

লক্ষণীয় ঘটনা, এরই মধ্যে পুলিশের গুলিতে আরেক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক হত্যা আটলান্টায়, এবারকার ঘটনা অবশ্য একটু ভিন্ন ধরনের। তবু এতে যথারীতি পুলিশ রাজের নির্মমতারই প্রকাশ ঘটেছে। এ ঘটনাকে স্থানীয় মেয়র সঠিক নয় বলে সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেছেন এবং ঘটনার জন্য দায়ী পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আশ্বাস দিয়েছেন।

এ ঘটনা চলমান প্রতিবাদ-বিক্ষোভে আবার খানিকটা জ্বালানি যোগ করবে মাত্র। আবার বিক্ষোভ, আবার কিছু মৃত্যু, তারপর একসময় স্তব্ধতা। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্রে একটি প্রগতিশীল চরিত্রের রাজনৈতিক দল গঠিত না হওয়া বা ডেমোক্র্যাট দলই তেমনভাবে পরিবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো সহজসাধ্য হবে না। এক-একটি মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে কিছুদিন ধরে সহিংস বিক্ষোভের আগুন জ্বলবে, অনেক মৃত্যুর বিনিময়ে জ্বলতে থাকবে, সাময়িক সাফল্যে—এই যা। অনেক ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হবে, লুটপাট, কিছু ধ্বংসাত্মক কাজ চলবে—ব্যস, এ পর্যন্তই।

চার.

যুক্তরাষ্ট্রে দেশজুড়ে অবিশ্বাস্য প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের অভিশপ্ত জীবনের কারিগর দাসপ্রথার নায়কদের মূর্তি ভাঙচুর এবং সেই সূত্রে ভাঙচুর বিখ্যাত বর্ণবাদীদেরও, যা শতাব্দী সঞ্চিত ক্ষোভের প্রকাশ। আর অভাবিত এ ঘটনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে পুলিশি রাজ সংস্কারের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে। কিন্তু নমনীয় সংস্কারে কোনো ফল হবে না, দরকার আমূল সংস্কার। এর পর সেই চিরায়ত উক্তি : ‘দড়ি ধরে মারো টান/রাজা হবে খান খান।’ যুক্তরাষ্ট্রে এখনো সেই দড়িটারই অভাব।

এবার ব্রিটেন প্রসঙ্গ। ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া ব্রিটেনকে এতটা স্পর্শ করবে, এটা অনেকের কাছে অভাবিত এবং বিস্ময়করও বটে। আপাতদৃষ্টিতে নমনীয় শাসনব্যবস্থার ব্রিটেনে ফ্লয়েড হত্যা উপলক্ষে বর্ণবাদবিরোধী, শুদ্ধ গণতন্ত্র দাবির বিষয়টি অনেকের হিসাবে মেলে না। কিন্তু বিস্ময়কর ঘটনা হলো এ উপলক্ষে দাসপ্রথার কথিত বীরদের মূর্তি ভাঙচুর, কিন্তু সেই সঙ্গে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ। বিস্ময়কর এ জন্য যে ব্রিটেনের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পূর্ব রমরমা অবস্থা তো বিশ্বজুড়ে উপনিবেশের কল্যাণে। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে কৃষ্ণ আফ্রিকা—সর্বত্র ধনভাণ্ডার লুট।

সেই সঙ্গে জঘন্য বর্ণবাদী বৈষম্য (বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকায়) এবং চরম অমানবিক আচরণ ও দমননীতি, যা পূর্বোক্ত পুলিশি রাজের প্রতিফলনবিশেষ—এসবেরই তো সুফল শিল্পোন্নত এবং শিক্ষা ও মননশীলতায় উন্নত জাতিরাষ্ট্র্র ব্রিটেন—সেই সঙ্গে কাটছাঁটের পরও যুক্তরাজ্য—স্মৃতিগন্ধবহ—‘রুল ব্রিটানিয়া, রুল’। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। সে প্রায়ই হিসাব মেলাতেও যথেষ্ট দক্ষ।

তাই শয়তান, দুর্নীতিবাজ, কিন্তু সাম্রাজ্য স্থাপনার ষড়যন্ত্রে অতীব চতুর ও বিচক্ষণ কম্পানির কেরানি ক্লাইভ লর্ড পদমর্যাদায় ভূষিত, সব কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর সেই পদবি নিয়ে টানাটানি। একদা গর্বের সেই মূর্তিও এখন অপসারণের দাবি বিক্ষোভকারীদের। অর্থাৎ প্রতিবাদ উপনিবেশবাদী পাপের বিরুদ্ধেও। যেমন—দাসপ্রথার কুখ্যাত বীর ক্লসটনের ভাস্কর মূর্তি বিক্ষুব্ধ জনতা ভেঙেচুরে পানিতে ফেলে দিয়েছে। এমন অনেক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। এর মধ্যে সবশেষ টার্গেট রক্ষণশীল রাজনীতিক ও বর্ণবিদ্বেষী সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। তাঁর পূর্ণদৈর্ঘ্য ভাস্কর্যের ওপরও চলেছে হামলা। সরকার চুপ করে থাকেনি।

এসব ধ্বংসাত্মক ঘটনা ও ব্রিস্টলে বিশাল ক্ষুব্ধ জনজমায়েত দেখে কোনো কোনো বিশ্লেষকের ধারণা—এসব ব্রিটেনে তো বটেই, যুক্তরাষ্ট্রেও পরিবর্তনের আভাস-ইঙ্গিত, কারো ভাষায় সূচনা। আমার তা মনে হয় না। ওই সব দেশে পুঁজিবাদের ভিত এতই শক্ত ও মজবুত যে তার পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ ঘটনার ব্যাপার। সর্বোপরি একটি কথা, বিক্ষোভকারীদের সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ, সেই লক্ষ্য অর্জনে তৎপরতা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের যে ঘাটতি, সেগুলো পূরণ করতে অনেক অনেক সময় লাগবে কী ব্রিটেনে, কী যুক্তরাষ্ট্রের মতো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে। তবু অঘটন তো ঘটতেই পারে।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা